শিশুর খৎনা কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য


2512 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শিশুর খৎনা  কিছু প্রয়োজনীয়  তথ্য
মার্চ ৫, ২০১৭ ফটো গ্যালারি স্বাস্থ্য
Print Friendly, PDF & Email

॥ ডাঃ শেখ আবু সাঈদ শুভ ॥
খৎনা কি : ছেলে বাচ্চার পুরুষাঙ্গের সামনে বা মাথার দিকে যে অতিরিক্ত চামড়া পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল মাথাকে ঢেকে রাখে তা কেটে ফেলাকে খৎনা করা বোঝায়।
কখন করাবেনঃ শিশুর খৎনা  করানোর আদর্শ বয়স  ৫-৮ বছর।
কেনো করাবেনঃ খৎনা মুসলিমদের মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত। এছাড়া খ্রিষ্টান ও ইহূদিরাও তাদের ছেলে সন্তানদের খৎনা করিয়ে থাকে। এর প্রচুর উপকারিতা আছে।
১। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য।
২। প্রস্রাবের ইনফেকশানের ঝুঁকি কমায়
৩। যৌনরোগ কমায়
৪। লিঙ্গের সমস্যা কমায়
৫।পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার এর ঝুঁকি কমায়
৬।স্ত্রীর সারভিক্স এর ক্যান্সার এর ঝুঁকি কমায়।
খৎনা কারা করেনঃ
আমাদের দেশ যেহেতু মুসলিম প্রধান, তাই ধর্মীয় কারনেই বেশির ভাগ খৎনা করা হয়।সবচেয়ে বেশি খৎনা করেন হাযাম, হাতুড়ে চিকিতসক ও স্বাস্থ্য সহকারীরা। সামান্য কিছু অংশ করেন এমবিবিএস চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ সার্জন। এটি একটি অপারেশান হওয়া সত্ত্বেও নন কোয়ালিফাইড লোকজন দিয়েই অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে যত্রতত্র এ অপারেশান হয়ে চলেছে যা খুবই উদে¦গজনক। বাইরের দেশে কোয়ালিফাইড ডাক্তার বিশেষত: শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞরাই এ কাজ করে থাকেন। কারণ খৎনা করতে গিয়ে যে কোন দূর্ঘটনা বাচ্চার ভবিষ্যৎ জীবন জটিল করে তুলতে পারে।
কেন বাবা মায়েরা তার বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে আসতে চাননা?
১। অনেকে ভাবেন হাযাম বেশি অভিজ্ঞ
২।ডাক্তার দের বেশী সময় লাগে
৩। ঘা সারতে বেশী সময় লাগে
৩। অনেকে মনে করেন হাযাম দিয়ে না করালে ধর্মীয় ভাবে গৃহীত হবে না।
৪। অনেকেই এটির সাথে উৎসব পালন করে থাকেন এবং ভাবেন ডাক্তার দিয়ে করালে  এটার সাথে মানানসই হবে না।
বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ধারণা গুলো অমুলক। তবে  ডাক্তাররা সেলাই দেন বলে সময় একটু বেশী লাগে।
খৎনা করার মেডিকেল কারন সমুহ ঃ
১। ফাইমোসিস বা প্রস্রাবের ছিদ্র চিকন।
২। প্যারাফাইমোসিস বা পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া পিছনে এসে আটকে যায়। এটি একটি জরুরি অবস্থা। অতি দ্রুত অপারেশান না করলে লিঙ্গের অগ্রভাগে গ্যাংগ্রীন বা পচন ধরতে পারে।
৩। ব্যালানাইটিস বা পুরুষাঙ্গের ইনফেকশান
৪। অজানা কারনে বার বার প্রস্রাবের ইনফেকশান ইত্যাদি
হাজাম বা অনভিজ্ঞ সার্জনের দারা খৎনা করালে কি  কি সমস্যা হতে পারে?
১। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা রক্ত বন্ধ না হওয়া
২। চামড়ার বেশি অংশ কেটে ফেলা ফলে ভবিষ্যতে লিঙ্গের উত্থানে প্রচন্ড ব্যথা হতে পারে।
৩। হাজাম বা অনভিজ্ঞ সার্জনের হাতে ইনফেকশানের পরিমান অনেক বেশি। এর প্রধান কারন জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতির ব্যবহার না করা।

৪। সৌন্দর্যহানীঃ অপারেশান এর জায়গা চামড়া কম কাটা ফলে চামড়ার কিছু অংশ ঝুলে থাকা।
৫। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কোন সেলাই দেননা । ফলে কাটা অংশ জোড়া লাগার সময় ভালভাবে জোড়া না লেগে এবড়ো থেবড়ো হয়ে জেতে পারে।
৬। অনেক সময় তারা দ্রুত জোড়া লাগানোর জন্য খতস্থানে পাতা,ছাই ইত্যাদি   ব্যবহার করেন  ইনফেকশান এমনকি টিটেনাস এর মত মারাতœক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৭। সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা হল শিস্নের অগ্রভাগ ভুল করে কেটে ফেলা। হাজমরা খৎনা করে ব্লাইন্ডলি অর্থাৎ মাথার অগ্রভাগে চামড়া মাথা থেকে সঠিকমত না ছাড়িয়ে না দেখে কেটে ফেলতে গিয়ে এই ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকে।
কেন খৎনা করানোর জন্য একজন অভিজ্ঞ শিশু সার্জন খুজবেন?
১। এটি একটি মাইনর অপারেশান। জন্ম থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত যে কোন অপারেশান এর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ডাক্তার হলেন একজন শিশু সার্জন এবং সিংহ ভাগ খৎনা  করা হয় ১ থেকে ১২ বছর বয়সে। তাই সারাবিশ্ব জুড়ে এ অপারেশান শিশু সার্জনরাই করে থাকেন।
২। যেহেতু এটি একটি অপারেশান, যন্ত্রপাতি যথাযথ জীবাণুমুক্ত করা অপরিহার্য। তা না হলে ক্ষতস্থানে জীবাণু সংক্রমিত হয়ে জিবনসংহারি ইনফেকশান হয়ে যেতে পারে ।
আর যথাযথ জীবাণুমুক্ত করার একমাত্র উপায় হল ‘অটোক্লেভ মেশিন’ যা শুধু বড় বড় হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহেই বিদ্যমান।
৩। এক এক বয়সের অপারেশানে  এক এক রকম চাহিদা থাকে। যেমন ১০/১২ বছরের বাচ্চার যে সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়, একটি ১ বছরের বাচ্চার জন্য ব্যবহার করা হয় তার থেকে অনেক চিকন সুতা। সেক্ষেত্রে অপারেশান শেষে দাগ হবেনা ও সৌন্দর্যহানি হবেনা।
কখন খৎনা করা যাবে না: হাইপোসপেডিয়াস রোগ। এটা পুরুষাঙ্গের জন্মগত ত্রুটি। এখানে মনে হবে বাচ্চা জন্মগতভাবে খৎনা হয়ে এসেছে। এই ক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গের বাড়তি চামড়া এই জন্মগত ক্রটি মেরামতের সময় প্রয়োজন হয়। তাই খৎনা করানো নিষেধ।
খৎনা করার পূর্বে রক্তপরীক্ষা করার প্রয়োজন আছে কি?: অবশ্যই আছে। খৎনার পর কিছু খৎনার রোগীর ব্লিডিং বন্ধ হয় না এবং মরণাপন্ন অবস্থায় আমাদের কাছে হাজামরা পাঠায়। তাই খৎনার পূর্বে বাচ্চার অবশ্যই রক্তক্ষরণজনীত সমস্যা (জন্মগত) আছে কি না তা দেখে নিতে হবে।
তাই ছেলেকে খৎনা করানোর আগে বাবা মা কে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ।

লেখক –
সহকারী  অধ্যাপক
শিশু সার্জারী বিভাগ
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাস্পাতাল
সাতক্ষীরা
ফোনঃ ০১৭২৯-৫৭৬ ৫৭৬