শীতের আগমনীবার্তা : কপিলমুনিতে খেজুর গাছ তোলার ধুম পড়েছে


609 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শীতের আগমনীবার্তা :  কপিলমুনিতে খেজুর গাছ তোলার ধুম পড়েছে
অক্টোবর ২৭, ২০১৬ খুলনা বিভাগ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

পলাশ কর্মকার, কপিলমুনি :
কপিলমুনির সর্বত্রই খেজুর গাছ তোলার ধুম পড়েছে, তাইতো গাছিদের এতো ব্যস্ততা। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক এই খেজুর গাছকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে এ যেন অনেকটাই উৎসব মুখর পরিবেশ।
শীতের আগমনে শুরু হয় খেজুর গাছ কেটে রস আহরণ। যারা গাছ কাটেন তাদের বলা হয় গাছি। খেজুর গাছের অগ্রভাগের একটি নির্দিষ্ট অংশ চিরে বিশেষ ব্যবস্থায় ছোট কলসি (ভাড়) বাঁধা হয়। ফোঁটায় ফোঁটায় রসে পূর্ণ হয় সে কলসি। শীত মৌসুমের শুরুতেই তাই খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহে গাছ তোলা কাটাসহ বিভিন্ন রকমের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে গেছে গাছিরা। ছোট বড় বিভিন্ন রকমের খেজুর গাছে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই তোলা-কাটা করতে হয় তাদের। কোমরে মোটা রশি বেঁধে গাছে ঝুলে ঝুলে করতে হয় এ কাজ। পেশাদার গাছিদের তেমন কোনো সমস্যা হয় না বলে জানালেন গাছিরা। আশ্বিন-কার্ত্তিক মাসে গাছ তোলা ও পরিচর্যা করার সঠিক সময়। তবে এবার বর্ষার ভাগ বেশী থাকায় খেজুর গাছ তোলা দেরিতে শুরু হয়েছে বলে জানালেন গাছি আঃ জব্বার। খেজুর গাছের চাহিদাটা ইট ভাটায় বেশী হওয়ায় গ্রামের লোকজন অভাবের তাড়নায় গাছগুলো দেদারছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাই তুলনামূলক ভাবে খেজুর গাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পথে। সংগত কারণেই আগের মতো মাঠ জুড়ে আর দেখা যায় না এই খেজুর গাছ। তারপরও গ্রামের মাঠ আর মেঠো পথের কোথাও কোথাও খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে।
৭০ বছরের বৃদ্ধ সালাম গাজী বলেন, ‘আমাদের গ্রাম বাংলায় অতীতে খেজুর রসের যে সুখ্যাতি ছিল তা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। খেজুরের রস শীতের সকালে বসে মুড়ি মিশিয়ে গ্ল¬াস ভরে খেতে বেশ মজা লাগে। সন্ধ্যা রস আরো মজাদার। বেশ লোভনীয় নলেন পাটালি ও গুড়। খেজুর গুড় বাঙালির সংস্কৃতির একটা অঙ্গ। ক’দিন পরেই প্রতিটি ঘরে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা-পুলি ও পায়েস তৈরীর ধূম পড়বে। ঢেঁকি ঘরে চাল কুটার ধুম পড়ে যাবে, শোনা যাবে ঢক ঢক শব্দ। মুড়ি, চিড়া, পিঠা খাওয়া কৃষক পরিবার থেকে শুরু করে সবার কাছে বেশ প্রিয়। এসব আশা নিয়ে শীত মৌসুমে গাছ কাটার কাজে গাছিদের বেশ ব্যস্ত সময় পার হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক হাজার গাছি সারা বছরের রুজিরুটির নির্ভর করে এ পেশার উপর। খুলনা জেলার কপিলমুনির বক্স গাছি জানান, শীত আসা মাত্রই আমরা খেজুর গাছ ছিলানোর জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লেগেই আছি। পাঁচ মাস খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে তা জ্বালিয়ে গুড় বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে বেশ আর্থিক সচ্ছলতা আসে আমাদের’। গাছিদের মুখে ফুটে ওঠে রসালো হাসি। নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকিটা বিক্রি করে যে অর্থ আসে তা দিয়ে চলে পুরো বছর। চলতি মৌসুমে এখনো শীত তেমন একটা অনুভুত না হলেও গাছিরা গাছ কাটার জন্য দা তৈরী, ঠুঙি, দড়ি ও মাটির কলস (ভাড়) কেনার কাজ সেরে নিচ্ছেন।
সচেতনরা বলছেন, আগের মতো খেজুর গাছ আর নেই। এলাকার লবনাক্তার কারণে নতুন করে তুলনামূলকভাবে খেজুর গাছের বংশ বিস্তার হচ্ছে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ফসলী জায়গায় গড়ে উঠছে বসতি, যার ফলেও অকালে উজাড় হচ্ছে খেজুর গাছ। প্রতিদিন ইট ভাটা ও পালের কারখানার জ্বালানির কাজে নির্বিচারে নিধন হচ্ছে এলাকার খেজুর গাছ। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এরপরও গাছিরা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল গুড়, সুস্বাদু খাবার ও শুধু রসনা তৃপ্তির সুমিষ্ট রসের জন্যই নয়, আমাদের জীবনের প্রয়োজনে, পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় খেজুর গাছ বাচিঁয়ে রাখতে হবে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এঅঞ্চলের খেজুর গাছ ও গুড় আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। শীতের সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিদায়ক তা বলে শেষ করা যাবে না। আর খেজুর রসের পিঠা এবং পায়েস তো খুবই মজাদার। এ কারণে শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলের রসের ক্ষির, পায়েস ও পিঠা খাওয়া ধুম পড়ে যায়। প্রতিদিনই কোন না বাড়ীতে খেজুর রসের তৈরী খাদ্যের আয়োজন চলে।