শীতের আগমনী বার্তা পেয়েছে সাতক্ষীরার গাছীরা


101 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শীতের আগমনী বার্তা পেয়েছে সাতক্ষীরার গাছীরা
নভেম্বর ১৫, ২০২১ ইতিহাস ঐতিহ্য ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

আব্দুল কাদের রুহানী ::

শিশির ভেজা ঘাস, ভোরে ও সন্ধ্যায় কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রকৃতি। শীতের আগাম সবজির ক্ষেতে কৃষকের ব্যস্ততা। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষেরা বলছেন, ‘হেমন্ত মানে শীত শীত ভাব, ঠান্ডা বাতাস, ঠান্ডা প্রকৃতি। শেষ রাতের দিকে ঠান্ডা লাগে, পরে হয়তো হালকা চাদর মুড়ে দেয়।

সাতক্ষীরার গ্রামগুলোতে শুরু হয়েছে খেজুরের গাছ থেকে রস সংগ্রহ। শীত যত বাড়বে, হাড়িতে ততই জমবে খেজুরের রস। শুরু হবে গুড় ও পিঠা তৈরির উৎসব।

গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষেরা বলছেন, অপ্রাপ্তি আর দু:খবেদনা যুই থাকুক, হেমন্ত এলে প্রকৃতির মতো তাদের জীবনেও যেন এক শীতলতা, যেন এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়। বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি প্রিয় সাতক্ষীরা। ঋতুর পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিও সেজে ওঠে ভিন্ন রূপে। কুয়াশা ভেদ করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ঝাপসা ছবিগুলো যেন এক কল্পকাহিনীর সৃষ্টি করে গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠপথগুলো। সবুজ ঘাসের উপর শিশির কণা সে এক অন্যরকম অনুভূতির জগতে আপনাকে হারিয়ে যেতে বাধ্য করবে শীতের কুয়াশা ¯œাত সকাল।
শীতের আগমনে সাতক্ষীরার প্রতিটি গ্রাম অঞ্চল জুড়েই যেন এক ভিন্ন আয়োজন।আমি আমার জন্মভূমি প্রিয় সাতক্ষীরার কলারোয়া অঞ্চলের কথা আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। এক সময় দিগন্তজুড়ে মাঠ কিংবা সড়কের দু’পাশে সারি সারি অসংখ্য খেজুর গাছ চোখে পড়তো। বির্বুনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এ খেজুর গাছ। তবুও শীত মৌসুমের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা।

বৈচিত্র্যপূর্ণ ছয় ঋতুর দেশ আমাদের বাংলাদেশ। এক একটি ঋতুর রয়েছে এক একটি বৈশিষ্ট্য। তেমনি এক ঋতু হেমন্ত। এই ঋতুতেই দেখা মিলে শীতের। এই শীতের সময়ই পাওয়া যায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু পানীয় খেজুর গাছের রস। শীতের সকালে মিষ্টি রোদে বসে এই সুস্বাদু খেজুর রস খাওয়ার যেন মজাই আলাদা। শীতের ভরা মৌসুমে রস সংগ্রহের জন্য শীতের আগমনের শুরু থেকেই খেজুর রস সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে গাছিরা। বেড়ে যায় অযতেœ-অবহেলায় পড়ে থাকা গ্রাম গঞ্জের খেজুর গাছের কদর। এখনও তেমন একটা শীতের দেখা না মিললেও এরই মধ্যে খেজুর রস সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছেন অনেকেই।

খেজুর গাছ সংকটের কারণে প্রতি বছরের মতো হয়তো এবার চাহিদা অনুযায়ী রস পাওয়া যাবে না। জেলার জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ সংরক্ষণের উদাসীনতার কারণে এ জেলার খেজুর গাছ অনেকটা বিলুপ্তির পথে। জেলার প্রতিটি এলাকার এক সময় খ্যাতি থাকলেও কালের বির্বুনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য খেজুরের রস ও গুড়। কয়েক বছর আগেও এলাকার প্রতিটি বাড়িতে, ক্ষেতের আইলের পাশে ও রাস্তার দুই ধার দিয়ে ছিল অসংখ্য খেজুর গাছ। খেজুর গাছ সচারাচর উপযোগী আবহাওয়ায় জন্ম হয়। এমনকি অনেক স্থানে একাধিক গাছ জন্ম নেওয়ায় সৃষ্টি হয় দেশি খেজুর গাছের বাগান।

এসব গাছ বাড়ির আঙিনা, জমির আইল ও পতিত ভূমিতে জন্ম নেয় বেশি। খেজুর গাছ সারা বছর অযতেœ-অবহেলায় পড়ে থাকলেও শীত মৌসুমে তার কদর বেড়ে যায় অনেকাংশে। কারণ প্রতি বছরে ৪ মাস খেজুর গাছ থেকে গুড় ও মিষ্টি রস সংগ্রহ করা হয়। এ রস অত্যন্ত সুস্বাধু ও মানবদেহের উপকারিতার কারণে মানুষের কাছে অতি প্রিয় হয়ে থাকে। শীতকালে শহর থেকে মানুষ দলে দলে ছুটে আসতো গ্রামবাংলার খেজুর রস খেতে। সন্ধ্যাকালীন সময়ে গ্রামীণ পরিবেশটা খেজুর রসে মধুর হয়ে উঠত। রস আহরণকারী গাছিদের প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যেু সেই সময়ে। রস জ্বালিয়ে পাতলা ঝোলা, দানা গুড় ও পাটালি তৈরি করতেন তারা। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন রসের নলেন পাটালির কথা স্মরণে আসতেই রসনায় জল এসে যায়।

এখন অবশ্যই সে কথা নতুন প্রজন্মের কাছে রূপকথা মনে হলেও বাস্তব। যত বেশি শীত পড়বে ততো বেশি মিষ্টি রস দেবে খেজুর গাছ। খেজুর গাছ ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত রস দেয়। এটাই তার বৈশিষ্ট্য। শীতের পুরো মৌসুমে চলে রস, গুড়, পিঠা, পুলি ও পায়েস খাওয়ার পালা। এছাড়া খেজুর পাতা দিয়ে আর্কষণীয় ও মজবুত পাটি তৈরি হয়। এমনকি জ্বালানি কাজেও ব্যাপক ব্যবহার হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, কালের বির্বতনসহ বন বিভাগের নজরদারী না থাকায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব খেজুর গাছ এখন জেলা জুড়ে বিলুপ্তির পথে।

সুতরাং যদি আমরা আমাদের এই হাজার বছরের ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য ধরে রাখতে চাই তাহলে এই কাজে আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত। দূরে থাকি তবুও গ্রামের প্রতিচ্ছবি হৃদয়ে অংকিত হয় বারবার। গ্রাম আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি মানুষের কাছেই তার গ্রাম একটি ছোট্ট স্বর্গস্বরূপ। গ্রামের অপূর্ব সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে হলে অবশ্যই গ্রামে গিয়ে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে স্বচক্ষে দেখতে হবে।

লেখক:শিক্ষার্থী বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি