সাতক্ষীরায় ২২৪ টি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ৬ মাসে সেবা গ্রহণ করেছে সাড়ে ২১ লাখ রোগী


597 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় ২২৪ টি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ৬ মাসে সেবা গ্রহণ করেছে সাড়ে ২১ লাখ রোগী
নভেম্বর ৬, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

কাজী জাহিদ আহম্মেদ :
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানাধীন সরুলীয়া ইউনিয়নের জুজখোলা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা গ্রহণকারী নাছিমা বেগম ও মেহরুন নেছা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোর গোড়ায় পৌঁছে দিতে পেরেছে কমিউনিটি ক্লিনিক। কমিউনিটি ক্লিনিকে গর্ভবতী মহিলাদের প্রসবের আগে ও পরে বিভিন্ন সেবাসহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। যারা এই সেবা গ্রহণ করতে আসে না তাদেরও এখানে আনার জন্য ক্লিনিক থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তারা আরো বলেন, এখান থেকে বিভিন্ন প্রকার ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। তাই ছোটখাট সমস্যা হলে এখন আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয় না। আমরা সহজেই চিকিৎসা করাতে পারি। এসে সময় ও খরচ দুই বাঁচে।

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো চিকিৎসার সুযোগ। দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পারিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছে। যার সুফল পেতে শুরু করেছে দেশের মানুষ। তবে এসব ক্লিনিকের সংখ্যাবৃদ্ধি, কর্মরত সিএইচসিপিদের চাকুরী জাতীয় করণ, সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের উপস্থিতি নিশ্চিত, পর্যাপ্ত ঔষধ সরবারহ, কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও মাতৃত্বকালিন সুবিধা বৃদ্ধিসহ সেবার খাত বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটানো এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, জনসচেতনতা এবং আন্তরিকতা স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তি আরো সহজ করতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

সেবা বিষয়ে জুজখোলা কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার ও জেলার হেলথ কেয়ার সমিতির সভাপতি আল-আমিন জানান, এখানে ১০-১২ গ্রামের মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে আসে। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ দেয়া হয়। সরকারিভাবে বিতরণ করা হয় ৩১ ধরনের ওষুধ। এর মধ্যে রয়েছে এমোক্সিসিলিন ও ডক্সিসাইক্লিন ক্যাপসুল। ট্যাবলেটের মধ্যে রয়েছে, এ্যালবেনডাজল, এন্টাসিড, ক্যালসিয়াম ল্যাকটেট, ক্লোরফেনিরামিন, কো-ট্রাইমোক্সাজল, এ্যাজি থ্রোমাইসিন স্টিয়ারেট, ফেরাস ফিউমারেট উইথ ফলিক-এসিড, হাইয়োসিন এন বিউটাইলব্রোমাইড, মেট্রোনিডাজল, প্যারাসিটামল, পেনিসিলিন বি, ভিটামিন বি কমপে¬ক্স ও জিঙ্ক ডিসপারসিবল। সিরাপের মধ্যে রয়েছে এমোক্সিসিলিন, এমোক্সিসিলিন পেডিয়াট্রিক ড্রপ, এ্যাজি থ্রোমাইসিন ড্রাই সিরাপ বেনজাইল বেনজোয়েট, ক্লোরফেনিরামিন, প্যারাসিটামল সাসপেনশন, সালবিউটামল, ক্লোরহেক্সিডাইন এ্যান্ড কেট্রিমাইড সল্যুশন, ক্লোরামফেনিকল আই অয়েনমেন্ট, কম্পাউন্ড বেনজোয়িক এ্যাসিড অয়েনমেন্ট, জেনটিয়ান ভায়োলেট টপিক্যাল সল্যুশন ও নিউমাইসিন এ্যান্ড বেসিট্রাসিন অয়নমেন্ট। আরও রয়েছে পরিবার পরিকল্পনার নানা উপকরণ।

শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার ও জেলা হেলথ কেয়ার সমিতির সাধারণ সম্পাদক সামছুর রহমান বলেন, জনগণের চাহিদার কথা বিবেচনা করে সরকার কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এই ক্লিনিকের আশীর্বাদে বাড়ির পাশেই বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম এবং সেবাদানকারীদের করণীয় সম্পর্কে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে নির্দেশনা পৌঁছে দিয়েছে সরকার। নির্দেশিকা থাকায় চিকিৎসা ও ওষুধ নিয়ে অবৈধ কাজ করার সুযোগ থাকছে না। তিনি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকার কমিউনিটি ক্লিনিকে মায়েদের নিরাপদ ডেলিভারির ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। অনেক জায়গায় ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে গেছে। কাজও শুরু হয়ে গেছে। এতে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু হার অনেকাংশে কমবে।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তৃর্ণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কমিউনিটি ক্লিনিক। জেলার এসব কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ৬ মাসে প্রায় সাড়ে ২১ লক্ষ রোগী স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করেছে। এসব ক্লিনিক থেকে সরবারহ করা হচ্ছে ২৯ প্রকার জরুরী ওষুধ।

সূত্রে জানা যায়, জেলার ২শ ২৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। ২শ ২৪ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার এসব ক্লিনিকে সেবা প্রান করছেন। ৬ মাসে জেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো থেকে ২১ লক্ষ ১৪ হাজার ২শ ৮৩ জন রোগী সেবা গ্রহণ করেছেন। এসব রোগীর মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেফার্ড করা হয়েছে ২৪ হাজার ৫শ ৭৫ জন রোগীকে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে গর্ভবতী মায়েদের ডেলিভারী করানো হয়েছে ২৫ জন রোগীকে।

সূত্র আরো জানায়, সদর উপজেলায় ৩৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩৮ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের মাধ্যমে ৬ মাসে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে ৪ লক্ষ ৪০ হাজার ৩শ ৫১ জন রোগীকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে ২ হাজার ৪শ ৩৭ জন রোগীকে।

তালা উপজেলায় ৩৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩৬ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের মাধ্যমের ৬ মাসে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে ৪ লক্ষ ১১ হাজার ৪শ ৭৮ জন রোগীকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে ৪ হাজার ১শ ৫১ জন রোগীকে।

কলারোয়া উপজেলায় ২১টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ২৪ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের মাধ্যমে ৬ মাসে ২ লাখ ৫১ হাজার ৪শ ৯১ জন রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে। ৬ হাজার ৪৮ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে।

দেবহাটা উপজেলায় ১৬টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ১৬ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের মাধ্যমে ৬ মাসে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৯শ ৮৭ জন রোগীকে। ৯ হাজার ৫ শ ১৩ জন রোগীকে রেফার্ড করা হয়েছে উন্নত চিকিৎসার জন্য।

আশাশুনি উপজেলায় ৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩৮ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের মাধ্যমে ৬ মাসে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে ২ লক্ষ ৫৮ হাজার ৩০ জন রোগীকে। ২শ ৮৯ জন রোগীকে রেফার্ড করা হয়েছে উন্নত চিকিৎসার জন্য।

কালিগঞ্জ উপজেলায় ৩২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩৩ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের মাধ্যমে ৬ মাসে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯শ ৫১ জন রোগীকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ৬শ ৫৭ জন রোগীকে রেফার্ড করা হয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলায় ৪১টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩৯ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের মাধ্যমের ৬ মাসে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে ৩ লক্ষ ৮২ হাজার ৯শ ৯৫ জন রোগীকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে ১ হাজার ৪শ ৮০ জন রোগীকে।

সূত্র আরো জানায়, কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগিতায় গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে আসছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করে। প্রকল্প চলা কালে ২০১৩ সালে এটি উন্নয়ন খানে নেয়া হয়। যার মেয়দ নির্ধারণ করা হয় ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। সে মোতাবেক এ প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে ৮ মাস। তবে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা পৌছে দিতে সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক জাতীয় করণ করবে এমনটি মনে করেন কর্মরত সকলে।

কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবা সর্ম্পকে সাতক্ষীরার সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হওয়ার ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজেই স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারছে। আগের মত গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তাদের প্রতারণা থেকে মুক্তি পেয়েছে। এখানে সপ্তাহে তিন দিন স্বাস্থ্য সহকারি, তিন দিন পরিবার কল্যাণ সহকারি ও কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারা নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক বর্তমান সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এখন আর গ্রামের লোকেদের দিন নষ্ট করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সদর হাসপাতালে আসতে হয় না। এতে সময় ও অর্থের অপচয় রোধ হচ্ছে। কিন্তু ডাক্তার সংকট থাকায় এসব ক্লিনিকের ডাক্তার দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে ভবিষতে হয়ত ডাক্তার দেওয়ার ব্যবস্থা হতে পারে।