শুরুতেই ধাক্কা খেল সড়ক আইন


135 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শুরুতেই ধাক্কা খেল সড়ক আইন
নভেম্বর ২২, ২০১৯ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ধর্মঘট পুরো প্রত্যাহার হয়নি

অনলাইন ডেস্ক ::

রাস্তায় নেমেই ধাক্কা খেয়েছে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আন্দোলনে আইনের তিনটি ধারা প্রয়োগে প্রায় আট মাস ছাড় দেওয়া হয়েছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও নেতারা সমকালকে বলেছেন, প্রস্তুতি ছাড়াই আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে সড়কে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। তাই পরিবহন নেতাদের দাবির কাছে সরকারকে নতিস্বীকার করতে হয়েছে। একবার ছাড় দেওয়ায় আইনটি ভবিষ্যতে কঠোরভাবে প্রয়োগ করার সম্ভাবনাও কমে গেছে।

গত ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করা হয় সড়ক পরিবহন আইন। গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনে আইনটি পাস হয়েছিল। এতে সড়কে নিয়ম ভঙ্গে জরিমানা বেড়েছে হাজার গুণ পর্যন্ত, বেড়েছে কারাদণ্ড। আগের আইনে যে অপরাধে ৫০০ টাকা জরিমানা ছিল, নতুন আইনে তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করা হয়। আইনের তিনটি ধারা জামিন অযোগ্য। ১১টি ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।

পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা শুরু থেকেই আইনটিকে ‘কঠোর’ আখ্যা দিয়ে শিথিল করার দাবি তুলেছিলেন। প্রণয়নের প্রায় এক বছর পর গত ২৩ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে ১ নভেম্বর থেকে আইন কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আইন কার্যকর হলেও এখনও বিধিমালা হয়নি।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আইন প্রয়োগে অহেতুক বাড়বাড়ি হবে না। বাড়াবাড়ি না হলে সমস্যা হবে না। বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। আইন প্রয়োগে যদি কোনো কিছু অসঙ্গত মনে হয়, তা হলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। পরিস্থিতি এখন আর অস্বাভাবিক হওয়ার কারণ নেই। সবকিছুই আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান হয়েছে।’

দুই দফায় ১৪ দিন ছাড় দেওয়ার পর গত সোমবার থেকে আইন প্রয়োগ শুরু করেন সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরের দিন মঙ্গলবার আইন স্থগিতের দাবিতে বুধবার সকাল থেকে দেশব্যাপী কর্মবিরতির ডাক দেয় পণ্যবাহী পরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা। বন্ধ হয়ে যায় বাস চলাচলও।

অচল সড়কে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে থাকে পুরো বুধবার। ওই দিন মধ্যরাতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বৈঠকে তিনটি ধারা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিতের সিদ্ধান্তে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যকেও আইন সংশোধনের আভাস বলে মনে করছেন অনেকে। চলমান ট্রাফিক সচেতনতা পক্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আইনটি বাস্তবায়ন করার সময় কয়েকটি ‘যৌক্তিক জটিলতা’ দেখা গেছে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিকরা অন্যান্য ধারাগুলোকে যুগোপযোগী বিবেচনায় সমর্থন করলেও ৯টি ধারা সংশোধনের দাবি তুলেছেন। প্রস্তাবাকারে এ ৯ দফা দাবি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এ ব্যাপারে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবেন।

এদিকে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারাও তিনটি ধারার সংশোধন চান। বাস মালিক-শ্রমিকরাও চান কয়েকটি ধারা শিথিল করা হোক। দাবি আদায়ে তারাও আন্দোলনে নামার আভাস দিয়েছেন।

যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের দাবিতে ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনশন করেছিলেন কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের এই সদস্য বলেন, আট বছরের চেষ্টায় সবার প্রত্যাশায় আইনটি হয়েছে। কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে যতটা দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন ছিল, তা দেখাতে পারেনি সরকার। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এই আইনের সবচেয়ে বড় অংশীজন। তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি রেখে আইন প্রয়োগ সম্ভব হবে না। গাড়ির সব কাগজপত্র হালনাগাদে তাদের কিছুদিন সময় দিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে তারপর আইন প্রয়োগ করা উচিত ছিল। আইন প্রয়োগের শুরুতেই ছাড় দেওয়া ভালো নজির নয়। এতে আন্দোলনের ফলে আইন নমনীয় করার বাজে নজির সৃষ্টি হলো।

পরিবহন নেতারা বলছেন, নতুন আইনে যেভাবে জরিমানা ও সাজা বেড়েছে, তাতে সাধারণ শ্রমিকরা ভীত হয়ে পড়েছেন। তাদের ধারণা, রাস্তায় নামলেই বোধহয় জরিমানা দিতে হবে। এতে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের বর্ধিত সভার ফাঁকে সংগঠনটির কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান এমপি বলেছেন, ‘বাস্তবসম্মত উপায়ে আইনের প্রয়োগ শুরু হয়নি। পুলিশ ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে যেভাবে জেল-জরিমানার বিষয়টি প্রচার করেছে, তাতে শ্রমিকরা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।’

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, ‘গত বছরের অক্টোবরে আইন পাস হয়েছে। তখনই কার্যকর হলে, আজকের পরিস্থিতি হতো না।’ কর্মবিরতির পর আইনের তিনটি ধারার প্রয়োগে সময় দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘এটা পরিবহন নেতাদের মজ্জাগত অভ্যাস। তারা আগেও জিম্মি করে মোটরযান অধ্যাদেশে-১৯৮৩ পরিবর্তন করে। সড়কে মৃত্যুর সাজা ১০ থেকে কমিয়ে তিন বছর করে।’ তিনি বলেছেন, ‘এভাবে সড়ক কখনই নিরাপদ হবে না।’

বুধবার কর্মবিরতিতে যাওয়া ট্রাক, কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান সমকালকে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তারা ৬৬, ৭৫, ৭৬, ৭৭, ৮৪, ৮৬, ৯০, ৯৮ এবং ১০৫- এই ৯টি ধারা সংশোধনের দাবি করেছেন।

৬৬ ধারায় চালকের লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন, ৭৫ ধারায় গাড়ির ফিটনেস, ৭৬ ধারায় ট্যাক্স টোকেন, ৮৪ ধারায় গাড়ির আকার-আকৃতি পরিবর্তন, ৮৬ ধারায় অতিরিক্ত পণ্য বহন, ৯০ ধারায় যেখানে সেখানে পার্কিং, ৯৮ ধারায় গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করা এবং ১০৫ ধারায় সড়কে মৃত্যুর জরিমানা ও সাজার বিধানের উল্লেখ রয়েছে।

পণ্য পরিবহন নেতাদের দাবি, চালকরা যেন হালকা বা মাঝারি শ্রেণির লাইসেন্স দিয়ে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান চালাতে পারেন। উচ্চ শ্রেণির লাইসেন্স পাওয়া যেন সহজ করা হয়। এগুলো মেনে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত হালকা ও মাঝারি লাইসেন্স দিয়ে ভারী গাড়ি চালানোর ছাড় দেওয়া হয়। ৬৬ ধারা অনুযায়ী, নির্ধারিত শ্রেণির লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে। ছাড় দেওয়ায় এ জরিমানা আপাতত গুনতে হবে না।

৭৫ ধারা অনুযায়ী গাড়ির ফিটনেস হালনাগাদ না থাকলে ২৫ হাজার টাকা এবং ট্যাক্স টোকেন মেয়াদোত্তীর্ণ হলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা হবে। ৮৪ ধারায় পণ্যবাহী যানের আকার পরিবর্তনে এক থেকে তিন লাখ টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ তিন বছর জেলের বিধান রয়েছে। এসব ধারা ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

রুস্তম আলী বলেন, আইনের ১১৭ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, ৮৪, ৯৮ এবং ১০৫ ধারা জামিন অযোগ্য। এতে চালক-শ্রমিকরা ভীত হয়ে পড়েছে। তারা গাড়ি চালাতে রাজি নয়। ১১৭ (খ) ধারা বাতিল করতে হবে। আইনের ১১টি ধারায় পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতেও শ্রমিকরাও ভীত। এ প্রসঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, সব আইনেই পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ বিধান নতুন নয়।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ৯৮ ও ১০৫ ধারায় জরিমানা কমানো এবং দুর্ঘটনা তদন্তে বিআরটিএতে পুলিশের সঙ্গে দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) প্রতিনিধি যুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।

এআরআই পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, সড়ক পরিবহন আইন খুব ভালো একটি আইন। তবে শুধু শাস্তি নয়, আইন মেনে চলতে যে অবকাঠামো দরকার, তাও নিশ্চিত করতে হবে।