শ্যামনগরে চিংড়ী চাষে লবণ পানি তুলে বেড়িবাঁধের সর্বনাশ


77 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শ্যামনগরে চিংড়ী চাষে লবণ পানি তুলে বেড়িবাঁধের সর্বনাশ
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাধে পাইপ দিয়ে প্রায় তিন যুগ ধরে লবণ পানি তুলে চিংড়ী চাষ করার ফলে বেড়িবাধ ভেঙে এলাকা প্রায়ই প্লাবিত হয়। এতে এলাকার ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়।

২০১০ সালে ‘বেলা’ নামক এক এনজিও হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করলে হাইকোট ‘কৃষি জমিতে লবণ পানি দিয়ে চিংড়ী চাষ বন্ধ’ ঘোষণা করে রায় প্রদান করে। আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পরে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং বেড়িবাধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদনে মিনি স্লুইস গেটের অনুমোদন বাতিল করে ও অবৈধ পাইপ অপসারণ করতে তৎপর হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে শ্যামনগর থানায় মামলা দেওয়া হয়।

ঐ মামলায় কয়েকজন জেলেও যায়। এরপরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পোল্ডার সমুহের দায়িত্বে থাকা সেকশনাল অফিসারদের (এসও) চরম উদাসীনতার কারণে শ্যামনগর উপজেলার উপকূলবর্তী নদী সমুহের বেড়িবাঁধে এখনও শত শত অবৈধ পাইপ দিয়ে লবণ পানি তুলে চিংড়ী চাষ অব্যাহত আছে। সরেজমিনে শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী, রমজাননগর, মুন্সিগঞ্জ, নূরনগর, বুড়িগোয়ালনীসহ উপকূলীয় এলাকায় গেলে দেখা যায়, বেড়িবাঁধের ভিতর এখনও শত শত পাইপ দিয়ে লবণ পানি তুলে চিংড়ী চাষ করা হচ্ছে।

মাঝে মাঝে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও বাদী হয়ে থানায় এজহার দিলেও মামলা হয়না বা মামলাগুলো আলোর মুখ দেখে না বলে এসও তন্ময় হালদার মন্তব্য করেন।

কৈখালী ইউনিয়নের অনেক জায়াগায় পাইপ তুলে দিয়ে লবণ পানি তোলা বন্ধ করার ফলে জমিতে দুটি করে ফসল ফলছে। তাছাড়া কৈখালীর তরমুজ সুস্বাদু হিসেবে ইতোমধ্যে খ্যাতি লাভ করেছে। বেড়িবাঁধে পাইপ থাকার ফলে কৈখালীর এই কৃষি জমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া কৈখালী ইউনিয়ন বাংলাদেশের শেষ সীমানায়। কালিন্দি বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত নদী।

বেড়িবাঁধে পাইপ দিয়ে লবণ পানি তোলার ফলে কালিন্দি নদীর বাংলাদেশ কূলে ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। কালিন্দি নদীর বাংলাদেশের পাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিগত ১৫-১৬ বছর যাবত কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে চরে ব¬ক ফেলে সীমানা রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে অবৈধভাবে লবণ পানি তোলার কারণে ঝাঝরা হয়ে গেছে বেড়িবাধ। লবণ পানি থেকে এলাকাকে রক্ষা করার জন্য ৩১-১০-২০২০ তারিখে কৈখালীর শত শত মানুষের স্বাক্ষরে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোডের নির্বাহী প্রকৌশলী, পওর বিভাগ-১ সাতক্ষীরার নিকট আবেদনে সাংসদ সাতক্ষীরা-৪ সুপারিশ করেন। জেলা প্রশাসক সাতক্ষীরার ১৫২৯ নং স্মারকে ১-১১-২০২০ তারিখে শ্যামনগরের এসিল্যান্ডকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেও আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। দেশের সীমানা ও লবণ পানি থেকে এলাকাকে বাঁচাতে কৈখালীর শত শত মানুষ মানববন্ধন করলেও কোন কাজ হয়নি।

রমজাননগরের কালিঞ্চি, টেংরাখালী, ভেটখালী, সোরা ও রমজাননগর মাদার নদীর বেড়িবাঁধে অসংখ্য অবৈধ পাইপ রয়েছে। এখানে কয়েকজন বাঁধের ভিতর অবৈধ মিনি স্লুইস গেট তৈরী করে কৃষি জমিতে লবণ পানি তুলে চিংড়ী চাষ করার জন্য বিঘা প্রতি ৫০০-৭০০ টাকা হারে পানি বিক্রয় করছে। পওর এর শ্যামনগরের দায়িত্বে থাকা অফিসাররা সুবিধা নিয়ে অবৈধ মিনি স্লুুইস গেট দিয়ে লবণ পানি তুলতে সহয়তা করছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। কালিঞ্চিতে গফ্ফার মেম্বর, মুহাম্মদ আলী, শুকুর আলী, আশরাফুল, আকবর আলী, আল ফারুকসহ অনেকেই প্রায় ২০-২৫ জায়গায় বাঁধের ভিতরে পাইপ দিয়ে লবণ পানি তুলছেন। টেংরাখালীতে শহিদুল্যাহ, ভেটখালীতে আব্দুর রহমান, সোরা গ্রামে হাজী আরব আলী, বারী হাজী, বাবলু মোল্যা, শেখ আফজাল, রমজাননগরে আজাদ চৌকিদার, গোলাম ফারুকসহ প্রায় শতাধিক ব্যক্তি মিনি স্লুইস গেট ও বাঁধের ভিতর পাইপ দিয়ে লবণ পানি তুলছেন। এভাবে শ্যামনগরের উপকুলবর্তী নদী সমুহের বেড়িবাঁধের ভিতর এখনও হাজার খানেক পাইপ দিয়ে লবণ পানি তোলা হচ্ছে। বাঁধের ভিতর পাইপ দিয়ে লবণ পানি না তোলার জন্য শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের ৩০-১১-২০২০ তারিখের সভায় সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু সেটিও আলোর মুখ দেখেনি। পাইপ অপসারণের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শ্যামনগরের এসও মাসুদ রানার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাইপ অপসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে লবণ পানি তোলার পক্ষে মাইকিং করে দেওয়ার ফলে আমরা পাইপ অপসারণ করতে পারছি না। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ. ন. ম আবুজর গিফারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি এসিল্যান্ডকে দিয়ে অবৈধ পাইপ অপসারণের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করিয়েছেন। দেশের সীমানা রক্ষার বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার জানা নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার ভুক্তভোগী কয়েকজন বলেন, যারা এই কর্ম করছে তারা খুবই প্রভাবশালী হওয়ায় কোন প্রতিকার হচ্ছে না।