শ্যামনগরে সড়ক নির্মানে তুঘলকি কান্ড


143 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
শ্যামনগরে সড়ক নির্মানে তুঘলকি কান্ড
এপ্রিল ১৮, ২০২১ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

সামিউল মনির ::

শ্যামনগর উপজেলার পরানপুর এলাকায় গুরুত্বপুর্ন একটি সড়ক এর ‘মেজর মেইনটেন্যান্স’ কাজে ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এজিং ও ম্যাকাডাম যেনতেনভাবে সম্পন্নের পর কার্পেটিং এর ক্ষেত্রে রীতিমত পুকুর চুরির ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ইটসহ নিম্মমানের উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি ‘সিডিউল’ অনুযায়ী প্রাইম কোর্ট পর্যন্ত লাগানো হয়নি। গুনগত মান রক্ষা না হওয়ায় সদ্যই সম্পন্ন উপজেলা সদরের সাথে কৈখালী ইউনিয়নের যোগাযোগ রক্ষাকারী এ সড়ক বর্ষার আগেই নষ্টের মুখে পড়ার শংকা জেগেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা প্রকৌশলীর সহায়তায় কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদার এমন তুঘলকি কান্ড ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি শুরু থেকেই বার বার ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারকে ‘সিডিউল’ অনুযায়ী কাজের অনুরোধ করা হলেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। যার ফলে কাজ শেষ হওয়ার সপ্তাহ না পার হতেই কিছু স্থানে পাথরের টুকরা উঠে যেতে শুরু করেছে। ঠিকমত পিচ না দেয়ায় অনেকাংশে পাথরের টুকরার মধ্যে বিস্তর ফাঁকা রয়েছে এবং কোন কোন স্থানের এজিং দেবে যাচ্ছে বলেও জানান তারা।
উল্লেখ্য বার্র্ষিক উন্নয়ন কর্মসুচির আওতায় ২০২০-২১ অর্থ বছরে কৈখালী ইউনিয়নের পরানপুর বাজার এলাকায় ১৫শ মিটার রাস্তায় ‘মেজর মেইনটেন্যান্স’ কাজ অনুমোদন হয়। টেন্ডার আহবানের পর সড়কটির কাজের দায়িত্ব পায় খুলনার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিলান ট্রেডার্স। সময়মত কাজ শুরু করলেও তড়িঘড়ি করে গত গত ১৩ এপ্রিল রাতে মোট ৫৫ (চুক্তি ৫২) লাখ টাকার কাজটি সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগ উঠেছে অধিক মুনাফার লোভে ১৫শ মিটারের মধ্যে প্রায় ৬শ মিটার রাস্তার ‘থিকনেস’ ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেয়া হয়েছে। সিডিউল অনুযায়ী ৪০ মিলি ‘থিকনেস’ বজায় রাখার নির্দেশণা সত্ত্বেও প্রায় ৬শ মিটার জায়গায় ‘থিকনেস’ রাখা হয়েছে ২৫ থেকে ২৭ মিলি।
স্থানীয়দের দাবি ‘থিকনেস’ কম রেখে কাজ করার সময় কাকতালীয়ভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশলীসহ তার দপ্তরের কাউকে কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়নি। শেষ অংশের কাজ করার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততার আশ্রয় নেয়া হয়েছে- –উল্লেখ করে স্থানীয়রা অভিযোগ তোলেন ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদারের যোগসাযশে এমন দুর্নীতি হয়েছে। শেষ অংশের কাজ রাতের বেলা হয়েছে দাবি করে তারা জানায় নিম্ম মানের ইট ব্যবহারসহ ম্যাকাডাম এর সময় নিচের রাস্তা ভালভাবে গুঁড়িয়ে নেয়া হয়নি। কোন কোন স্থানে পুর্বের পিচের উপর পিচ দিয়ে নামকাওয়াস্তে প্রাইম কোট করা হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
পরানপুর বাজারের আব্দুল জলিল বলেন, শুরু থেকেই ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারকে বার বার বলা সত্ত্বেও তারা রাস্তা নির্মাণে মারাত্বক ফাঁকিবাজি করেছে। পরানপুর হাইস্কুল এর সামনের অংশে আগের পিচের রাস্তা যেনতেনভাবে খুঁড়ে পিচ ঢেলে রোলিং করেছে ঠিকাদারের লোকজন।
কাটাখালী গ্রামের আব্দুর রশিদ জানান, কোন রকমে এজিং সম্পন্নের পর ম্যাকাডাম এর কাজ করা হয়েছে অনেককটা দুর্বলভাবে। শেষ দিকে যেয়ে বেশ তড়িঘড়ি করে রাতের বেলা কার্পেটিং এর কাজ করেছে তারা। এসময় সেখানে ইঞ্জিনিয়ার বা তার প্রতিনিধি পর্যন্ত ছিল না। তিনি অভিযোগ করেন, ১৫শ মিটার রাস্তার সর্বত্র সমানভাবে ‘থিকনেস’ রক্ষা করা হয়নি। কাজ শেষ মুহুর্তে অভিযোগ উঠলে বাইরের কয়েকজন এসে পরীক্ষা করে প্রায় ছয়শ মিটার রাস্তায় নামমাত্র কার্পেটিং এর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
বর্ষাকাল আসতে আসতে এ রাস্তা আবারও নষ্ট হবে- দাবি করে স্থানীয় গ্রামবাসী খোরশেদ আলম জানায়, শুরু থেকে রাস্তা নির্মানে গুনগত মান রক্ষা করা হয়নি। এসময় এলাকার মানুষ যেনতেনভাবে কাজ না করার অনুরোধ জানালেও ঠিকাদার বা ইঞ্জিনিয়ার তাতে কর্ণপাত করেনি। কোন কোন স্থানে পিচের উপর দিয়ে পিচ দিয়ে গেছে, তাই সাতদিন পার না হতেই পিচ উঠে যাচ্ছে বলেও দাবি তার।
স্থানীয় কৈখালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম জানান, শুরুতে নিম্মমানের ইট দিয়ে কাজ করা হয়। এক পর্যায়ে পরিষদ এর পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হলেও ঠিকাদার বা ইঞ্জিনিয়ার তা আমলে নেয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাইম কোর্ট ঠিকমত মারা হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, গুনগত মান রক্ষা না করায় বর্ষা মৌসুম শেষ হতেই রাস্তা পুর্বের অবস্থায় ফিরতে শুরু করবে। বিষয়টি তদন্তের জন্য তিনি উর্ধ্বতন কতৃপক্ষেরও হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেছে যেসব স্থানে নামকাওয়াস্তে কাজ হয়েছে এবং ন্যুনতম মান রক্ষা পায়ননি, সেসব অংশের কাজের সময় কৌশলে উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরের প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত থেকেছে। দু’পক্ষের আপোষরফার কারনে এমন তুঘলকি আর পুকুর চুরির ঘটনায় তারা স্থানীয়দের কোন আপত্তিকে কানে তোলেনি। সমগ্র কাজের অনিয়ম আর দুর্নীতির সাথে কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরাসরি জড়িত অভিযোগ করে স্থানীয়রা জানান ইতিপুর্বে ঐ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক প্রকল্প গায়েবের অভিযোগ ওঠে। ঠিকাদারের সাথে যোগসাযশে তিনি ২০১৯-২০ অর্থ বছরে কালিগঞ্জ উপজেলায় এডিপির আওতায় রতনপুর এলাকার দুটি কাজের বিল আত্মসাৎ করে। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে বিল উত্তোলনের দশ মাস পর একটি ভাঙা ব্রিজের সংস্কার কাজ শুরু করে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে।
রাস্তা নির্মানে অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিলান ট্রেডার্সের মালিক এম জিলান জানান, শ্রমিকরা কাজ করতে যেয়ে হয়ত কিছু ভুলত্রুটি করছে। ইতিমধ্যে কতৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে সেখানে পুনরায় ‘সিডিউল’ অনুযায়ী কাজ সম্পন্নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্বে শ্যামনগর) জাকির হোসেন বলেন, ইতিমধ্যে তদন্ত করে দুইশ মিটার জায়গায় ‘থিকনেস’ ২০ মিলি পর্যন্ত পাওয়া গেছে। ঠিকাদারের সাথে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ঠিকাদার কাজটুকু করে দেবে বলে জানিয়েছে।

#