সংকটে চিংড়ি শিল্প


149 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সংকটে চিংড়ি শিল্প
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২২ কৃষি ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

রপ্তানিতে ব্র্যান্ডিং’র দাবী

বিশ্ব বাজারে চাহিদা কমেছে দেশের গলদা ও বাগদার

ডেস্ক রিপোর্ট ::

অব্যাহত লোডশেডিং ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে চিংড়ি শিল্প উদ্যোক্তারা। মৎস্য বিভাগ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন, অনাবৃষ্টি, ঘেরে পানিস্বল্পতা, অতিরিক্ত পোনা মজুদ, তাপমাত্রা ও পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ঘেরে চিংড়ি মারা যাচ্ছে। চাষিরা বলছে তাদের ঘেরে ভাইরাস সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। আবার অনেকে মনে করছেন, চিংড়ির ব্যাপক মড়কের জন্য পানি ও খাদ্যই দায়ী। এ অবস্থা চলতে থাকলে এ উপজেলায় চিংড়ি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে। আশির দশক থেকে বাণিজ্যিক ভাবে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে লোনাপানির চিংড়ি চাষ হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছর গুলোতে বিদেশে চিংড়ি রপ্তানি কমে গেছে। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের। তারা বলছেন, করোনার পর হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি একটু বাড়লেও যুদ্ধের ফলে রাশিয়ায় রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। ইউরোপের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সেসব দেশে চিংড়ি কেনা কমে গেছে। তা ছাড়া উৎপাদন, রপ্তানি দুটোই কমেছে। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এ খাত বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের নীতিসহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। দেশে বর্তমানে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও ময়মনসিংহে চিংড়ি চাষ হয়। রপ্তানির জন্য ১০৫টি চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৭৬টি ইইউর অনুমোদন পাওয়া। ১০৫টি কারখানার বছরে ৪ লাখ টন চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। এর বিপরীতে চিংড়ি উৎপাদন পৌনে তিন লাখ টনের কম। চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামাল না পাওয়ায় বর্তমানে ৪০টি কারখানা চালু আছে। এর মধ্যে নিয়মিত উৎপাদন করে ২৫-৩০টি কারখানা। সেগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি হয় ৪০৭ কোটি ২৫ লাখ ডলারের। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ৫০০ কোটি ডলারের। তবে তা পূরণের লক্ষণ দেখছেন না খাত সংশ্লিষ্টরা। ইপিবি ও বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) তথ্যমতে, রপ্তানি হওয়া হিমায়িত চিংড়ির ৮৫ শতাংশ যায় ইউরোপে। ১৫ শতাংশ আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি থেকে আয় হয় ৩০ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। এ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে এখন ৯৫ শতাংশই ভেনামি চিংড়ি। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ৯৫ শতাংশই বাগদা চিংড়ি। ভেনামি চাষে খরচ ২৫-৩০ শতাংশ কম হয়। কম উৎপাদনশীল গলদা ও বাগদা চিংড়ি দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। এ অবস্থায় বিশ্ববাজারে ভেনামি চিংড়ি সরবরাহ বৃদ্ধি করতে উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ছাড়া বাগদা চিংড়ির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে এটিকে নতুনভাবে ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন। হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. আমিন উল­াহ বলেন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির আয় কমছে। ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে নেমে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকায় ঠেকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রপ্তানি আয় বাড়তে থাকে। কিন্তু নতুন করে আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। এখন সরকারের নীতি সহায়তা বাড়ানো দরকার, তা না হলে চিংড়ি খাত বড় ক্ষতির মধ্যে পড়বে। তিনি বলেন, ১৫ বছর ধরে দামে সস্তা হওয়ায় বিশ^জুড়ে ভেনামি চিংড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বর্তমানে সারাবিশ্বে যে চিংড়ি রপ্তানি হয়, তার ৭৭ শতাংশই ভেনামি জাতের। অথচ আমাদের রপ্তানিতে এটি নেই। সে জন্য সম্ভাবনা থাকার পরও চিংড়ি রপ্তানির বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ। মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থ বছরে রাশিয়ায় রপ্তানি হয়েছিল ৭৩১ টন চিংড়ি, যার দাম ৫৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ২৪০ টন, যার দাম ২০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ইউক্রেনে রপ্তানি হয়েছিল ১১৯ টন চিংড়ি, যার দাম ১১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ২৯ টন, যার দাম ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। এদিকে, অজানা ভাইরাস সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে চিংড়ি শিল্পের সঙ্গে জড়িত ঘের মালিকদের। কেন এবং কি কারণে মাছ মরছে নেই এর সঠিক ব্যাখ্যা। তবে এ নিয়ে চিংড়ি শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে নানা মত। যার বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের পরাণপুর, মেন্দীনগর, নৈকাটি ও মির্জাপুর এই চারটি এলাকায় সাড়ে ৫ হাজার এলাকা জুড়ে বছর বছর চিংড়ি চাষ হয়ে আসছে। এর মধ্যে মেন্দীনগর মৌজায় ২ হাজার বিঘা, পরাণপুরে দেড় হাজার বিঘা, মির্জাপুর ও নৈকাটিতে এক হাজার করে বিঘা রয়েছে। এদিকে চাষি ও ঘের মালিকরা বলছেন, চিংড়ি শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের আন্তরিকতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।