সংলাপ ব্যর্থ হলে কঠোর আন্দোলন


264 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সংলাপ ব্যর্থ হলে কঠোর আন্দোলন
নভেম্বর ৩, ২০১৮ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

*’ইতিবাচক’ চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চায় ঐক্যফ্রন্ট

অনলাইন ডেস্ক ::

পাঁচ বছর পর বহু কাঙ্ক্ষিত প্রথম সংলাপ কার্যত ‘ফলপ্রসূ’ না হওয়ায় ‘হতাশ’ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংলাপসহ অতীতের সব সংলাপ ব্যর্থ হলেও এবার সহজেই হাল ছাড়তে রাজি নন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। দাবি নাকচ অথবা সংলাপ ব্যর্থ হলেও সেটা তারা বলতে রাজি নন। তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাইছেন। সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ‘ইতিবাচক’ মনোভাব রাখতে চান তারা। ঐক্যফ্রন্ট এখনও আশাবাদী যে সংলাপের মাধ্যমেই একটা সমাধান আসবে। এ লক্ষ্যে শিগগির ছোট আকারে ‘সুনির্দিষ্ট কমিটি’ গঠন করে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে সরকারবিরোধী এই জোট। প্রথম সংলাপের ফলাফল নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও পরবর্তী সংলাপের জন্য নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাও পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানাবেন তারা। এ সময়ের মধ্যে ছোট পরিসরে সংলাপের বিষয়ে ‘কার্যকর’ ও ‘অর্থবহ’ উদ্যোগ নিতে দ্রুত সরকারি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন তারা। তবে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সংলাপ ব্যর্থ হলে আন্দোলনের পথেই হাঁটবে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট।

বৃহস্পতিবারের প্রথম সংলাপে দাবি পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলবে। সূত্র জানায়, আগামী

মঙ্গলবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা থেকে জোটের নেতারা দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবেন। পর্যায়ক্রমে রাজশাহী, বরিশাল ও খুলনায়ও জনসভা করবেন তারা। বিভাগীয় শহরে জনসভার পাশাপাশি নেতারা ছোট পরিসরে আবার সংলাপে বসবেন। সংলাপ ফলপ্রসূ না হলে পর্যায়ক্রমে কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবেন তারা। এক্ষেত্রে সারাদেশে অবরোধের মতো কর্মসূচি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।

জোটের একাধিক সূত্র জানায়, সংবিধানের মধ্যে থেকেই সাত দফা দাবি মেনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বৃহস্পতিবারের সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আবার সংলাপে বসলে সংবিধানের মধ্য থেকেই সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি রূপরেখা দিতে চান তিনি।

এদিকে প্রথম দিনের সংলাপের পর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আজ শনিবার বৈঠকে বসবেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। অন্যদিকে দলীয়ভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী কর্মকৌশল নির্ধারণে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় জোটের প্রধান শরিক বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠক করেছে।

প্রথম দিনের সংলাপের বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন গতকাল শুক্রবার বলেছেন, একবার সংলাপে গেলাম, আর সব দাবি আদায় করে নিয়ে এলাম, তাতো ঠিক না। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্নের দাবিগুলো তুলে ধরেছি। আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংবিধানের মধ্য থেকেই সমাধান সম্ভব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা শুরু থেকেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে আসছেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা মনে করেন, বল এখন সরকারের কোর্টে। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকার কী করে তা দেখতে চান তারা। সরকার এবং নিজেদের ‘ভূমিকা’ দেশি-বিদেশিদের কাছে পরিস্কার করতে চাইবেন জোট নেতারা। তবে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত সংলাপ ব্যর্থ হলে আন্দোলনের কোনো বিকল্প থাকবে না।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সংলাপে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গ এলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘পারলে আন্দোলন করেই এ দাবি আদায় করুন’। এর ফলে মনে হচ্ছে যে আওয়ামী লীগই তাদের আন্দোলনের পথে ঠেলে দিতে চাচ্ছে। তবে সহজে সরকারের ফাঁদে পা দেবে না ঐক্যফ্রন্ট। সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চান তারা।

সূত্র জানায়, সংসদ বাতিল করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া ভোটে গিয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হতে চায় না ঐক্যফ্রন্ট। তবে দশম সংসদ নির্বাচনের মতো একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ‘খালি মাঠে গোল’ করার সুযোগও দিতে চায় না। দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করবেন বলে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ নেতারা।

সূত্র জানায়, সংলাপে সাত দফা দাবি পূরণের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য না আসায় গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতারা। তারা বলেন, সরকার সহজেই দাবি মেনে নেবে না। ফলে আন্দোলন ছাড়া বিকল্প নেই। আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন তারা। সরকার শেষ পর্যন্ত তাদের প্রধান দাবিগুলো না মানলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অথবা না নেওয়ার ব্যাপারে দলের তৃণমূল নেতাদের পাশাপাশি আপামর জনগণের মতামত নেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়। একইসঙ্গে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের কয়েকজন নেতার আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি-না তা নিয়েও আলোচনা হয়। সংলাপের জন্য নির্বাচনের সিডিউল পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তোলার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে আগামী মঙ্গলবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার কর্মসূচি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

আগামী ৮ নভেম্বরের পর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বলেছেন, আমাদের মূল বিষয়টা ছিল দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ সরকার- এ ব্যাপারে কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি। বরং যেটা এসেছে, সেটা হচ্ছে সংবিধান অনুযায়ী সব কিছু হবে। এটা আমাদের কাছে মনে হয় যে, আবার আলোচনা হবে। সরকারের দায়িত্ব হবে, সমস্যার সমাধান করতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোপ করে তফসিলটা পিছিয়ে দেওয়া। তিনি বলেন, সরকারকেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সমকালকে বলেন, সরকারের সঙ্গে প্রথম সংলাপের পরবর্তী করণীয় নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির নেতারা আজ শনিবার বৈঠকে বসবেন। বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। আজ ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রত্যেক দলই ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে তাদের মতামত জানাবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু গতকাল সমকালকে বলেন, সাত দফা দাবিতে জাতি ঐক্যবদ্ধ। এখনও সময় আছে। তারা আশা করেন, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। সমঝোতার লক্ষ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখা যেতে পারে। সংলাপ ফলপ্রসূ হতে পারে বলে তিনি এখনও আশাবাদী। এখন একটি ছোট কমিটি গঠন করে সংলাপ চালিয়ে নেওয়া যায়। সংবিধান সংশোধনও সম্ভব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা নৈরাজ্যে বিশ্বাসী নন। সার্বিক পরিস্থিতি দু’পক্ষই অবহিত আছে। আন্দোলনে মাঠে নামবো কি-না সেটা সময়ই বলে দেবে।

সংলাপের বিষয়ে ফ্রন্টের অন্যান্য দলের নেতারা জানান, সরকারের সঙ্গে তাদের সংলাপে এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। তাদের দেওয়া সাত দফা দাবির মধ্যে কয়েকটি দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবিক অর্থে মূল দাবি একটিও মানা হয়নি। ঐক্যফ্রন্টকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। গায়েবি মামলার তালিকা যাচাই-বাছাই করে বাতিল বা স্থগিত করা হবে- সে বিষয়ে ধূম্রজাল রয়েছে নেতাদের মধ্যে। রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি নেতাদের মুক্তির বিষয়টি নিয়েও তাদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। এর বাইরে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তাদের প্রধান দাবিগুলোকেই সরকার সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। তাই আগামী নির্বাচন নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে তা সহজে সমাধান হচ্ছে না বলে বিকল্প চিন্তা করতে শুরু করেছেন নেতারা।

অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নেতা সংলাপকে নিজেদের প্রাথমিক বিজয় হিসেবে দেখছেন। কারণ হিসেবে তারা বলেন, সরকার প্রথম থেকে এই সংলাপে বসবে না বলে জানিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের বসতে হয়েছে। এই সংলাপে তাদের সাত দফা দাবির মধ্যে প্রধান দাবিগুলো না মানলেও কিছু বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে, যা এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে নাকচ করা হয়েছিল। এসব বিষয় সামনে রেখে আগামীতেও দুই পক্ষ আলোচনার টেবিলে বসলে কিছু ফল আসতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

সংলাপের বিষয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, এই সংলাপে তাদের কিছুই অর্জন হয়নি। তাদের মধ্যে ভালো আলোচনার পরিবেশ ছিল। যে কারণে এই পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে সেটাই বাস্তবায়ন হয়নি। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করতে তাদের কোনো দাবিই সরকার মেনে নেয়নি। এমনকি সংবিধানের মধ্যে থেকেও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব, তাদের এমন প্রস্তাবেও সরকার কোনো উৎসাহ দেখায়নি। সংলাপে নৈশভোজ নিয়ে যে প্রচারণা করা হয়েছে তাতে সরকারের হীনম্মন্যতা প্রকাশ পেয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেছেন, এই সংলাপে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আশাপ্রদ কোনো ফল আসেনি। তবে আশা ছেড়ে দিলেও চলবে না, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলন যে সহিংস রূপ নিয়ে ছিল। সেই দায় এখনও বিএনপিকে বইতে হয়। দলটি এবার সে ধরনের পরিস্থিতিতে যেতে চায় না। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে চাইছে।

বিশ্নেষকদের অনেকে বলেছেন, সরকার এবং বিরোধী জোট, দুই পক্ষেরই রাজনৈতিক কারণে এ সংলাপ প্রয়োজন ছিল। নির্বাচনের আগে দু’পক্ষই দেখাতে চেয়েছে যে, তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চেয়েছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দল বিএনপি দুই দলেই সংলাপবিরোধী অংশও রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লোক দেখানো এই সংলাপ হয়েছে বলে মনে করেন কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্নেষক।

আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকে বলেছেন, বিএনপি সংলাপে যোগ দিয়ে সংবিধানের ভেতরে থেকে কোনো প্রস্তাব দিতে পারেনি। ফলে তাদের আর কিছু করার নেই। দুই পক্ষের ছাড় দেওয়ার মানসিকতা বিশ্নেষকদের সন্দেহ রয়েছে।

সূত্র : দৈনিক সমকাল।তারিখ—-০৩-১১-১৮