সমমর্যাদার লড়াইয়ে পুরুষকেও নারীর পাশে থাকতে হবে


432 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সমমর্যাদার লড়াইয়ে পুরুষকেও নারীর পাশে থাকতে হবে
মার্চ ৩, ২০১৭ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক ::
বাংলাদেশের উন্নয়নে নারীর অবদান খুবই দৃশ্যমান। তবে তাদের অবদান অদৃশ্য করে রাখতে রাজনীতি হচ্ছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) নারীর অগ্রগতিতে দেশ যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে। কর্মক্ষেত্রকে নারীবান্ধব করার দায়িত্ব সবার। সেখানে পুরুষ দ্বারা নারী যাতে নির্যাতিত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে শুধু নারী হিসেবে না দেখে, মানুষ হিসেবেও দেখতে হবে। তবেই তাদের শতভাগ অগ্রগতি সাধিত হবে। নারীর সমমর্যাদা অর্জনের লড়াইয়ে পুরুষকেও পাশে থাকতে হবে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার সমকালের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘উন্নয়নে নারীর অদৃশ্য অবদান ও তার পেছনের গল্প’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সমকাল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যৌথভাবে গোলটেবিলটির আয়োজন করে। সহযোগিতা করে ইউএনডিপি।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, শ্রম সচিব মিকাইল শিপার, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন, সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব

মিজানুর রহমান, উইমেন চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারপারসন সেলিমা আহমাদ, নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির, আইডিএলসি ফাইনান্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ খান, মহিলা পরিষদের আন্তর্জাতিক সম্পাদক রেখা সাহা, অ্যাকশন এইডের নারী অধিকার শাখার ব্যবস্থাপক কাশফিয়া ফিরোজ, অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক তাসলিমা আক্তার, প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের (ডবি্লউডিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন্নাহার মিষ্টি এবং ইউএনডিপির প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা শর্মিলা র‌্যাসল। এতে নিজেদের সংগ্রামী জীবনে সফলতার পেছনের গল্প তুলে ধরেন গার্মেন্টসকর্মী রুপালী আক্তার, অভিবাসী শ্রমিক উম্মে কুলসুম আক্তার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাছিনা বেগম ও শামসুন্নাহার। সমকালের সহযোগী সম্পাদক অজয় দাশগুপ্তের সঞ্চালনায় গোলটেবিলে ধন্যবাদ জানান মানবাধিকার কমিশনার নুরুন নাহার ওসমানী।

কাজী রিয়াজুল হক বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন না হলে দেশ সমৃদ্ধশালী হবে না। ৫১ ভাগ নারীকে পিছিয়ে রেখে দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি কমিটি করেছে। নির্যাতিত ও সংক্ষুব্ধ যে কোনো নারী অভিযোগ নিয়ে আসতে পারেন। সবার কথা শুনে কমিশন ব্যবস্থা নেবে। সাবেক এই আমলা আরও বলেন, সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে। এ জন্য বর্তমান সরকারের সময়ই সর্বোত্তম। বিশেষ ধারা বাতিলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গোলাম সারওয়ার বলেন, আজকের প্রতিপাদ্য নারীর অদৃশ্য অবদান ও তার পেছনের গল্প। আসলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অবদান মোটেই অদৃশ্য নয়। সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। চোখ থাকলেও আমরা দেখতে পাই না। তিনি বলেন, সমমর্যাদা অর্জনের লড়াই শুধু নারীদের নয়, এ লড়াইয়ে পুরুষকেও পাশে থাকতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রীর নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে সমকাল সম্পাদক বলেন, এ ক্ষেত্রে আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে। তিনি বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ‘বিশেষ ধারা’ বাতিল করে আইনটি সংশোধনের দাবি জানান। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বীয় ভূমিকা নির্ভীকভাবে পালনের পরামর্শ দেন।

মিকাইল শিপার বলেন, সেবা খাতে শিক্ষিত নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। তবে তাদের অধিকার নিশ্চিতের জন্য কোনো শ্রম আইন হয়নি। এটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। ডে-কেয়ার সেন্টার নিয়ে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, এটা বাস্তবায়ন করা গেলে কর্মক্ষেত্রে নারীর উৎপাদনশীলতা ও ক্ষমতায়ন আরও বাড়বে। তিনি আরও বলেন, দুটি বৃহৎ ইনফরমাল সেক্টর হচ্ছে কৃষি ও নির্মাণ শিল্প। এখানেও পুরুষের পাশাপাশি নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও সমান বেতন নিশ্চিত করা যায়নি। তবে সরকার চেষ্টা করছে। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা হয়েছে।

নাছিমা বেগম বলেন, বঙ্গবন্ধু প্রণীত ‘৭২ সালের সংবিধানে নারীর সমানাধিকার রয়েছে। তার আলোকে নারীর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন না হলে তা ভুল হবে। একটি মেয়ের ঘরসংসার ও গৃহস্থালির অদৃশ্যমান কাজগুলো বিবেচনায় নিলে জিডিপিতে নারীর অবদান দুই-তিনগুণ বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, যে পরিবারে নারী আয় করে সেখানে আনন্দ বাড়ে।

অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন বলেন, রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এখনও কোনো প্রতিষ্ঠানে নারী প্রধান থাকলে তাকে দুইবারে প্রমাণ করতে হয়; নারী হিসেবে তিনি যোগ্য। তিনি বলেন, দেশে দরিদ্র কমার পেছনের শক্তি নারী। তবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে শুধু একটি লক্ষ্য সামনে রাখলে হবে না। এসডিজির ১৭টি বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙেপড়া, একক পরিবার না থাকা, শিশুদের দেখার লোকের সংকটের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, উন্নয়নে নারীর অবদান অদৃশ্য করে রাখার ‘রাজনীতি’ কেউ সচেতনভাবে আবার কেউ অসচেতনভাবে করছেন। সব নারী শ্রমিকের গল্প এক রকম নয়। তাদের অদৃশ্য গল্প আছে, না শোনার গল্পও আছে। পিতৃতন্ত্র ও ক্ষমতা দিয়ে পেছনের গল্পটা সামনে আসতে দেওয়া হয় না। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দেশ নারীদের কারণেই এগোচ্ছে। ৫০ ভাগ নারীকে যতই নির্যাতন করা হোক না কেন, তাদের আন্দোলন-সংগ্রাম ও কর্মে বৃহৎ অংশগ্রহণ এগিয়ে নেবে। তবে তাদের মানুষ হিসেবে না দেখলে অবদান কখনোই দৃশ্যমান হবে না; অদৃশ্যই থেকে যাবে। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রই নারীবান্ধব। তবে ‘৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে সংবিধানের চার মূলনীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা হয়েছিল, তা নারীর জন্যও বিশাল ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এখন আমরা ‘৯৭-এর নারী নীতিতে ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘৭২-এর সংবিধানেও ফিরতে পারছি না।

সেলিমা আহমাদ বলেন, নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে প্রথম বাধা হচ্ছে সমাজ। এরপর সে প্রাপ্ত অর্থ কীভাবে ব্যবহার করবে, ট্যাক্স কীভাবে দেবে সেই চ্যালেঞ্জেও পড়তে হয়। সেই বাস্তবতায় এ বছরের নারী দিবসের থিম তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে পরিবর্তনে জন্য সাহসী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে শুধু নারীর একা সাহসী হওয়া নয়; সমাজ, পিতা, স্বামী, নীতিনির্ধারক সবাইকে সাহসী হতে হবে। সম্পত্তির সমানাধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সাহসিকতা কি দেখা যাবে_ সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি। নারীকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে ধর্মের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকাটাও দায়ী বলে তার অভিমত।

নারীর সামাজিক নিরাপত্তা সৃষ্টির ওপর জোর দিয়ে খুশী কবির বলেন, শুধু অর্থনৈতিক মুক্তি পেলেই হবে না, নারীর হাতে নিয়ন্ত্রণও থাকতে হবে। পরিবার, সমাজ, সংগঠন সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা করতে হবে, যাতে নারী মনে করে তার পেছনে শক্তি আছে।

আরিফ খান বলেন, পরিসংখ্যান বলছে, মহিলা উদ্যোক্তাদের ঋণ দিলে ঝুঁকি কম। তাই তাদের আরও ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। মহিলাদের তারা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত ছাড়াই ঋণ দেন। তবে এ ক্ষেত্রে যাচাই করতে হয় কাকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। তা ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে কি-না। নারী উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার তাগাদা দিয়ে মিজানুর রহমান বলেন, উন্নয়ন হতে হবে সমন্বিত। কোনো অংশকে বাদ দিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

নারী আন্দোলনের ভূমিকা উল্লেখ করে রেখা সাহা বলেন, নারীর অদৃশ্য অবদানকে দৃশ্যমান করতে নারী আন্দোলন শুরু থেকেই ভূমিকা রেখেছে। প্রতিটি অর্জনের পেছনে নারী সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ রয়েছে। কাশফিয়া ফিরোজ বলেন, নারীকে বাসায় ফিরেও কাজ করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে নারীর কাজের পুনর্বণ্টন হওয়া দরকার। সুমাইয়া ইসলাম বলেন, সরকারি হিসাব মতে ৯ লাখ নারী অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। তাদের যে বিশাল রেমিট্যান্স তা হিসাবে আসছে না। অভিবাসী এসব শ্রমিকের সমস্যার দিকে দূতাবাসগুলোকে নজর দিতে হবে। তাসলিমা আক্তার বলেন, মধ্যবিত্ত নারীরাও যুক্ত হচ্ছে আর্থিক কর্মকাণ্ডে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিবন্ধী নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আশরাফুন্নাহার মিষ্টি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারেরর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শর্মিলা র‌্যাসল বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দারিদ্র দূরীকরণসহ প্রতিটি খাতেই নারীর শক্তিশালী অবদান রয়েছে।