সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি


498 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি
জুলাই ১৩, ২০১৫ জাতীয়
Print Friendly, PDF & Email

ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকম ডেস্ক :
অনিয়ম, ঘুষ আর দুর্নীতির কারণে অনেক তরুণ মেধাবী সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রভাবশালীদের তদবিরের স্তূপ নিয়োগদানকারী কর্তৃপক্ষের টেবিলে। মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় নিয়োগ নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। আদালতের শরণাপন্নও হতে হচ্ছে অনেক চাকরিপ্রত্যাশীকে। এহেন পরিস্থিতিতে জনবল নিয়োগে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জোরালো হয়ে উঠছে। মাঝে মধ্যে সচিব সভায় নিয়োগে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন নিয়ে আলোচনা হলেও তা কথার কথাই থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর নিয়োগে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করে তার অধীনে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলে অভিযোগ অনেকটা কমে আসবে।

প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা নিয়োগ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানে দুর্নীতির সুযোগ কম। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সমকালকে বলেন, সচিব সভায় অনেক কিছুই আলোচনা হয়, সবই কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ হয় না। এটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তিনি বলেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী পদে নিয়োগে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন কতটা বাস্তবসম্মত তা গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। বর্তমান নিয়োগ পদ্ধতি শক্তিশালী করলে অভিযোগ কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

এ ব্যাপারে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান সমকালকে বলেন, ছোট বা বড় যে চাকরিই হোক যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তা না হলে সমাজে বৈষম্য ও অসন্তোষ বাড়বে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চাকরিপ্রত্যাশীদের অভিযোগ থেকে জানা গেছে, সরকারি নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েও অনেক ক্ষেত্রে চাকরি মিলছে না। অর্থ দিলেই মিলছে। এটি এখন ওপেন সিক্রেট। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্তার পছন্দসই লোক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব না হলে ওই নিয়োগ স্থগিত বা বাতিল করা হচ্ছে।

এভাবে সরকারি চাকরি চলে যাচ্ছে অযোগ্যদের হাতে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করেও চাকরি থেকে বঞ্চিত এমন একজন প্রার্থীর সঙ্গে দেখা মেলে এ প্রতিবেদকের। তিনি এসেছিলেন সচিবালয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ দিতে। তার অভিযোগ, তিনি সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় একাধিকবার নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দুটোতেই ভালো করেছেন। ঘুষের টাকা সংগ্রহ করতে না পারায় ও ক্ষমতাবান কারও তদবির না থাকায় তিনি চাকরি পাননি। অথচ তার সরকারি চাকরির বয়সও শেষের দিকে।

এমন কয়েকজন চাকরি প্রার্থী নীলফামারির সুমনা ইসলাম, রিপন রায়, রংপুরের জহির উদ্দিন ও যশোরের মামুন হোসেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ দিয়েছেন তারা। জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেড় লাখ শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ হাজার পদে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১ লাখ জনবল নিয়োগ শিগগিরই সম্পন্ন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এই নিয়োগের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে। আবার এরই মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া কিছু সংস্থার নিয়োগ পদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অজানা কারণে কিছু সংস্থার নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। আবার এমনও সংস্থার খোঁজ পাওয়া গেছে, যারা নিয়োগের সার্কুলার দিয়েও বাতিল করেছে। পরে ওই সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলা হচ্ছে, কিছু আইনি জটিলতায় নিয়োগ বন্ধ করা হয়েছে। তবে কী জটিলতা তা সংশ্লিষ্টরা পরিষ্কার করছেন না।

পুলিশ নিয়োগে অভিযোগ: সাম্প্রতিক সময়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগে। চলতি বছরের প্রথম দিকে ১০ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগ নিয়ে প্রভাবশালী কয়েকজন এমপি অভিযোগ আনেন। কেউ কেউ লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তাদের অভিযোগ বেশির ভাগই পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে। নিয়োগ কমিটিকে উপেক্ষা করে জেলা পুলিশ সুপাররা ইচ্ছামতো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন এমনই অভিযোগ এমপিদের। তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপাররা দাবি করেছেন, এমপিদের মনোনীত প্রার্থী নিয়োগ না দেওয়ায় এমন অভিযোগ আনা হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ থমকে আছে দীর্ঘদিন ধরে:  খাদ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। সর্বশেষ দুটি পদে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গেল ফেব্রুয়ারিতে। এরই মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এখনও এ নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। তবে খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আইনি জটিলতার কারণে এ নিয়োগ থমকে গেছে।

অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, ওই মন্ত্রণালয়ের কোনো কোনো কর্মকর্তার পছন্দের প্রার্থীরা নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফলে না আসায় তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। অবশ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করেছেন।

দুই বছর পরও নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারেনি রেলওয়ে: ২০১৩ সালের শুরুতেই রেলের বিভিন্ন পদে সাড়ে ৭ হাজার লোক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এর পর ২ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও রেলের কোনো পদেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট বিভাগ। প্রতিটি পদের বিপরীতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সাংসদসহ দলীয় নেতকর্মীদের হাজার হাজার সুপারিশ রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে নিয়োগ কমিটির সুপারিশ। এখন রেল বিভাগ এসব পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারছে না। ফলে এ বিভাগের লোকাবল শূন্য থেকেই যাচ্ছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি নিয়োগে যা হচ্ছে: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি নিয়োগেও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩৬ হাজার ৯৮৮ জন দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। কিছুদিন পরে অজানা কারণে তা বাতিল করা হয়। এর আগে এ পদে সমসংখ্যক জনবল নিয়োগে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। সাত হাজার টাকা বেতনের এই চাকরির জন্য চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ওই পদে চাকরিপ্রত্যাশীরা ।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের নিয়োগে বিতর্ক:  পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে প্রায় ৪ হাজার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী পদে লোকবল নিয়োগ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রায় ১ বছর আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা এখনও সম্পন্ন হয়নি। একজন পরিচালক এ নিয়োগ স্বচ্ছ করতে লিখিত পরীক্ষার খাতা দেখতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু ওই সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তাদের চাপ ছিল লিখিত পরীক্ষার খাতা কোনো বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে দেখানোর। পরিচালকের সিদ্ধান্তে ওই পদ্বতিতে খাতা দেখানো সম্ভব হয়নি।

ফলে লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে ঊর্ধ্বতন কর্তাদের পছন্দের লোকজন না আসায় ওই পরিচালককে বদলি করা হয়। পরে থমকে যায় নিয়োগ প্রক্রিয়া। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এর পর শুরু হয় নিয়োগের বাকি প্রক্রিয়া। দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন পরিচালককে। তিনি মৌখিক পরীক্ষাও সম্পন্ন করছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এ সিন্ডিকেট যেভাবে প্রার্থী মনোনীত করছেন সেভাবেই হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এ সিন্ডিকেটকে যারা ‘ম্যানেজ’ করছে তাদের চূড়ান্ত ফলাফলে মনোনীত করা হচ্ছে।

সূত্র : সমকাল অন লাইন