সরস্বতী পূজা : অসারকে ফেলে শুধু সারকে গ্রহণ করা


181 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সরস্বতী পূজা : অসারকে ফেলে শুধু সারকে গ্রহণ করা
ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২২ ইতিহাস ঐতিহ্য ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

সচ্চিদানন্দ দে সদয় ::

আজ বসন্ত পঞ্চমী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মঠমন্দির, গৃহে পূজিতা হবেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী। সকাল সকাল স্নান সেরে তাঁর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। হিন্দু পুরাণ মতে, সরস্বতী হলেন জ্ঞান, বিদ্যা এবং শিল্পের দেবী। তিনি সর্বশুক্লা। তাঁর হাতে থাকে বীণা। তাই দেবীর অপর নাম বীণাপাণি। সঙ্গে বাহন হিসাবে থাকে সাদা রাজহাঁস। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর বাহন হিসাবে দেখা যায় শ্বেত রাজহংস। এর পিছনে রয়েছে এক কারণ। রাজহাঁসই একমাত্র পাখি যে পাত্রের মধ্যে থাকা জলমিশ্রিত দুধ থেকে শুধুমাত্র দুধটি শুষে নিতে পারে। অর্থাৎ অসারকে ফেলে সে শুধু সার গ্রহণ করে। যেহেতু দেবী জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী। সরস্বতীর গায়ের রঙ সাদা পুরাণ মতে, ভগবান ব্রহ্মার মুখগহŸর থেকে দেবী সরস্বতীর জন্ম। অপরদিকে ব্রহ্মার নারী রূপই হল সরস্বতী। দেবী সরস্বতী তাই নিষ্কলুষিতা। তিনি সর্বগুণ সম্পন্নাও বটে৷

তিনি দোষহীনা। তাই তাঁর রূপ শুভ্রবর্ণা। মনে করা হয়, ভালো কিছুর প্রতীক হল সাদা। দেবীর সাদা রূপ তাঁর নিষ্কলুষ চরিত্রেরই প্রতীক। তিনি যেন সাক্ষাৎ পবিত্রতার মূর্তি। বিদ্যা এবং শিল্পের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর এক হাতে থাকে বীণা। অপর হাতে থাকে বই। পাণি কথার অর্থ হল হাত। তাই হাতে বীণা থাকার দরুন তাঁর আরেক নাম-বীণাপাণি। কথিত রয়েছে, সরস্বতীর সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলে বীণার ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। যার সুর অত্যন্ত মনোরম। হিন্দু ধর্মে নাচ, গান এবং অন্যান্য শিল্পকলার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। দেবীর হাতের বীণা সেই শিল্পেরই প্রতীক মাত্র। দেবীর হাতে থাকা বইটি হল ‘বেদ’। যা থেকে এসেছে বিদ্যা। সরস্বতী যেহেতু শিক্ষার দেবী, তাই পড়ুয়াদের জ্ঞান অন্বেষণের জন্য বিদ্যালাভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেবীর হাতে থাকে বই। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সহধর্মিণী এবং বিষ্ণুপতœী লক্ষ¥ী ও মহেশ্বরজায়া পার্বতীর সঙ্গে একযোগে ত্রিদেবী নামে পরিচিত দেবী সরস্বতী। পুরাণ অনুযায়ী দেবী সরস্বতী ব্রহ্মের মুখ থেকে উত্থান। দেবীর সকল সৌন্দর্য্য ও দীপ্তির উৎস মূলত ব্রহ্মা। পঞ্চ মস্তকধারী দেবী ব্রহ্মা এক স্বকীয় নিদর্শন। পূজার জন্য দেবী সরস্বতীর মূর্তি শ্বেতবস্ত্র পরিধান করে থাকে যা পবিত্রতার নিদর্শন বলে পরিচিত। বিশ্বভূবন প্রকাশ সরস্বতীর জ্যোতিতে। হৃদয়ে সে আলোকবর্তিকা যখন প্রজ্বলিত হয়, তখন জমাট বাধা অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার যায় দূর হয়ে। অন্তরে, বাইরে সর্বত্র তখন জ্বলতে থাকে জ্ঞানের পুণ্য জ্যোতি। এই জ্যোতিজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী, তাই তিনি সর্বশুক্লা।

তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্ত¡গুনময়ী, অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক বাগ্দেবী। গতিময় জ্ঞানের জন্যই ঋগ্বেদে তাঁকে নদীরূপা কল্পনা করা হয়েছে, যিনি প্রবাহরূপে কর্মের দ্বারা মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছেন। কল্যাণময়ী নদীতটে সাম গায়কেরা বেদমন্ত্র উচ্চারণে ও সাধনে নিমগ্ন হতো। তাদের কণ্ঠে উদ্গীত সাম সঙ্গীতের প্রতীকী বীণা দেবীর করকমলে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয় করে সাধনা করতেন আশ্রমবাসী ঋষিগণ। সেই ভাবটি নিয়েই দেবী ‘পুস্তক হস্তে, গ্রন্থ রচনার সহায়ক লেখনীটিও তাঁর সঙ্গে। মার্কগেুয় পুরাণে শ্রীশ্রীচন্ডী উত্তরলীলায় শুম্ভ নিশুম্ভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবীর যে মূর্তির কল্পনা করা হয়েছিল তা ছিল মহাসরস্বতীম। সরস্বতী শব্দের দুই অর্থ-একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্ + বতী = সরস্বতী, অর্থ জ্যোতির্ময়ী। আবার সৃ ধাতু নিস্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী। ঋগ্েেবদে আছে ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী’, সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব।সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজা বর্তমান রূপটি আধুনিক কালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীন কালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির উপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াতকলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিলো। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্রেরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করতো। গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিংশ শতাব্দীতেও প্রচলিত ছিলো।

শহরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করতেন। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা যায়। সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যথা: অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পূজার জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলও প্রয়োজন হয়। লোকাঁচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পূজার পূর্বে কুল ভক্ষণ করেন না। পূজার দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। এই দিন ছোটদের হাতেখড়ি দিয়ে পাঠ্যজীবন শুরু হয়। পূজান্তে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের দল বেঁধে অঞ্জলি দিতে দেখা যায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম এই ধর্মীয় উৎসবে পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন অগণিত ভক্ত। মর্তের ভক্তকুল শ্বেতশুভ্র কল্যাণময়ী দেবী সরস্বতীর আবাহন করবে। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে কল্যাণময়ী দেবীর পাদপদ্মে প্রণতি জানাবেন তারা। ঢাক-ঢোল-কাঁসর, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে দেশের বিভিন্ন পূজামন্ডপ। তাই দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে জ্ঞানের দেবী, বিদ্যার দেবী সরস্বতীর কাছে আমাদের কামনা-সত্য, সুন্দর ও পবিত্রতার পথে তিনি আমাদের পরিচালিত করুন। কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠেএকঅসা¤প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ববোধে যেন আমরা আবদ্ধ হয়ে হাজার বছরের ঐতিহ্য বাঙালি সংস্কৃতিকে ধরে আমাদের দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারি। দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদ ও কল্যাণে দূর হোক সব অন্ধকার, জ্ঞানের আলোয় আলোকিত বিশ্ব হোক শুভ্রময়। (সংকলিত)