সাংবাদিকদের অনুদানের চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী : বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে সমালোচনা করুন


461 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাংবাদিকদের অনুদানের চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী : বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে সমালোচনা করুন
জুলাই ১৭, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে গঠনমূলক সমালোচনা করার জন্য সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আপনাদের হাতে কলম রয়েছে, যা কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত হবে না। আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে আপনাদের লেখনীতে দেশের অগ্রগতি থেমে না যায় এবং শত্রুরা সুযোগ না পায়।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার তার তেজগাঁও কার্যালয়ে ১৭৭ অসচ্ছল সাংবাদিককে সহায়তা ভাতা ও অনুদানের চেক বিতরণে তথ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সমালোচনায় ভয় পান না; বরং সমালোচনা তাকে ভালো-মন্দ বুঝতে সাহায্য করে। তবে দেশ ও জনগণের ক্ষতি করে এমন সমালোচনা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকরা সরকারের কর্মকাণ্ডে ত্রুটি খুঁজে পেতে পারেন। তবে সঠিকভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাবেন যে, আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছি এবং বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা এখানেই থেমে থাকব না_ এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন অনুসরণ করে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশে পরিণত হবে। তিনি দেশের উন্নয়নবিরোধী কর্মকাণ্ড, ধ্বংসাত্মক রাজনীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ করতে সাংবাদিকদের সহায়তা কামনা করেন। সমালোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় সাংবাদিকরা ‘মিথ্যা ও ভুল তথ্য’ পরিবেশন করেন, এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা এখন পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এই খাতে কর্মসংস্থানও বেড়েছে। ১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারি মালিকানায় টেলিভিশন সম্প্রচার উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন তিনি। খবর বাসস, বিডিনিউজ, বাংলা নিউজ, ইউএনবি। সাংবাদিকদের সহায়তার জন্য স্থায়ী তহবিল গঠনে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে সরকারের পাশাপাশি সম্পদশালী গণমাধ্যম মালিক ও সমাজের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। সাংবাদিকদের আবাসনের জন্য সরকারের নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি এখন থেকে প্লটের পরিবর্তে ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সাংবাদিককে প্লট দেওয়া হয়েছে। অনেকেই প্লট পেয়েছেন, কিন্তু প্লট নিবন্ধন করার মতো টাকা নেই তাদের।

তাই ভবিষ্যতে ভিন্নভাবে পরিকল্পনা করা হবে। এখন ঢাকা শহরে হায়ার-পারচেজ (ভাড়া মূল্য হিসেবে পরিশোধ হওয়া) ভিত্তিতে ফ্ল্যাট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব শিগগির এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন তিনি। যেসব গণমাধ্যম সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করবে না, তাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ‘সীমিত’ করে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার গ্রেফতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেলে থাকতে অনেক রকম প্রস্তাব এসেছে। অনেক কিছু বলা হয়েছে। কিন্তু একটাই লক্ষ্য ছিল, নির্বাচন চাই, গণতন্ত্র চাই। বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনতে ওই সময় সাংবাদিকদের সাহসী ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। বাংলাদেশকে উন্নত দেশে ?উন্নীত করতে সাংবাদিকদের কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

এ সময় দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ক্রিকেট দলের সিরিজ জয়ের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সাফল্য থেকে বোঝা যায়, যদি সবাই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে, তাহলে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে নিতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। নিজেদের স্বার্থে অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পেশাদার সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘হাতে কলম থাকলে, সে কলমের অপব্যবহার হলে, একদিন না একদিন সেটা প্রকাশ পাবেই।’ সাংবাদিকতার একটি নিয়মনীতি রয়েছে একথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র হনন করে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, যদি ভুল তথ্য দিয়ে চরিত্র হনন করা হয়, পরে যতই রিজয়েন্ডার দেওয়া হোক না কেন, যে ক্ষতি হয় তা আর পূরণ করা যায় না। দেশের প্রতি সাংবাদিকদের নিরলস সেবার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তারা কাজ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা সত্ত্বেও তার সরকার সাংবাদিকদের জন্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। শেখ হাসিনা বলেন, দেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা ভূমিকা পালন করছেন। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা দেশের গণতন্ত্র ব্যাহত এবং সরকার উচ্ছেদের জন্য বিএনপি-জামায়াতের দেশব্যাপী সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের লালন এবং রাজনীতির নামে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে মতামত প্রদান ও সোচ্চার হওয়ার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। সামাজিক অস্থিরতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা অপরাধীদের গ্রেফতারে সহযোগিতা করতে পারেন। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্রকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং গ্রাম ও শহরের মধ্যে আয়ের ব্যবধান কমানোর মাধ্যমে দেশের প্রকৃত উন্নয়নে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার সাংবাদিকদের জন্য অনেকগুলো সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জার্নালিস্ট ওয়ার্কার (টার্মস অব জব) বিল-২০১৫ গঠন করা হয়েছে এবং অচিরেই এটি আইনে পরিণত হবে। সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪ প্রণয়নের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ নীতিমালার আওতায় সম্প্রচার কমিশন আইন প্রণয়ন করা হবে। যত শিগগির সম্ভব এ আইন প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করা হবে।’

শিগগির অনলাইন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে অসংখ্য অনলাইন গণমাধ্যম চালু রয়েছে। বর্তমানে অনলাইন গণমাধ্যমের কোনো নীতিমালা নেই। এখানে অনেক সময় এমন সব ছবি-তথ্য আসে, যেটা সমাজের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে শিশুদের জন্য। এ জন্য একটা অনলাইন নীতিমালা একান্তভাবে প্রয়োজন।’ অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও বক্তৃতা করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদে তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এ কে এম রহমত উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ও তথ্য সচিব মরতুজা আহমেদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব আবদুল জলিল ভূঁইয়া, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি আলতাফ মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ। এ ছাড়াও সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, প্রবীণ সাংবাদিক শাহজাহান মিঞা, বাসসের প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, ৭১ টিভির প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল বাবু উপস্থিত ছিলেন। ১৭৭ জনের মধ্যে ৬৩ জন সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুদানের চেক গ্রহণ করেন। অবশিষ্ট চেক সাংবাদিক ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট শাখা বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হবে। অসুস্থ, অসচ্ছল ও আহত সাংবাদিক এবং নিহত সাংবাদিকের পরিবারের সদস্যদের জন্য বর্তমান সরকারের আমলে প্রণীত নীতিমালার আওতায় গঠিত আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে এ অনুদান দেওয়া হয়। এ সরকারের আমলে সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তার জন্য প্রথম গৃহীত এ ব্যবস্থায় গত চার বছরে ৬২৩ জন সাংবাদিক ও তাদের পরিবারকে তিন কোটি ৮০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়।