সাতক্ষীরার আশাশুনিতে আম্পানের রেশ এখনও কাটেনি !


238 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার আশাশুনিতে আম্পানের রেশ এখনও কাটেনি !
এপ্রিল ১, ২০২১ আশাশুনি ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

নদীতে পূর্ণিমার প্রবল আকর্ষণ

আবার ভাঙলো বেড়িবাঁধ

ছয় গ্রামের মানুষ পানিবন্দি

স্টাফ রিপোর্টার

সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকায় ঘুর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষগ্রিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ গত ১১ মাসেও সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। অসংখ্য জায়গায় ঝুকিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। নদীতে একটু জোয়ার বাড়লেই বেড়িবাঁধ উপচে নদীর পানি লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসছে। ‘সুপার মুন’ পূর্ণিমার প্রবল আকর্ষণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে আশাশুনির খেলপেটোয়া নদীর দয়ারঘাট-জেলেখালি এলাকায় বিকল্প রিংবাঁধ ভেঙে চারটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে আশাশুনি উপজেলা সদরের দয়ারঘাট, দক্ষিণপাড়া, আশাশুনি সদর, জেলেখালি, গাছতলা গ্রামের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘেরে নদীর নোনাপানি ঢুকে পড়ে। স্থানীয়রা স্বেচ্চাশ্রমের ভিত্তিতে রাতভর ধসেপড়া বেড়িবাঁধ রক্ষার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। বুধবার একই এলাকায় দিয়ে নদীর প্রবল জোয়ারের পানি লোকালয়ের দিকে ছুটে আসছে। একই ভাবে আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নে কুড়িকাউনিয়া, হরিসখালি ও সুভদ্রকাটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ওইসব এলাকার উপর দিয়ে নদীর উত্তল ¯্রােত প্রবাহিত হচ্ছে।
আশাশুনি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অসীম বরণ চক্রবর্তী জানান, খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারের পানিতে জেলেখালি-দয়ারঘাট রিংবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে হু হু করে পানি ঢুকছে। গ্রামবাসি স্বেচ্ছাশ্রমে শত চেষ্টা করেও ভাঙন ঠেকাতে পারেনি। এতে এলাকার মৎস্য ঘের, ঘর-বাড়ি নতুন করে প্লাবিত হতে শুরু করেছে। মাত্র কয়েকমাস আগে রিংবাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। গত বছর ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্পানে আশাশুনির দশটি পয়েন্টে ভেঙে যায়। যার মধ্যে দয়ারঘাটও ছিল। তখন ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিলো। সেই ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে বিকল্প রিংবাঁধ দেয়া হয়। স্থানীয় মানুষের দাবী ছিলো ত্রাণ নয়, তারা চায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ। তার রেশ কাটতে না কাটতেই বাঁধটি ভেঙে যাওয়ায় ফের নতুন করে এলাকার মানুষ দুর্দশায় পড়লো।

আশাশুনি সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান স ম সেলিম রেজা মিলন জানান, খোলপেটুয়া নদীর দয়ারঘাট এলাকার বেড়িবাঁধটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিলো। মঙ্গলবার দুপুরে প্রবল জোয়ারের তোড়ে তা ভেঙে জেলেখালি, দয়ারঘাট ও উপজেলা সদরের দক্ষিণ এলাকা প্লাবিত হয়। বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় আমরা মেরামতের চেষ্টা করে যাচ্ছি । কিন্তু বুধবার দুপুরের জোয়ারে আবারও তা ধসেগেছে। এতে কমপক্ষে শতাধিক বাড়ি এবং অর্ধশতাধিক মৎস্য ঘের প্লাবিত হয়েছে। তিনি বলেন, মৎস্য চাষ এই এলাকার প্রধান পেশা। আম্পানে সব জলে ভেসে গেছে। আম্পানের রেশ কাটাতে মানুষ-জন মৎস্য ঘেরে নতুন উদ্যমে মাছ ছেড়ে ছিলো। মাছ ধরার মতো হয়েছে। এরমধ্যে বাঁধ ভেঙে আবারও জলে ভেসেগেছে তাদের সব সপ¥।

স্থানীয়রা জানায়, ঋতু পরিবর্তনের কারনে শীত মৌসুমে নদীতে মরাগোন এবং গরম মৌসুমে ভরাগোন ওঠে। গরম মৌসুমে নদী উত্তল থাকে। চলতি মৌসুমজুড়ে ভরাগোন থাকবে। মরাগোনে ক্ষতিগ্রস্ত যে সমস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি এই ভরা মৌসুমে তা আর রক্ষা করা সম্ভব নয়। ‘সুপার মুন’ পূর্ণিমার টানে নদীদে জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে। সেই জলোচ্ছ্বাসে এই ৫টি পয়েন্ট ধসে পড়েছে। ধসেপড়া বাঁধ যদি সংস্কার করা নাগেলে আশাশুনি উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন প্লাবিত হবে। তারা বলেন, আম্পানের ৮ মাস পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিধ্বস্ত প্রতাপনগর ও শ্রীউলা দুই ইউনিয়নে বাঁধ দিয়ে পানি আটকানো হলেও অজ্ঞাত কারণে বাকি থেকে যায় আশাশুনি সদরের দয়ারঘাট গ্রামের বাঁধটি। এ বাঁধটি নিয়ে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড নানা রকমভাবে স্থানীয়দের আশ্বস্ত করলেও দৃশ্যমান কোন কাজ করেননি। গত ২০ আগস্ট’২০ দয়ারঘাট রিংবাঁধ ভেঙে এলাকায় পানি ঢুকে এলাকা প্লাবিত হয়। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশাশুনি সদর ইউপি চেয়ারম্যান স. ম সেলিম রেজা মিলনের তত্ত্বাবধানে শ্রমিক লাগিয়ে প্রায় ১০ মে. টন চালের কাজ করিয়ে রাস্তাটি টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই বরাদ্দের চাল আজও পাওয়া যায়নি। প্রত্যেক গোনে বাঁধটি মেরামত করতে সরকারিভাবে বরাদ্দের কথা বলা হলেও আসলে কিছুই দেওয়া হয়না। পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু জিও ব্যাগ দিয়ে তাদের দায় এড়িয়ে চলে যান।
পশ্চিম দুর্গাবাটিসহ আশাশুনির বিভিন্ন এলাকার বাঁেধর ভাঙন নিয়ে পাউবো’র শ্যামনগর সাব ডিভিশন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাশেদুজ্জামান বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে জিও ব্যাগে মাটি ভর্তি করে ভাঙন কবলিত অংশে ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। নদীর ওই অংশে স্কাউরিংয়ের মাত্রা বেশি হওয়ায় বার বার ওই এলাকা ভাঙছে বলেও তিনি দাবি করেন।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হুসাইন খাঁন বলেন, বিষয়টি জানার সাথে সাথে আমি সহ আমার এসিল্যান্ড সেখানে গিয়েছি । বিষয়টি ডিসি স্যার সহ উদ্ধোর্তন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। বাঁধ মেরামতের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড, পওর বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার জানান, পাউবোর কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপন করছে বেড়িবাঁধ বাঁধার চেষ্টা করা চলছে। তবে নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ার উঠায় বাঁধ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আম্পানের পর আশাশুনি ও শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকায় একাধিক স্থান চরম ঝুকিপূর্ণ। নদীর তলদেশ উচুঁ হয়ে পড়ায় আশির দশকে নির্মিত বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি আটকানো সম্ভব হচ্ছে না। পাউবোর বেড়িবাঁধের ডিজাইন যুগসই করে গড়ে তুলতে হবে।

#