সাতক্ষীরার উপকুলজুড়ে খাবার পানির জন্য হা-হা-কা-র


109 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার উপকুলজুড়ে খাবার পানির জন্য হা-হা-কা-র
মার্চ ২২, ২০২০ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

জল বিনে মরে যাচ্ছি, ভ্যানে টাকা না দিলি জল দেয় না। গরিব মানুষ প্রতিদিন নওয়াবেঁকী থেকেও জল এনে পারা যায় না। যদি পার আমাগো জন্যি একটু খাবার জলের ব্যবস্থা করে দাও। অসহায়ত্ত্বের সুরে কথা গুলো বলেন ষাটোর্ধ্ব বয়সী নলিতা মন্ডল।
বড়কুপোট গ্রামের বিধবা নলিতা আরও জানায়, একমাত্র ছেলে মনোরঞ্জন ও পুত্রবধু কবিতা দিনমজুরীর কাজে যাওয়ায় স্কুল পড়ুয়া নাতনি স্বপ্নার সাথে খাবার পানি সংগ্রহে গিয়েছিল। কিন্তু আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা থেকে দুই কিলোমিটার দুরে সংযুক্ত পাইপে তিন দিন ধরে পানি না আসায় আজও খালি কলস নিয়েই বাড়ি ফিরছে তারা।
নলিতাকে অনুসরনকারী প্রায় সমবয়সী সুভাসী মন্ডল জানায়, স্বামী পঙ্গু হওয়ায় পালিত ছেলের সংসারে থাকেন তারা। পুত্রবধু অসুস্থ বিধায় পাঁচ সদস্যের পরিবারের জন্য পানি আনতে বাড়ি থেকে বেলা বারটায় বের হয়ে এক ঘন্টা হেটেও পানির ব্যবস্থা করতে পারেনি। প্রতিবেশীর সংরক্ষনে থাকা বৃষ্টির পানি ধার নিয়ে দুপুরের চাহিদা মিটিয়ে বিকাল অথবা সন্ধ্যায় পানি সংগ্রহ করে ধার শোধ দেবেন তিনি।
আটুলিয়া গ্রামের দেবী রানী ও চন্ডিপুরের মাসুমা বেগমের দাবি নিজেদের পাশাপাশি গরু ও হাঁস মুরগীর খাবার পানি নিতে প্রতিদিন চারবার করে প্রায় দেড়/দুই কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। পুকুরের লবন পানি দীর্ঘদিনেও ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় রান্নার পানি পর্যন্ত বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হয় বলেও জানান তারা।
শুধুমাত্র নলিতা, সুভাসী, মাসুমা ও দেবী রানী না, বরং খাবার উপযোগী একটু পানির জন্য এমনই হা-পিত্যেশ করছে গোটা শ্যামনগর উপজেলার মানুষ। চারপাশে অজস্র জলরাশি সত্ত্বেও একটু খাবার পানির জন্য তাদের মধ্যে রীতিমত হা-হা-কা-র শুরু হয়েছে। সামনের গরমের দিনগুলোতে এ সংকট আরও প্রকটঁ হওয়ার তথ্য দেন তারা।
নাপিতখালী, চাঁদনীমুখা, তালবাড়িয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য মানুষের আর্তি ঘর থেকে বের হলেই পানি, কিন্তু মাইলের পরম মাইল হেঁটে খাবার পানি আনতি হচ্ছে আমাগো। আইলার সময় জলাকারসমুহ লবনযুক্ত হয়ে পড়ায় এ অঞ্চলের দিনমজুরকে পর্যন্ত এখন খাবার পানি কিনে খেতে হয় বলেও দাবি তাদের।
দিনে দিনে খাবার পানির সংকট তীব্র হচ্ছে জানিয়ে গৃহবধু শাহিদা এবং মাশকুরা বলেন, ‘ভাত না খেয়ে দু’তিন দিন চলে, কিন্তু খাবার পানি ছাড়া একটা মুহুর্ত থাকা যায় না’। ফেরি করে বিক্রি করা পানি কেনার মত সামর্থ্য না থাকায় খাবার পানির জন্য তারা নিদারুন কষ্টে দিনাতিপাত করছে বলেও জানান।
সবাই কাজ থেকে আসতেছে, এখন পানি চাবে-উল্লেখ করে সাপেরদুনে গ্রামের আসমা বেগম বলেন, কালকে হয়নি, আজও ফিরে যাচ্ছি। গরমের সময় প্রতিদিন পানি না হলি মানুষ বাঁচবে কি-করে। যারা বৃষ্টির পানি ধরেছে তাগো থেকে নেব-জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘কত মানুষ কত ছবি তুললো, কত কথা শুনলো। কিন্তু কেউ একটু খাবার পানির ব্যবস্থা করে দিল না‘।
খাবার পানি নিয়ে অভিন্ন অভিযোগ হেঞ্চি গ্রামের শিক্ষিকা নাজমুন নাহার, আমেনা বেগম, ছোট কুপোট দুণে গ্রামের ছবিরণ বিবিসহ বড় কুপোটের রেজাউল করিম আর আটুলিয়ার রহিমা, কাশিপুরের শহিদুল ইসলামসহ অনেকের।
তারা জানায় এলাকার প্রায় প্রতিটি পরিবারে পুকুর থাকা সত্ত্বেও রান্না থেকে শুরু করে খাবার পানির জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুরে ছুটতে হয় তাদের। দুর-দুরান্ত থেকে খাবার পানি আনার কাজে জড়িয়ে অনেক পরিবারের ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
উপকূলবর্তী শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথোপকথনে জানা গেছে খাবার পানির জন্য রীতিমত তাদের সংগ্রাম করতে হচ্ছে। আইলার পর থেকে শুরু হওয়া খাবার পানির এ সংকট সাম্প্রতিক সময়ে আরও ভয়াবহ রুপ নিয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ভু-গর্ভস্থ্য পানি উত্তোলনপুর্বক শোধনাগারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হলেও এ জনপদের প্রায় পঁচানব্বই ভাগ মানুষ সে সুবিধী থেকে বঞ্চিত। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি আর্থিক সামথ্য না থাকায় সিংহভাগ মানুষ মুষ্টিমেয় ঐ শোধনাগারের পানি সরবরাহের সুযোগ পায় না। গভীর অগভীর অধিকাংশ নলকূপ সফল না হওয়ার পাশাপাশি গ্রীষ্মের শুরু থেকে লবণমুক্ত জলাকারসমুহের পানি কাদাযুক্ত হয়ে পড়ায় পরবর্তী তিন/চার মাস প্রচন্ড খাবার পানির সংকট চলবে বলেও জানায় তারা।
উল্লেখ্য প্রায় চার লাখ জনবসতির উপকুলবর্তী শ্যামনগরে দৈনিক বার থেকে থেকে পনের লাখ লিটার খাবার পানির চাহিদা রয়েছে। বৃষ্টির পানি ছাড়া চাহিদার যৎসামান্য অপরাপর প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহীত হওয়ায় বছরের প্রায় পাঁচ মাস তীব্র পানীয় জলের সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
শ্যামনগরে খাবার পানির সংকট তীব্র-উল্লেখ করে উপজেলা সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ অঞ্চলের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ পুকুরের পানি পান করে। স্যালাইন এলাকা হওয়ায় গ্রীস্মকালে পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় খাবার পানি সংকট প্রবল হয়। তিনি আরও বলেন ১৬৩৮টি গভীর এবং ৩৫৮টি অগভীর নলকুপ ছাড়াও আড়াই হাজারের মত ভিএসএসটি, এসএসটি, আরডব্লিউএইচ এবং পিএসএফ’র মাধ্যমে পানির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চলছে।