সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী যান হেলিকপ্টার


156 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী যান হেলিকপ্টার
মে ৪, ২০২২ ইতিহাস ঐতিহ্য ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সাতক্ষীরায় বেড়াতে এসে ‘হেলিকপ্টারে’ চড়ে ঘুরে বেড়াননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেসময় সাতক্ষীরা জেলা শহর বা উপজেলা শহরগুলোতে গেলেই বাস থেকে নামামাত্র দেখা মিলতো হেলিকপ্টারের। তবে এই হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে না, চলে সাতক্ষীরার সড়কে।

মূলত বাইসাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে একটি কাঠ বেঁধে তার ওপর ফোম বা গদি লাগিয়ে তৈরি করা হতো সিট। সাইকেলের চালক সিটের সামনে মূল ফ্রেমের উপর বসানো হতো ছোট আরেকটি সিট। পেছনের সিটে একজন যাত্রী আর সামনের সিটের উপর বাচ্চাদের বসার ব্যবস্থা ছিল। ভাড়ার বিনিময়ে তাতে চড়েই যাত্রীরা যেতে পারতেন নিজের গন্তব্যে। আর এই যানের স্থানীয় নাম ছিল হেলিকপ্টার।

দুই চাকার এই যানটি কীভাবে হেলিকপ্টার হিসেবে পরিচিতি পায় তার ইতিহাস অজানা। তবে প্রচলিত আছে, একটা সময় জেলার বেশিরভাগ গ্রামীণ সড়ক ছিল কাঁচা (মাটির)। এসব সড়ক যান চলাচলের উপযোগী ছিল না। সে সময়ের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা কাজের সুবিধার জন্য সর্বপ্রথম প্রচলন করেন হেলিকপ্টার। সেসময় কালিগঞ্জ উপজেলার কোনো এক ব্যক্তি এই হেলিকপ্টার যানের উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে এই যান গোটা দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই হেলিকপ্টার এখন বিলুপ্তপ্রায়।

তবে এখনও সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় মাঝে মাঝে বাহনটির দেখা মেলে। এখন সেই হেলিকপ্টার প্যাডেল চালিত সাইকেলের পরিবর্তে মোটরসাইকেল। বর্তমানে জেলার প্রায় পনেরো হাজার মোটরসাইকেল চালক পুরাতন সেই হেলিকপ্টার সেবা অব্যাহত রেখেছেন। জেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের একমাত্র যান এই বাহন।

সাতক্ষীরা কালিগঞ্জ উপজেলার চৌমহুনি গ্রামের সাবেক ‘হেলিকপ্টার’ চালক মোহর আলী জানান, তিনি ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাইকেল হেলিকপ্টার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন মানুষ আর সাইকেলের হেলিকপ্টারে চড়ে না। রাস্তাঘাট পাকা হয়েছে। নানা রকমের মোটর ও ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলে। তাই পেশা বদলে ইজিবাইক চালাচ্ছেন। তবে এখন অনেকে শখের বশে সাইকেল হেলিকপ্টারে চড়েন।

তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় কয়েকজন এখনও মাঝে মাঝে কালীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে কালিগঞ্জ ফুলতলা মোড় পর্যন্ত সাইকেলে করে যাত্রী আনা নেওয়া করেন।

কালীগঞ্জ উপজেলার শ্রীকলা গ্রামের বাসিন্দা ইশারাত আলী জানান, এক সময় আমাদের এলাকায় যানবাহন বলতে ছিল এই হেলিকপ্টার আর প্যাডেল চালিত ভ্যান। শহরের অভিজাত মানুষরাও গ্রামে এসে এই বাহনে চলাচল করতেন। বর্তমানে এলাকায় মোটরসাইকেলে করে যাত্রী পরিবহন করা হয়। হেলিকপ্টার এখন বাইসাইকেলের পরিবর্তে মোটরসাইকেল হয়েছে।

তালা উপজেলার খলিষখালী গ্রামের মো. সবুজ হোসেন বলেন, আমাদের গ্রাম থেকে আগে পাটকেলঘাটা বাজারে প্রতিদিন এই হেলিকপ্টার চলাচল করত। ছোটবেলায় আমরা তাতে করেই বাজারে বা বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। তবে মোটরসাইকেল সহজলভ্য হওয়ায় ২০০০ সালের পর থেকে মোটরসাইকেলে করে ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন শুরু হয়। এরপর থেকে সেই সাইকেল হেলিকপ্টারের জায়গা দখলে নিয়েছে মোটরসাইকেল হেলিকপ্টার।

তালা উপজেলার একটি বেসরকারি কলেজের প্রভাষক নাজমুল হোসেন বলেন, আমাদের আগামী প্রজন্ম হয়তো বিশ্বাস করবে না সাইকেল হেলিকপ্টার বলে এই অঞ্চলে কোনো যানবাহন ছিল। অথচ এই বাহন ছিল এই অঞ্চলে বিত্তশালীদের আভিজাত্যের প্রতীক। তখনকার গ্রামের বিত্তবানরা গরুর গাড়ি বা ভ্যানে না চড়ে এই সাইকেল হেলিকপ্টারে চলাচল করতেন।

তিনি বলেন, আমরা ঢাকা বা অন্য কোথাও গিয়ে যদি বলতাম আমাদের এলাকায় হেলিকপ্টার চলে, সেটা নিয়ে অনেকেই হাসি-ঠাট্টা করতেন। হেলিকপ্টারের স্মৃতি ধরে রাখতে জাদুঘরে এটির একটি নমুনা সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি।

#