সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষে মারাত্মক বিপর্যয় : দিশেহারা চাষিরা


2194 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষে মারাত্মক বিপর্যয় : দিশেহারা চাষিরা
নভেম্বর ১৪, ২০১৮ কৃষি ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

 

গোলাম সরোয়ার ॥
দেশ থেকে যে পরিমান চিংড়ি রপ্তানি হয় তার সিংহভাগই উৎপাদন সাতক্ষীরা জেলা থেকে। সাতক্ষীরার ৬টি উপজেলার অর্ধলক্ষ হেক্টর জমিতে সাদা সোনা নামে খ্যাত এই চিংড়ি চাষ হয়। বাগদা,গলদা ও হরিণা প্রজাতির চিংড়ি মুলত চাষ হয় এই জেলাতে। এরমধ্যে বাগদা ও গলদা দেশের বাইরে রপ্তানি হয় এবং হরিণা চিংড়ি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। চিংড়ি রপ্তানি করে সাতক্ষীরা থেকে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি বৈদেশীক মুদ্রা অর্জিত হয়।

কিন্ত চলতি ২০১৮ মৌসুমে চিংড়িতে ভাইরাস ও মড়ক দেখা দেয়ায় চাষিদের প্রায় পথে বসার উপক্রম হয়েছে। একদিকে যেমন রোগবালাইয়ের প্রাদৃর্ভাব, অন্যদিকে চিংড়ির দাম কমে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষি। ফলে জেলার ছোট বড় অসংখ্য চিংড়ি চাষি পুজিপাট্রা হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছে। চলতি মৌসুমে ১০০ কোটি টাকার উপরে চিংড়ি মরে গেছে।

এদিকে সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ঘেরে পানি সল্পতা, পরিবেশ সম্মত না হওয়া এবং রেনু পোনা জীবানুমুক্ত না হওয়ায় ভাইরাস দেখা দিচ্ছে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার সরাপপুর গ্রামের বিশিষ্ট চিংড়ি চাষি রাজ্যেস্বর দাশ জানান, বিগত ৩০ থেকে ৩৫ বছর যাবত রপ্তানিজাত চিংড়ি উৎপাদন করনে। চলতি মৌসুমেও ২ হাজার ৫০০ বিঘা পরিমান জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করেছেন। তবে গত এক দশকের মধ্যে চলতি মৌসুমে চিংড়ি চাষে সর্বচ্চো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলে জানান তিনি। রাজ্যেস্বর দাশ বলেন, চলতি বছর উৎপাদন শুরুর পর থেকে চিংড়িতে ব্যাপক হারে মড়ক লাগে। চিংড়ি গ্রেড হওয়ার কাছাকাছি এসেই মরে সয়লাব হয়ে গেছে। এতে অন্তত ২ কোটি টাকার উপরে লোকসান হয়েছে তার। তাছাড়া মৌসুমের এখন শেষের দিকে এসে চিংড়ির ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ চিংড়ি চাষি সমিতির সাধারন সম্পাদক ডাক্তার আবুল কালাম বাবলা জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় দেড় হাজার বিঘার ঘেরে বাগদা চিংড়ি চাষ করেছেন। কিন্ত ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঘেরের অধিকাংশ চিংড়ি মরে গেছে। তিনি আরো বলেন, ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে চলতি মৌসুমে আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে আরো প্রায় ১০০ বিঘা পরিমান পুকুরে বাগদা চিংড়ি চাষ করেছেন। কিন্ত তাতেও মড়ক লেগে সমুদয় চিংড়ি মরে গেছে। এতে ১ কোটি টাকার মত ক্ষতি হয়েছে তার। তিনি আরো বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় বিভিন্ন চিংড়ি ঘেরে মড়ক লেগে যে পরিমান চিংড়ি মারা গেছে তার মুল্য কমপক্ষে ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা।

ডাক্তার আবুল কালাম ও রাজ্যেস্বরের মত জেলার ফিংড়ি গ্রামের চিংড়ি চাষি সামছুর রহমান, গোল্ডেন হোসেন ও জালাল উদ্দিন জানান তারা প্রত্যেকে কম বেশি পরিমান চিংড়ি চাষ করেন। কিন্ত চলতি ২০১৮ মৌসুমে ভাইরাসসহ অন্যান্য রোগবালাইয়ে ঘেরের চিংড়ি মাছ সমুহ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তারা। এরমধ্যে সামছুর রহমানের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে এবারের চিংড়ি চাষে। একই অবস্থা চাষি জালাল ও গোল্ডেন হোসেনের।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রব জানান, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় ভালো দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। দুই মাস আগে যে চিংড়ি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে তা এখন ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে চাষি ও ব্যবসায়ী উভয় ক্ষতিগ্রস্থ।

এদিকে সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিস সুত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৮ মৌসুমে সাতক্ষীরার ছয়টি উপজেলার ৪৯ হাজার ১৬৩ টি নিবন্ধিত ঘেরে রপ্তানিজাত বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ২ হাজার ১০৫ টি, তালায় ১ হাজার ২৯৫টি, দেবহাটায় ২ হাজার ৮২৯টি, আশাশুনিতে ১৩ হাজার ২১৭টি, কালিগঞ্জে ১৪ হাজার ৫৫৯টি ও শ্যামনগর উপজেলায় ১৫ হাজার ১৫৮টি ঘেরে রপ্তানিজাত বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারন করা হয়েছে ২৭ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন। গেল মৌসুমে ছিলো উৎপাদন লক্ষ্য ২৬ হাজার মেট্রিকটন।

বাংলাদেশ চিংড়ি চাষি সমিতির সাবেক সভাপতি ডাক্তার আবতাফুজ্জামান  জানান, দেশের উপকুলীয় জেলা সাতক্ষীরাতে বানিজ্যিক ভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হয় মুলত ১৯৭২ সালের দিকে। এর আগে তেমন ভাবে খুবএকটা আগ্রহ ছিলো না সাধারন চাষিদের। কিন্ত ৭২ সালের পর থেকে যখন এটি বিদেশে রপ্তানি‘র চাহিদা বাড়তে লাগলো তখন থেকেই এ জেলার মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়তে থাকে। যখন প্রাকৃতিক উপায়ে রেনু পোনা সংগ্রহ করে ঘেরে চাষ করা হতো তখন চিংড়িতে রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাগ ছিলো না। কিন্ত যখন থেকে হ্যাচারী পোনার উপর সাধারন চাষিরা নির্ভর হলো তখন থেকেই নানা ধরনের রোগ বা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে থাকে।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম জানান, এ জেলায় চিংড়িতে এতো বেশি ভাইরাস দেখা দেয়ার অনেকগুলো কারন রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম কারন হচ্ছে ঘেরে পানি সল্পতা ও পরিবেশ সম্মত না হওয়া। জেলার অধিকাংশ ঘেরে ৩ ফুট পরিমান পানি থাকে না। তাছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘের তৈরী করা হচ্ছে এখানে। যে রেনু পোনা ছাড়া হয় তা জীবানুমুক্ত নয়। ঘেরের তলা ঠিকমত সুখানো হয় না। যে কারনে পরিবেশ সম্মত না ন হওয়ায় ঘেরে মড়ক বা ভাইরাস লেগে মাছ মরে যায়। তার পরও জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকার চিংড়ি চাষিদের পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে যাতে করে স্বাস্থ্যসম্মত চিংড়ি চাষ যায়। #