সাতক্ষীরার ডাইয়ের বিলের ছয় হাজার বিঘা জমিতে নোনা পানির চিংড়ি চাষ, জলাবদ্ধতার আশংকায়, তিন লাখ মানুষের প্রতিবাদ


408 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার ডাইয়ের বিলের ছয় হাজার বিঘা জমিতে নোনা পানির চিংড়ি চাষ, জলাবদ্ধতার আশংকায়, তিন লাখ মানুষের প্রতিবাদ
জুলাই ৮, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

এম.কামরুজ্জামান ॥
সাতক্ষীরার মাছখোলার দোফসলী ডাইয়ের বিলের শ্যামল শোভা ও পরিবেশ  ধ্বংস করে নোনা পানির চিংড়ি ঘের করতে উঠে পড়ে লেগেছে এক শ্রেণির প্রভাবশালী লোক।
তারা এক মাসের ব্যবধানে ছয় হাজার বিঘার এই বিল  ছোট বড় বেড়ি বাঁধ দিয়ে ঘিরে ফেলেছে। দখল করে নিয়েছে সরকারি খাস খালটিও। বিলের চারধারের পাঁচটি ইউনিয়নের ৩০ টি গ্রামের মানুষ এখন আতংকিত জলাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশংকায় । সামান্য বৃষ্টি হলেও এরই মধ্যে কিছু এলাকায় পানি জমেছে । চলতি বর্ষা মওসুমে জলমগ্নতার  সংকট কিভাবে  কাটিয়ে উঠবেন তা নিয়ে এখনই ভাবনায় পড়েছেন তারা ।
এদিকে এ ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গ্রামবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে  সম্প্রতি একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন।তারা বলেছেন ‘অচিরেই এই বেড়ি বাঁধ অপসারন না করা হলে সাতক্ষীরা  পৌরসভাসহ ধুলিহর , লাবসা, বল্লী ও ব্রম্মরাজপুর ইউনিয়নের  তিন  লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়বেন’।
সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নারী নেত্রী এড. শাহনাজ পারভিন মিলি জানান ‘চিংড়ি চাষের নীতিমালা না মেনেই এই বেড়িবাঁধ দেওয়া হয়েছে। এতে কিছু মানুষ চিংড়ি সম্পদ নিয়ে ঘরে উঠবেন আর হাজার হাজার মানুষ অবর্ননীয় কষ্টের মধ্যে  থাকবেন । তারা হারাবেন বার্ষিক দুটি ফসল’। এর প্রতিবাদ জানিয়ে মিলি জানান ‘চারপাশে বেড়ি বাঁধ দিয়ে নোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ শুরু হয়েছে।বেড়ি বাঁধের কারণে বহু কালভার্ট অকেজো হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার কৃষক হয়ে পড়েছেন কর্মহীন’।
এলাকাবাসী জানান মাছখোলার আবদুর রহমান, রাজারবাগানের সিরাজুল , জাহাঙ্গীর , আনসার আলি ও  নুর আলি ,বদ্দিপুরের বাবু, ঘুড্ডেরডাঙ্গির আইয়ুবসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে এই খাল দখল করে নিয়ে বেড়ি বাঁধ দিয়েছেন।
বিনা অনুমতিতে বেড়ি বাঁধ দিয়ে পানি নিষ্কাশন  বন্ধ করে চিংড়ি চাষ করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বেড়িবাঁধ স্থাপনকারীরা বলেন ‘এ ব্যাপারে আমরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নিয়েছি।এতে কারও কিছু বলবার সুযোগ নেই’।
প্রসঙ্গতঃ সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যে কৃষি জমিতে নোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ নয়। এমনকি চিংড়ি চাষ করতে  হলে ৮০ শতাংশ জমির মালিকের সম্মতি , পরিবেশ  অধিদফতরের অনুমতি, জেলা মৎস্য বিভাগ,প্রাণি সম্পদ বিভাগের রিপোর্টসহ কয়েকটি জরুরি রিপোর্ট প্রয়োজন। তা ছাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার , জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় কমিশনারেরও অনুমতি নেওয়া হয়নি বলেও জানান তারা।
এদিকে বেড়ি বাঁধ দিয়ে নোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করায় এলাকার বৃক্ষ সম্পদ হুমকির মুখে পড়েছে। গোখাদ্যের অভাবে গবাদি পশু গরু ছাগল , হাঁসমুরগি পালনও বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। দেখা দিয়েছে গরুর দুধের সংকট। এলাকায় পরিবেশগত ভারসাম্যও বিনষ্ট হয়ে পড়েছে ।
গ্রামবাসী জানান ৩০ গ্রামের পানি সরানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আর এসব ব্যাপারে প্রশাসনের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারির যোগসাজস রয়েছে বলে জেলা প্রশাসককে দেওয়া স্মারক লিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী গ্রামবাসী আরও জানান জলাভূমিকে জলাশয় দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেওয়ার তৎপরতা চলছে। এতে সাতক্ষীরা জেলা জলাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে এমন আশংকা দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
জানা গেছে বেড়ি  বাঁধ দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রামবাসী সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। স্থানীয় তহসিলদার রফিকুল ইসলাম জানান তিনি ইউএনওর নির্দেশে সরেজমিনে যেয়ে তদন্ত  করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন।সরকারি খালটিও দখল করে নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি ইউএনও বরাবর লিখিত প্রতিবেদন পেশ করেছেন বলে জানিয়েছেন।
বুধবার সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির এক সমাবেশে ডাইয়ের বিলের ছয় হাজার বিঘা ধানের জমিতে বেড়ি বাঁধ দিয়ে নোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে এর প্রতিবাদ জানানো হয়। নাগরিক কমিটরি আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী রিয়াজের সভাপতিত্বে স্থানীয় ‘স্বদেশ’ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা বেড়ি অপসারনের দাবি জানিয়ে বলেন ‘অন্যথায় জেলায় এর বিরুদ্ধে গন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে’।তারা ্এ ব্যাপারে আগ্রহী ঘের মালিক ও প্রশাসনের  দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্ণিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের আহবান জানান ।
এদিকে  এড. শাহনাজ পারভিন মিলির নেতৃত্বে জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল আহসানকে দেওয়া স্মারকলিপি পেয়ে জেলা প্রশাসক বলেন ‘এব্যাপারে আরও তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। আগামী রোববার তিনি এ ব্যাপারে গ্রামবাসী ও বেড়ি বাঁধনির্মানকারীদের সাথে মত বিনিময় করে সিদ্ধান্ত গ্রহন করবেন বলে জানিয়েছেন।