সাতক্ষীরার নলতায় বিদ্যুৎ দিয়ে চলছে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প


1107 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার নলতায় বিদ্যুৎ দিয়ে চলছে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প
সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৫ কালিগঞ্জ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

সোহরাব হোসেন সবুজ, নলতা :
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর মধ্যে তাঁত শিল্প অন্যমত। যুগ যুগ ধরে এ শিল্পে বাংলাদেশ সুনাম অর্জন করে আসছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল তথা সাতক্ষীরার নলতায় ১৯৪৫ সালের দিক থেকে এই তাঁত শিল্পের প্রচলন ও প্রসার ঘটে আসছে। সরকারি সহযোগিতা না পেলেও যার ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছে এখানকার তাঁতিরা।

সরেজমিন ঘুরে জানাগেছে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই সাতক্ষীরার নলতায় এ ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের কাজ শুরু হয়। প্রথম দিকে হাতে বোনা খটখটে তাঁতের প্রচলন ছিল, যেটা আবিষ্কার করেছিলেন তদানিন্তত সময়ের ভারতবর্ষের চিত্ত রঞ্জন। এ তাঁতে তখন ছোট ছোট গামছা, ধুতি, লুঙ্গি বোনা হত। জমিদার থেকে শুরু করে প্রায় সকল শ্রেণীর মানুষ হাতে বোনা এসব কাপড় ব্যবহার করত। ব্রিটিশ শাসনামলের পরবর্তি সময়ে কলকাতার পুজিবাদিদের আওতায় এখানকার তাঁত শিল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করা হত। এই তাঁত শিল্পের উপর তারা আকৃষ্ট হওয়ায় তাদের পুজি বিনিয়োগে চলতো এ কাজ।

স্বাধীনতার পূর্ব সময় পর্যন্ত এভাবে হাতে বোনা খটখটে তাঁত শিল্পের প্রচলন ছিল। তখন নলতার বিশিষ্ট তাঁত ব্যবসায়ী হিসাবে সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ.ফ.ম রুহুল হক এমপি’র পিতা আলহাজ্ব মৃত নজির আহমেদ, রজব আলী, জহর আলী প্রমূখ ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের প্রসার ঘটিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

বর্তমানে নলতার তাঁত ব্যবসায়ী জিতেন্দ্রনাথ পাল, হামিদুল হক, আব্দুল গফ্ফার, আবু, রেজাউল, নাইমুল ইসলাম টুটুল, শমসের, রজব আলী, জিন্নাত, আইনুলসহ অনেকেই ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, স্বাধীনতার পরবর্তী বেশ কিছু সময় পর্যন্ত খটখটে তাঁতের প্রচলন থাকলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির জন্য সেগুলো বিলীন হয়ে গেছে। এবং তাঁতিরা গামছা, লুঙ্গির পরিবর্তে এখন বেশি পরিমান গজ-ব্যন্ডেজ জাতীয় কাপড় তৈরির দিকে ঝুকে পড়েছে। বর্তমানে সুতা বাঁধা হুইল মেশিন, নলি বাধা মেশিন থেকে শুরু করে সব মেশিন গুলো বিদ্যুতের সাহায্যে চালাতে হয়। যে কারণে বোনার কাজ দ্রুত হয় এবং শ্রমিক সংখ্যাও কম লাগে।

প্রতিটি ৩৫-৪০ হাজার টাকা মূল্যের এ মেশিনগুলো বিদ্যুতের সাহায্যে চলে বলে ১ জন শ্রমিক ৩-৪ টি তাঁত অনায়াসে চালাতে পারে। তবে মাত্রারিক্ত লোডসেডিং হওয়ার কারণে সময় মত পার্টিদের চাহিদা অনুযায়ী গজ, ব্যন্ডেজ সরবরাহ করা সম্ভব না হলে অনেক সময় ক্ষতির সম্মুখিন বা ব্যবসায় লোকসান খেতে হয়। আর বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য এ ক্ষতির যাতাকলে অধিকাংশ তাঁতি। এটি বেশি লাভজনক ব্যবসা না হলেও পুরাতন ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে ধরে রাখতে অনেকে ব্যবসাটি এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসাটি এখন আবার কিছুটা চলে গেছে মধ্যস্তভোগীদের হাতে।

মধ্যস্তভোগীদের সার্বিক খরচে এগুলো তৈরি করে বিনিময়ে তাঁতিরা তাদের নিকট থেকে পায় গজ প্রতি মাত্র দুই টাকা কমিশন। গজ-ব্যন্ডেজ তৈরির জন্য নারায়নগঞ্জ থেকে যাবতীয় সুতা এ তাঁতিদের নিকট চলে আসে এবং সেগুলো তৈরি করে আবার দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ক্লিনিকে দেওয়ার জন্য গজ-ব্যন্ডেজগুলো ঐ মধ্যস্তভোগীদের নিকট পৌঁছে দিতে হয়। এভাবে কাল পরিক্রমায় রূপান্তরিত হয়ে চলে আসছে নলতার ঐতিহ্যবাহী সেই তাঁত শিল্পের এ ব্যবসাটি। বর্তমানে নলতায় প্রায় ১ হাজার তাঁত মেশিনের কর্যক্রম চলছে বলে জানা যায়।

তবে দেশের পুরাতন ঐতিহ্য এ তাঁত শিল্পকে ধরে রাখতে তাঁত সংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে সচেতন মহল মনে করেন সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা পেলে বা সরকারি হস্তক্ষেপে শিল্পটা টিকে থাকার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে প্রসার ঘটবে।