সাতক্ষীরার প্রাণসায়ের খালের বুক এখন কচুরিপানায় ভরা, জলাবদ্ধতার শঙ্কা


135 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার প্রাণসায়ের খালের বুক এখন কচুরিপানায় ভরা, জলাবদ্ধতার শঙ্কা
আগস্ট ৪, ২০২২ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

সাতক্ষীরা শহরের বুক চিরে প্রবাহিত প্রাণসায়ের খালে সবুজের সমারোহ। খালটির বুক ভরে গেছে কচুরিপানায়। এমন পরিস্থিতিতে ভারি বর্ষণ হলে পানি নিষ্কাশন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জেলার নাগরিক নেতারা। সামান্য বৃষ্টিতেই সাতক্ষীরায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। শহরের তিন ভাগের দুই ভাগ থাকে জলমগ্ন। সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন পৌরবাসি। পৌরসভার পুরাতন সাতক্ষীরা, রসুলপুর, পলাশপোল, কামালনগর, ইটাগাছাসহ বিভিন্ন এলাকায় মাসের পর মাস জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বাড়িঘরে পানি উঠে যায়। এবার ভরা বর্ষায় বৃষ্টির দেখা না হলেও প্রবীন ব্যক্তিরা বলছেন, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ভারি বর্ষণ হতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে দুর্ভোগের আর শেষ থাকবে না। নাগরিক নেতাদের মতে, এমনিতে খালটি খননে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। নাগরিক নেতারা মনে করেন, সাতক্ষীরার প্রাণসায়ের খালের প্রাণ ফিরে পেলে স্বস্তি মিলবে শহরবাসির। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবেন তারা। বন্ধ হবে খালের দুই তীর জবরদখল করে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতি স্থাপন। উৎপাদন বাড়বে কৃষি ও শিল্পের। জলাবদ্ধতা ও বন্যা প্রতিরোধ, ময়লা-পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, যানজট নিরসন ও শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এমনটায় আশা করে আসছেন জেলাবাসি।

সাতক্ষীরা পওর বিভাগ-১ এর অধীনে খাল এবং জলাশয় পুন:খনন প্রকল্প (১ম পর্যায়) এর আওতায় প্রাণ-সায়ের খাল খনন করা হয়। প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪ কিলোমিটার খাল খননে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে শুরু থেকেই। কাদা-পানি না শুকিয়েই খনন করার কারণে ওই অভিযোগ ওঠে।

সূত্রমতে, ১৮৬৫ সালে অবিভক্ত বাংলার সাতক্ষীরার জমিদার প্রাণনাথ রায় শিক্ষার প্রসারে পিএন হাইস্কুল এবং ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারে প্রাণসায়ের খাল খনন করেন। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার খেজুরডাঙ্গি এলাকার বেতনা নদী থেকে সাতক্ষীরা শহর হয়ে এল্লারচর মরিচ্চাপ নদী পর্যন্ত এ খালের দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। প্রথমাবস্থায় এ খালের চওড়া ছিল ২০০ ফুটের বেশি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সে সময় বড় বড় বাণিজ্যিক নৌকা এসে ভিড় জমাতো এ খালে। এর ফলে সাতক্ষীরা শহর ক্রমশ সমৃদ্ধশালী শহরে পরিণত হয়। আর ১৯৬৫ সালের প্রথম দিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামতকে প্রাধন্য না দিয়ে বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণের নামে খালের দুই প্রান্তে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এতে খালে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা বন্ধ হয়ে যায় এবং এটি বদ্ধ খালে পরিণত হয়।
সূত্রমতে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর খালটি খনন করা হয়। ৯২ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় ১০ কিলোমিটার খাল সংস্কারে নামমাত্র খনন করে প্রকল্পের সিংহভাগ টাকাই লোপাট করার অভিযোগ ওঠে। খাল খননের নামে খালের দুই ধারে শতশত গাছ কেটে ফেলা হয়।

আবারো নেমে আসে পৌরবাসির দুর্ভোগ। শুষ্ক মৌসুম শীতকালেও শহরে জলাবদ্ধতা বিরাজ করতে থাকে। বন্ধ হয়ে যায় খালের পানি প্রবাহ। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে সাতক্ষীরা পওর বিভাগ-১ এর অধীন ‘৬৪টি জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুন:খনন প্রকল্প (১ম পর্যায়) এর আওতায় প্রাণ-সায়ের খাল খনন করা হয়।

সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম ব্রিজ হতে খেজুরডাঙ্গা ৬ ভেন্ট স্লুইস গেটস্থ বেতনা নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত সাড়ে ৬ কিলোমিটার এলাকা খননের জন্য টেন্ডারের মাধ্যমে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা চুক্তি কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এই অংশে খননকৃত মাটির পরিমাণ হওযার কথা ছিল ৯৩ লাখ ২৮ হাজার ৬৭৯ দশমিক ৯০ সিএফটি। আর দ্বিতীয় অংশে ১ দশমিক ০৮০ কিলোমিটারে রয়েছে খেজুরডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে খেজুরডাঙ্গা ৬ (ছয়) ভেন্ট স্লুইস গেট পর্যন্ত। এ অংশে খননকৃত মাটির পরিমাণ ১৬ লাখ ৭৯ হাজার ৪২৮ দশমিক ৬৯ সিএফটি। অপর গ্রুপে চরবালিথা হতে সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম ব্রিজ পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার পুন:খননের জন্য টেন্ডারের মাধ্যমে ৭ কোটি ৪৮ দশমিক ৪১ লক্ষ টাকা চুক্তি মূল্যে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। এই অংশে খননকৃত মাটির পরিমাণ ১ কোটি ৫১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ দশমিক ৩৫ সিএফটি। টেন্ডার অনুযায়ী খালটির ডিজাইন দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। যার প্রথম অংশে চরবালিথা হতে কুখরালী দক্ষিণপাড়া ঈদগাহ পর্যন্ত খনন করা হয়। এই অংশে খননকৃত মাটির পরিমাণ ৮৬ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬৮ দশমিক ৪৯ সিএফটি। আর দ্বিতীয় অংশে কুখরালী দক্ষিণপাড়া ঈদগাহ হতে সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম ব্রিজ পর্যন্ত। এই অংশে খননকৃত মাটির পরিমাণ ৬৪ লাখ ৮২ হাজার ৮২৮ দশমিক ৮৬ সিএফটি। এই অংশের ইটাগাছা পূর্বপাড়া হতে সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম ব্রিজ পর্যন্ত খননকৃত ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯৪৬ দশমিক ১৬ সিএফটি মাটি ড্রাম ট্রাকের মাধ্যমে শহরের মধ্য থেকে নিরাপদ দূরত্বে স্থানান্তর করা হয়।
নাগরিক কমিটির নেতা অধ্যাপক আনিসুর রহিম বলেন, সবার আগে দরকার জনসচেতনতা। খালটি খননপূর্বক সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছিলাম, কিন্তু কাজ হয়নি। খালটির বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। আবারো হয়তো বরাদ্দ চাওয়া হবে। আবারো সেই আগের মতো অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে খাল খননের নামে সরকারি টাকার অপচয় করার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? টাকা আসবে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। মানুষের দুর্ভোগ সহ্য করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

খননকৃত অংশের পানি সেচ দিয়ে তলদেশ শুকিয়ে ফেলা এবং খননকৃত মাটি দুই পাড় থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও যথা নিয়মে তা হয়নি বলে এলাকাবাসির অভিযোগ। সেময় অভিযোগ ওঠে, সাতক্ষীরা শহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত সাতক্ষীরার প্রাণ ‘প্রাণসায়ের খাল’ খনন নকশা অনুযায়ী হয়নি। শুধু এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে খাল থেকে কাদা তুলে দেওয়া হয় পাড়ে। খনন শেষ করার আগে অনেক স্থানের পাড় ধসে পড়ে। ২০২০ সালে খননকাজ শেষ করা হয়।

নাগরিক নেতা অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, প্রাণসায়ের খাল ভরাট ও দখল হওয়ার পর নতুন করে খনন করা হয়। কিন্তু যেভাবে খনন করা হয়েছে, তাতে প্রাণসায়ের প্রাণ ফিরে পাওয়া তো দূরের কথা, শুধু সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে।
সাতক্ষীরা নাগরিক নেতা এড: ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, ক্লিন সাতক্ষীরা-গ্রীন সাতক্ষীরা গড়ার যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল তারই জের ধরে প্রথমে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এরপর দৃষ্টিনন্দন প্রকল্পের আওতায় প্রাণসায়ের খাল খনন করা হয়। কিন্তু খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কোন কাজ হয়নি। সরকারি টাকার অপচয় হয়েছে। মানুষ খাল খনন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কোন সুফল পায়নি। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর আবারও খালপাড় বেদখল হয়ে যাচ্ছে। খালের বুক ভরে গেছে কচুরিপানায়। ভারি বর্ষণ হলে খালে পানি নিষ্কাশন হবে কীনা সন্দেহ। জলাবদ্ধতার অভিশাপে এমনিতেই আমাদের কপালে প্রতি বছর মাসের পর মাস দুর্ভোগ লেগেই আছে। এবছর সেই দুর্ভোগ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা ভাগ্যবিধাতাই জানেন।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিভাগ-২) নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরার সদর উপজেলার এল্লারচর থেকে খেজুরডাঙ্গী পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার খাল খননের প্রাক্কলিত ব্যয় ১০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। নকশা অনুযায়ী এই খাল কাটার কথা ছিল। খালের উপরিভাগের প্রস্থ ৭৫ থেকে ৮০ ফুট হবার কথা ছিল। গভীরতা ৬ থেকে ৮ ফুট ও তলদেশের প্রস্থ ২৫ ফুট হবার কথা ছিল। এ খাল কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে। খাল খননের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৯ সালের ১ আগস্ট। খালের উপরিভাগের প্রস্থ কোথাও কোথাও ৫৫ ফুটের বেশি হয়নি। ৩-৪ ফুটের বেশি গর্ত করা হয়নি। খননের পর তলদেশের প্রস্থ ১৫ থেকে ১৮ ফুটের বেশি হয়নি। খাল শুকিয়ে কাটার কথা থাকলেও কাটা হয় পানি রেখেই।
সাতক্ষীরা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, প্রাণসায়ের খাল খনন ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা হয়নি। এ জন্য ২০২১ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। খালপাড়ের মানুষ মামলা করায় ও এক্সকাভেটর মেশিন চলাচলের জন্য জায়গা বের করতে দেরি হওয়ায় কাজ করতে দেরি হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন তিনি। বিশেষ করে শহর অংশে নকশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, পরে আবার খাল আরও খনন করতে হবে। না হলে বিল দেওয়া হবে না। কিন্তু তারপরের খবর আর জানা যায়নি।

#