সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ পাসপোর্ট যাত্রীরা


198 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ পাসপোর্ট যাত্রীরা
জুন ২৯, ২০২২ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

পুলিশ প্রশাসনের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা

॥ দিলীপ কুমার দেব ॥

সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পুলিশের চোখের সামনেই বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন ভারত ও বাংলাদেশ যাতায়াতকারী পাসপোর্ট যাত্রীরা। পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ভয়ভিতি দেখিয়ে ও বিভিন্ন অজুহাতে মালামাল ছিনিয়ে নেয়াসহ টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোঃ জাকির হোসেন, মোঃ মুজিবর রহমান, মোঃ শাহ আলম ও মোঃ আমিরুল ইসলামসহ তাদের গঠিত নিজস্ব লুটেরা বাহিনী। জিম্মির কবল হতে রক্ষা ও হয়রাণী বন্ধে পুলিশ প্রশাসনের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পাসপোর্ট যাত্রীরা।

ভারত ও বাংলাদেশ যাতায়াতকারী পাসপোর্ট যাত্রীসহ সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর এলাকার সকল শ্রেণি মানুষের কাছে কাস্টমস অফিসের গ্রীজার মোঃ শাহ আলম ও কাস্টমস অফিসের গাড়ি চালক মোঃ আমিরুল ইসলাম এবং কামস্টমস অফিসের বাইরের দুই চিহ্নিত দালাল-চাঁদাবাজ-মাদকসেবী জাকির হোসেন ওরফে কালো জাকির ও মুজিবরের আতঙ্ক বিরাজ করছে। জাকির হোসেন ভোমরা গ্রামের মিয়ারাজ গাজীর ছেলে এবং তার সহযোগী মুজিবর একই গ্রামের অহেদ বক্স’র ছেলে। মূলত জাকির, মুজিবর এবং তাদের দলবল পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে বেশির ভাগ চাঁদাবাজি করেন কাস্টমস অফিসের বাইরে। আর অফিসের ভিতরে সরকারী শুল্ক ফাঁকি এবং চাঁদাবাজি করেন কাস্টমস অফিসের গ্রীজার মোঃ শাহ আলম এবং শুল্ক কর্মকর্তার গাড়ি চালক মোঃ আমিরুল ইসলাম।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাস্টমস অফিসের মধ্যেই পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন মোঃ শাহ আলম ও মোঃ আমিরুল ইসলাম। ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে তাদের বহনকৃত মালামালের বিপরীতে সরকারের নির্ধারিত শুল্কের স্থলে অর্ধেক পরিমাণ টাকা অবৈধভাবে পকেটে ভরছেন মোঃ শাহ আলম ও মোঃ আমিরুল ইসলাম। যেমন, সরকারী হিসেবে কোন ব্যবসায়ীর শুল্ক যদি একলাখ টাকা হয়, তাহলে এই একলাখ টাকা সরকারী খাতায় না তুলে তার থেকে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে পকেটে ভরেন তারা। ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরা ল্যাগেজ ব্যবসায়ীরা ভোমরা কাস্টমস অফিসে ঢুকতেই তাদের নিয়ে ছুটোছুটি ও দেন দরবার শুরু হয় মোঃ শাহ আলম ও মোঃ আমিরুল ইসলামের। শুধু তাই নয়, ঢাকা, খুলনা, যশোর ও বেনাপোলের কিছু বড়সড় ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়মিত চুক্তিও রয়েছে তাদের। এসব বড়সড় ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন দিয়ে বের হলে, তাদেরকে কাস্টমস অফিসে না ঢুকিয়ে সরকারী শুল্ক ফাঁকি এবং মোটা অংকের টাকা ঘুষ নিয়ে ইমিগ্রেশনের বাইরে থেকেই প্রাইভেট কার বা মাইক্রো কার করে তাদেরকে গন্তব্যে চলে যেতে সহযোগিতা করেন কাস্টমস অফিসের দুই চাঁদাবাজ মোঃ শাহ আলম ও মোঃ আমিরুল ইসলাম। এমনকি তাদের সহযোগিতায় কাস্টমস অফিস এলাকা থেকে যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের ল্যাগেজ চুরি হওয়ার ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত।
সরেজমিনে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর এলাকায় দেখা গেছে এমন চিত্র। শুধু কাস্টমস অফিসের মধ্যেই হয়রানী হচ্ছেন না পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীরা, অফিসেই বাইরেই রয়েছে আতংকের অপর দুই নাম কালো জাকির ও মুজিবরসহ তাদের দলবল। কাস্টমস অফিস লাগোয়া মোটর সাইকেল গ্যারেজটি বর্তমানে হয়ে ওঠেছে মাদকসেবী ও চাঁদাবাজ কালো জাকির-মুজিবরসহ তাদের দলবলের অপকর্মের আঁখড়া। ওই মোটর সাইকেল গ্যারেজের অধিকাংশ ভাড়া মোটর সাইকেল চালকই কালো জাকির মুজিবর বাহিনীর সদস্য। ভারত থেকে ফিরে আসা পাসপোর্ট যাত্রী বা ল্যাগেজ ব্যবসায়ীরা ভোমরার কাস্টমস অফিস থেকে বের হলেই এ বাহিনীর সদস্যরা কৌশলে তাদেরকে ঢোকায় মোটর সাইকেল গ্যারেজে। সেখানে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে থাকে কালো জাকির বা মুজিবর। তারপর সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স পরিচয় দিয়ে গ্যারেজের মধ্যেই পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখাতে শুরু করেন মাদকসেবী কালো জাকির, মুজিবরসহ তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা। এরপর তারা যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের কাছে দাবী করেন মোটা অংকের টাকা। ভারত থেকে বহনকৃত পণ্যের হারে ২ হাজার, ৫ হাজার, ১০ হাজার এমনকি কারো কারো কাছ থেকে ২০/২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছেন কালো জাকির ও মুজিবর।
যারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাদেরকে ওই বাহিনীর ছদ্মবেশী ভাড়া মোটর সাইকেল দিয়ে গ্যারেজ থেকে বের করে দিয়ে কিছুদুর যেতে না যেতেই ফের শ্রীরামপুর, বৈচনা, মাহমুদপুর, পদ্মশাখরাসহ বিভিন্ন নির্জন এলাকায় আটকে ফেলে কালো জাকির ও মুজিবর। এরপর বিজিবি সদস্যদের ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে আটক করে পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মালামাল ছিনিয়ে নেয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। কখনও কখনও ব্যর্থ হয়ে এসব পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দেন বিজিবি’র হাতে। রবিবার বিকেলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ থেকে বাংলাদেশে আগত অনুপ হালদার, মিতু হালদারসহ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে পরবর্তীতে তাদের মালামাল বিজিবি দিয়ে ধরিয়ে দেয় মাদকসেবী ও চাঁদাবাজ জাকির হোসেন ওরফে কালো জাকির। পরে ওই ভুক্তভোগীদের তোপের মুখে আত্মগোপন করে কালো জাকির। দিনের পর দিন সাতক্ষীরা ভোমরা স্থলবন্দরের কাস্টমস অফিসসহ অফিসের বাইরে প্রকাশ্যে জাকির-মুজিবর বাহিনী এবং শাহ আলম ও আমিরুলের এমন চাঁদাবাজি ও শুল্ক ফাঁকির রমরমা কারবার চলে আসলেও এসব অপকর্ম যেন চোখে পড়ে না সীমান্ত রক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বন্দর প্রশাসনের।
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে জাকির-মুজিবর এবং শাহ আলম ও আমিরুলের হয়রানী, চাঁদাবাজির শিকার একাধিক ভুক্তভোগী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কালো জাকির ও মুজিবর বন্দর এলাকার চিহ্নিত চাঁদাবাজ। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪টি করে ফেনসিডিল সেবন করেন কালো জাকির। পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই তাদের প্রতিদিনের আয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আর কাস্টমস অফিসে শুল্ক ফাঁকি এবং চাঁদাবাজির অলিখিত লাইসেন্স দিয়ে রাখা হয়েছে শাহ আলম এবং আমিরুলকে। তাদের চাঁদাবাজিকৃত অর্থের একটি অংশ চলে যায় বন্দরের অসাধূ কিছু অফিসার, সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পকেটে। ফলে এসব অসাধু আমলাদের ছত্রছায়ায় দিনদিন চিহ্নিত দালাল ও চাঁদাবাজগুলো অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আসা ভ্রমণকারীদের কাছে বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে এবং পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীদের হয়রানী রোধে অবিলম্বে কালো জাকির-মুজিবর, শাহআলম-আমিরুদের মতো দালাল ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা প্রহণের জন্য সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, স্থলবন্দরের শুল্ক গোয়েন্দা ও ইমিগ্রেশন পুলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে এসব চাঁদাবাজি, শুল্ক ফাঁকি ও হয়রানীর বিষয়ে কাস্টমস অফিসের সহকারী কমিশনার মোঃ আমীর মামুন বলেন, কালো জাকির, মুজিবর, শাহআলম ও আমিরুল বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ পেয়েছি। ইতোমধ্যেই এবিষয়ে অভিযুক্তদের সতর্ক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। হয়রানী ও শুল্ক ফাঁকি রোধে সকলের সহযোগিতা কামনাসহ এসব প্রতারক বা চাঁদাবাজদের খপ্পরে না পড়ার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

ইমিগ্রেশন পুলিশের আই. সি মোঃ মাজরিহা হুসাইন বলেন, জাকির, মুজিবরসহ চাঁদাবাজ চক্রের দৌরাত্মে পাসপোর্ট যাত্রী ও ল্যাগেজ ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছে। শীঘ্রই তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

#