সাতক্ষীরার যে গ্রামে মাসে ১ লাখ ১৯ হাজার কেজি মুরগির মাংস উৎপাদন হয়


230 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার যে গ্রামে মাসে ১ লাখ ১৯ হাজার কেজি মুরগির মাংস উৎপাদন হয়
জুন ১৬, ২০১৯ কালিগঞ্জ ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

ইব্রাহিম খলিল :
গ্রামজুড়ে যেনো পোলট্রি মেলা বসেছে। বাড়িতে বাড়িতে পোলট্রি খামার বসিয়ে কর্মসংস্থানের পথ বেছে নিয়েছেন গ্রামবাসী। এ গ্রামে কেউ বেকার নেই। এ গ্রামের জনসংখ্যা সব সময় স্থিতিশীল। গ্রামের শতভাগ পরিবার জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি মেনে চলে। শতভাগ মানুষও শিক্ষিত এ গ্রামে । এমন বহুগুনের গোবিন্দকাটি গ্রামকে আজ রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্মার্ট পোলট্রি ভিলেজ’ ঘোষনা করলেন কর্মকর্তারা।

সাতক্ষীরা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দুরে কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিন শ্রীপুর ইউনিয়নের এই গ্রামটির নাম গোবিন্দকাটি। নানা কারণে সেটি এখন আদর্শ গ্রাম হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। গোবিন্দকাটি এলাকার জনসংখ্যা মাত্র ৪ হাজার একশ’। এর মধ্যে অর্ধেক পুরুষ অর্ধেক নারী।

গ্রাম জুড়ে রয়েছে দেশি জাতের সোনালী মুরগির চাষ। গ্রাম জুড়ে শুধু চোখে পড়ে খামারের পর খামার। এখানকার ৫০২ টি পোলট্রি খামার থেকে মাসে মাংস পাওয়া যায় এক লাখ ১৯ হাজার কেজি। বর্তমানে খামারগুলিতে রয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার মুরগি। এন্টি বায়োটিক ব্যবহার না করে অথবা প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত এন্টি বায়োটিক ব্যবহার করায় এর চাহিদা বেশি। এই মুরগির ক্রেতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা ও বরিশালের পাইকাররা। পোলট্রি খামার তৈরি করে গ্রামের মানুষ আত্মকর্ম সংস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছেন। নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও তারা বানিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। দেশের ঘাটতি এলাকায় পৌছে দিচ্ছেন আমিষ ও প্রোটিন।

গ্রামটিতে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষক পংকজ বিশ^াস জানালেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা মাত্র ১২০ জন। উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক বীরেন্দও নাথ বিশ^াস বলেন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫০ জন। এর কারণ হিসাবে শিক্ষকরা বললেন গ্রামটির সব পরিবারের সক্ষম দম্পতিরা গ্রহন করেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি । তারা জন্ম সচেতন। তাই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। অন্যগ্রাম থেকে শিক্ষার্থী এনে পড়াতে হয় তাদের ।

গোবিন্দকাটি গ্রামের প্রায় সব বাড়িরই কেউ না কেউ সরকারি অথবা বেসরকারি চাকুরি করেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরি করেন কমপক্ষে ১০০ জন নারী পুরুষ। তবে এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা মিষ্টি পানির অভাব। নোনা পানির কারণে অনেক ভোগান্তি তাদের। বৃষ্টির পানি পুকুরে ধরে রাখতে হয়। আরও মিষ্টি পানির জন্য তাদের পাড়ি দিতে হয় পাঁচ কিলোমিটার দুরের পথ বিষ্ণুপুর গ্রামে । তাদের প্রত্যাশা এ গ্রামে বসবে মিষ্টি পানির উৎস। উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদি বলেন আমরা প্লান্ট বসিয়ে এবং অন্যত্র থেকে মিষ্টি পানি আনার সব ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছি। মাংস হবে নিরাপদ । জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন প্রতি বাড়িতে এবার হেলথি হোম গড়ে তোলা হবে। স্মার্ট লিলেজ ঘোষনা এর প্রথম সংস্করণ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে আদর্শ গ্রাম গোবিন্দকাটি ও সংলগ্ন আরও তিনটি গ্রামে শিশু জরিপে পাওয়া গেছে মাত্র ১৫৭ টি শিশু যাদের বয়স ১৫ প্লাস। অপরদিকে চলতি ২০১৯ সালে এ এলাকায় জন্ম নিয়েছে মাত্র চারটি শিশু। তবে নানা কারণে ওই এলাকা থেকে মারা গেছেন ১৫ জন মানুষ। তবে এ চিত্রকে অনেকে বলছেন ভয়াবহ। এর পরিবর্তন ও ভারসাম্য দরকার।

কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ ও প্রাণি সম্পদ বিভাগের উদ্যোগে ‘বাড়ি বাড়ি হ্যাচারি, ঘরে ঘরে খামারি’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রোববার স্থানীয় গোবিন্দকাটি হাইস্কুল মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে আদর্শ গ্রাম গোবিন্দকাটিকে ‘স্মার্ট পোলট্রি ভিলেজ’ ঘোষনা করেন উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদি।

প্রাণি সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে ‘স্মার্ট পোল্ট্রি ভিলেজ’ ঘোষিত দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের গোবিন্দকাটি গ্রামে ৫০২ জন খামারী মাসে ১ লাখ ১৯ হাজার কেজি মাংস উৎপাদন করে আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এর মাধ্যমে এই গ্রামের খামারীরা প্রতি মাসে ২৬ লাখ টাকা আয় করছেন। এতে তারা একদিকে যেমন স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন তেমনি নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে দেশের ঘাটতি এলাকায় আমিষ ও প্রোটিন চাহিদা পূরণে কাজ করছেন। এ সময় গোবিন্দকাটি হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের একটি করে ডিম খাওয়ানো হয়। একই সাথে ৫১ জন খামারীর মাঝে ১৮ হাজার মুরগির বাচ্চা ও দু’টি ইনকিউবেটর বিতরণ করা হয়।

কালিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন খুলনা বিভাগীয় প্রাণি সম্পদ উপ পরিচালক মাসুদ আহমেদ খান। এতে বিমেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সহকারি পরিচালক সুশান্ত কুমার সরকার , সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সুভাষ চৌধুরী ,ইউপি চেয়ারম্যান প্রশান্ত কুমার বিশ^াস, যশোর জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. ভবতোষ কুমার , সাতক্ষীরা জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম প্রমূখ।

অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন একটি করে ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলা হয় ডিম একটি ‘ন্যাচারাল ভিটামিন পিল’। ডিমের মধ্যে বিদ্যমান ভিটামিন ‘এ’ দৃষ্টি শক্তি উন্নত করে। এর করোটিনয়েড ও ল্যুটেন চোখের ছানি কমাতে সাহায্য করে। ডিমের ভিটামিন ‘বি’ খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তর করে। ডিমের ভিটামিন ‘ই’ বন্ধ্যারোধে, তারুণ্য ধরে রাখা এবং স্কিন ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি স্বাস্থ্যবান ও শক্তিমান জাতি হিসাবে নিজেদের গড়তে হলে নিয়মিত ডিম খাওয়ার অভ্যাস করারও আহবান জানানো হয়।