সাতক্ষীরার শ্যামনগরে খাবার পানির তীব্র সংকট


165 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে খাবার পানির তীব্র সংকট
মার্চ ২১, ২০২০ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা ॥
“চারিদিক শুধু পানি আর পানি, তবু আমাগো কপালে একটু খাবার পানি জুটতেছে না। প্রতি বছর অনেক লোক এসে শুনে যায়, ছবি তোলে, লিখেও নেয়, তবু আমাগো পানির কষ্ট দুর হলো না”। কথাগুলো বলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী মরিয়ম বেগম।

শ্যামনগর উপজেলার ঈশ^ীরপুর ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামের ঐ গৃহবধুর দাবি বাড়ির টিউবওয়েলের লবন পানি দিয়ে গৃহস্থলীর কাজ চালিয়ে নেয়। তবে দুটি গরু আর নিজেদের পাশাপাশি হাঁস মুরগীর খাবারের পানি টানতে মেয়েসহ তাকে প্রতিদিন চারবার দুই কিলোমিটার দুরের খাগড়াঘাট মোড়লবাড়ির পুকুরে ছুটতে হয়।

ছোট কুপোট গ্রামের নলীতা ও সুভাসী নামের দুই ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা জানায়, আইলার পর থেকে এলাকার সব পুকুরের পানি লবনাক্ত। বাধ্য হয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দুরের আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা থেকে তারা খাবার পানি সংগ্রহ করে। কিন্তু স্থানীয়দের ব্যাপক চাহিদার কারনে গত দু’দিন ধরে খাবার পানি না পেয়ে প্রতিবেশীর সংরক্ষনে থাকা বৃষ্টির পানি ধার দেনা করে খাচ্ছে তারা।

তবে খাবার পানি নিয়ে এমন ভয়াবহ সংকটে কেবল মরিয়ম, নলীতা ও সুভাসী এবং তাদের পরিবার নয়। বরং বরাবরের মত সুন্দরবন সংলগ্ন উপকুলীয় জনপদ শ্যামনগরের প্রায় প্রতিটি অংশে খাবার পানি নিয়ে তীব্র সংকট শুরু হয়েছে। গ্রীস্মের শুরু থেকে দেখা দেয়া খাবার পানির এ সংকট সামনের দিনগুলোতে আরও প্রকট হবে বলে জানায় স্থানীয়রা।

উপজেলার ছোট কুপোট সাপের দুনে গ্রামের ছবিরন বিবি এবং হেঞ্চি গ্রামের স্কুল শিক্ষিকা নাজমুন নাহারসহ অনেকে বলেন, গোটা এলাকার পানি লবনাক্ত হওয়ায় তাদেরকে তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুর হতে পানি সংগ্রহ করতে হয়। মাঝেমধ্যে ফেরি করে বিক্রি হওয়া ভ্যানের পানি কিনতে বাধ্য হন তারা। তবে গৃহস্থলীর বাকি কাজ লবন পানি দিয়ে করার কারনে পরিবারের সদস্যরা প্রতিনিয়ত পেটের পিড়া ও চর্মসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ঠিকমত খাবার পানি দিতে না পারায় তাদের এলাকার অনেকে গবাদী পশুসহ হাঁস-মুরগী লালন পালন ছেড়ে দিয়েছে বলেও জানান তারা।

শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালী, হেঞ্চি, পোড়াকাটলা, খাগড়াঘাট, কুপোট ও আটুলিয়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সর্বত্র খাবার পানির জন্য রীতিমত হা-হা-কা-র চলছে। তীব্র লবনাক্ততার কারনে এসব এলাকায় অধিকাংশ গভীর/অগভীর নলকূপ সফল না হওয়ার পাশাপাশি হাতে গোনা লবনমুক্ত জলাকারসমুহ পানিশুন্য হয়ে পড়ায় এখনই তারা পানি নিয়ে তীব্র কষ্টে দিনাতিপাত করছে। হরহামেশা কর্দমাক্ত পানি খাবারের কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি অনেকে আবার লবনযুক্ত পানি রান্নার কাজে ব্যবহার করছে বলেও জানান।

“ভাত না খেয়ে দু’পাঁচ দিন কাটিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু পানি ছাড়া এক মুহুর্ত থাকা যায় না”- উল্লেখ করে ছোট কুপোট গ্রামের দিনমজুর রেজাউল করিম জানান, “গরীব মানুষ, তাই সব সময় পানি কিনে খাতি পারিনে”। আবার কাজে যাওয়ার কারনে তিন কিলোমিটার দুরের খায়রুল গাজীর পুকুর থেকে পানি আনার মত সময় না মেলায় মাঝে মধ্যে প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করতে হয় বলেও দাবি তার। যে দিন কাজ হয় না, সেদিন পানি টেনে সংরক্ষন করেন বলেও জানান তিনি।

হেঞ্চি গ্রামের দিনমজুর মোশারফ হোসেন ও কুপোট গ্রামের নির্মল বলেন, “এক বেলা মজুরী দিয়ে তিনশ টাকা পাই, অথচ দুই কলসি পানি কিনতি হয় চল্লিশ টাকা খরচায়”। আক্ষেপভরা কন্ঠে কথাগুলো বলে তারা যেকোন মুল্যে উপকুলীয় এ জনপদের খাবার পানির সমস্যা দুর করতে সরকারের জরুরী হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন আইলার পর সরকারি বেসরকারিভাবে দীর্ঘদিন ধরে খাবার পানি সরবরাহ করার পর হঠাৎ করেই তা বন্ধ করে দেয়ায় কাবার পানি নিয়ে সমস্যা তৈরী হয়। এদিকে আইডিএফসহ বিভিন্ন এনজিও’র পক্ষ থেকে খাবার পানি সরবরাহের জন্য পাইপ লাইন করে দেয়ার অল্প দিনের মধ্যে সেগুলো অকেজো হওয়াতে সমস্যা আরও তীব্রতর হয়েছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শ্যামনগর উপজেলার প্রায় সর্বত্র খাবার পানির সমস্যা রয়েছে। অধিকাংশ জায়গায় নলকূপসমুহ সফল না হওয়ায় স্থানীয়রা পিএসএফ ও বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু গ্রীস্মে পুকুর শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৃষ্টি না হওয়াতে সমস্যা তীব্রতর হয়েছে। সহ¯্রাধিক গভীর ও অগভীর নলকূপ আর দুই হাজারেও বেশী আরএসএফ, ভিএসএসটি এবং এসএসটি ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়ে স্থানীয়দের পানি সমস্যা নিবারনের চেষ্টা চলছে।#