সাতক্ষীরার সুন্দরবন ক্লিনিকে ডাক্তারের ভূল চিকিৎসায় এবার প্রাণ গেলো সিজার রোগী নূর জাহানের !


402 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার সুন্দরবন ক্লিনিকে ডাক্তারের ভূল চিকিৎসায় এবার প্রাণ গেলো সিজার রোগী নূর জাহানের !
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল হক / মো: কামরুজ্জামান মোড়ল :
ডাক্তারের ভূল চিকিৎসায় এবার সাতক্ষীরার সুন্দরবন ক্লিনিকে প্রাণ গেল নূর জাহান খাতুন (৩৭) নামের আরও এক সিজার রোগীর। মৃত্যুর মাত্র ৩ দিন আগে তার একটি কন্যা সন্তান হয়েছে। নিহত নূর জাহান পাইকগাছা উপজেলার হরিদাশকাটি গ্রামের আলমুন হোসেনের স্ত্রী  এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রাজনগর গ্রামের ছবেদ আলী মোড়লের মেয়ে।

বুধবার রাত ১০ টার দিকে খুলনা সার্জিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথিমধ্যে রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানাগেছে। খুলনা সার্জিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার ডাক্তাররা জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পথিমধ্যেই ওই রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

এনিয়ে গত এক সপ্তাহে সাতক্ষীরায় দু’টি বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে ২ সিজার রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। ফলে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ আতংকগ্রস্ত।

জানাগেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা সুন্দরবন ক্লিনিকে নূর জাহানের একটি কন্যা সন্তান হয়। ওই দিন সকালে সিজার করার জন্য তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সুন্দরবন ক্লিনিকের ডা: শরিফুল ইসলাম ও অ্যানিস্থেশিয়া ডা: আরিফুজ্জামান ওই রোগীর সিজার করেন। কন্যা সন্তান হওয়ার পর ওই ক্লিনিকেই সে মারাত্বক অসুস্থ্য হয়ে পড়লে সুন্দরবন ক্লিনিকের ডাক্তার শরিফুল ইসলাম , ডা: আরিফুজ্জামান ও ম্যানেজার আবুল খায়ের তড়িঘড়ি করে ওই রোগীকে খুলনায় পাঠিয়ে দেয়। খুলনা সার্জিক্যালে ভর্তির আগেই রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে নিহতের স্বজনদের অভিযোগ।

নিহতের স্বামী আলমুন হোসেন ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান,
সাতক্ষীরার সুন্দরবন ক্লিনিকের ডাক্তারের ভূল চিকিৎসায় তার স্ত্রী নূর জাহানের মৃত্যু হয়েছে। সিজার হওয়ার পর রোগীর রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। রোগীর শরীরের ভিতরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেন কারনেই রক্তশূন্য হয়েই তার স্ত্রী’র মৃত্যু হয়েছে বলে খুলনার ডাক্তারা তাকে জানিয়েছেন। তিনি সুন্দরবন ক্লিনিকের ডাক্তার শরিফ ,ডা: আরিফুজ্জামান ও ক্লিনিক মালিকের দৃস্তান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।

নিহত নূর জাহান ৩ কন্যা রেখে মারা গেছে। মা মারা যাওয়ার পর তার ৩ দিন বয়েসের মেয়ে মুক্তিকে ক্লিনিক থেকে তার স্বজনেরা বাড়িতে নিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার বাদ জোহর পাইকগাছার হরিদাশপুর স্বামীর পারিবারিক কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে বলে নিহতের স্বজনেরা জানায়।

নিহত নূর জাহানের  মেয়ে সীমা খাতুন (১৫) ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, সুন্দরবন ক্লিনিকে তার মাকে অপারেশন করার জন্য ভর্তির পর ওই ক্লিনিকে সে মায়ের পাশে সার্বক্ষণিক ছিল। গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সিজারের পর তার মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। বুধবার দুপুরের পর তার মা’র অবস্থা মারাত্বক অবনতি হলে ওই ক্লিনিকের ম্যানেজার আবুল খায়েরকে বার বার বলার পরও ডাক্তার আসেনি। বুধবার রাতে যখন ডাক্তার আসে, তখন তার মা’র আর জ্ঞান ছিলনা। ওই অবস্থায় ডা: শরিফুল ইসলাম , ডা: আরিফুজ্জামান ও সুন্দরবন ক্লিনিকের ম্যানেজার আবুল খায়ের তড়িঘড়ি করে মুমূর্ষ রোগীকে একটি এ্যাম্বুলেন্স ডেকে খুলনায় পাঠিয়ে দেয়। এ সময় ওই এ্যাম্বুলেন্সে তাদের সাথে ক্লিনিক ম্যানেজার আবুল খালের ছিল। আঠারমাইল নামক স্থানে  পৌছালে রোগীর শরীরে আর স্যালাইন টানছিল না। এ সময় খায়ের তাদেরকে ভূলবুঝিয়ে বার বার বলার চেষ্টা করেন ‘স্যালাইন বন্ধ করে দিয়েছি, তোমার মা ঘুমাচ্ছে’।

সীমা আরও জানায়, তারা তার মাকে খুলনা আড়াই’শ বেড হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু খায়ের তাদেরকে সেখানে না নিয়ে খুলনা সার্জিক্যালে জোর করে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেয়ার পর সার্জিক্যালের ডাক্তারা বলেন, রোগী পথেই মারা গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সীমা জানায়, খুলনা সার্জিক্যালের সামনে পুলিশ দেখে আবুল খায়ের ভয় পেয়ে যান এবং  তাদেরকে বলে এখানে কন্নাকাটি করা যাবে না। অসুবিধা হবে। এ সময় আবুল খায়ের তাদেরকে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখাতে থাকে।

নিহত নূর জাহানের  স্বামী ও মেয়ে আরও বলেন, ভূল চিকিৎসায় নূর জাহনের মৃত্যু হয়েছে। তারা ডা: শরিফুল ইসলাম , ডা: আরিফুজ্জামান, ক্লিনিক ম্যানেজার আবুল খায়েরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন। এ ব্যাপারে তারা আইনের আশ্রয় নেবেন বলেও জানান।

ক্লিনিক ম্যানেজার আবুল খায়ের বৃহস্পতিবার রাতে ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে তার সেলফোনে জানান, অতিরিক্ত টেনশনে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের কোন গাফিলতি ছিল না। খায়ের কিছুক্ষণ পরেই মোবইলটি বন্ধ করে দেন।

এ ব্যাপারে ডা: শরিফুল ইসলাম ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, মনে হয় ওই রোগী বাথরুমে পড়ে স্টোক করে মারাগেছে। ভূল চিকিৎসার অভিযোগ সঠিক নয়। সিজার করার ২দিন পর রোগীর অবস্থা অবনতি হলে তাকে নীবিড় পর্যবেক্ষনের জন্য (আই সি উই) খুলনাতে পাঠানো হয়েছিল। শুনেছি খুলনার একটি হাসপাতালে ওই রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সামনেই (খুলনা রাস্তার মোড়ে)  অবস্থিত ‘সুন্দরবন ক্লিনিক’। মো: কসিমদ্দিনের নামে হাসপাতালের রেজিস্টেশন হলেও ৪ জন মিলে ক্লিনিকটি পরিচালনা করে থাকেন।

এদিকে, নূর জাহানের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে গত এক সপ্তাহে সাতক্ষীরার পৃথক ২টি বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে  দুই সিজার রোগীর মৃত্যু হলো। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা একতা হাসপাতালে সুমনা নামের আরো এক সিজার রোগীর ভূল চিকিৎসায় মৃত্যু হয়। এ ঘটনা নিয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় ডা: দেবদুলাল সরকারসহ ৩ ডাক্তার ও হাসপাতাল মালিকসহ ৮ জনের নামে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। এই মামলায় পুলিশ ৩ জনকে গ্রেফতারও করে। ডা: দেবদুলালসহ ৩ ডাক্তার বর্তমানে পলাতক রয়েছে।

একের পর এক বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে ভূল চিকিৎসায় সিজার রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত বলে মনে করেন সাতক্ষীরার সচেতন মহল।