সাতক্ষীরার স্কুলে সততা স্টোর, নেই বিক্রেতা


449 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার স্কুলে সততা স্টোর, নেই বিক্রেতা
সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

॥ সুভাষ চৌধুরী ॥

————————

অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি। বাংলা অর্থ সততাই শ্রেষ্ঠতম কৌশল। এই সততা নিয়ে অনেক কথাই আমরা শুনে আসছি। সততা নিয়ে ছোট বেলায় রচনা লিখেছি। স্কুলের পাঠ্য বইয়ে সততার একাধিক গল্পও আমরা পড়েছি। একজন সৎ মানুষ, তিনি সততা লালন করেন। সততা অনুসরন করেন । এ জন্য সমাজে সৎ, সততা, সতী এসব নিয়ে অনেক দৃষ্টান্ত আমাদের মাঝে রয়েছে।

এতো সবের পরও আমাদের মাঝে প্রশ্ন উঠতেই পারে আমরা সততা কতোটা অনুসরন করি। সততা কতোটাই শিখি বা কতোটা শিখাই। যদি বলি শিখছি না , যথাযথভাবে অনুসরন করছি না । তবেই বোধ হয় সত্য কথাটা বলা হলো। যদি বলি সততা শিখছি, শিখাচ্ছি কিংবা সততা অনুসরন করছি তা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যায়। এতো কথা বলছি কেনো, কারণ আমরা দুর্নীতি ও অসততার জালে জড়িয়ে পড়েছি।

এখন উপলব্ধিতে এলেও তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আমরা আমাদের নতুন নতুন প্রজন্মকে সততার দিকে ধাবিত করাতে চাই। সততাই যেনো তাদের প্রধান শক্তি হয় সেটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

অনেকদিন পর এই সততা নিয়ে একটি কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার । বুধবারের এই কর্মসূচি ছিল সাতক্ষীরায় সদ্য যাত্রা শুরু করা শিশু কিশোরদের স্কুল সাতক্ষীরা কালেকটরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে পৌঁছে শিশুদের মাঝে সততার বীজ বপন করতে দেখলাম কর্মকর্তাদের । তাদের প্রত্যাশা এই বীজ থেকে একদিন ফল আসবে।

এই বীজ একদিন সুগন্ধযুক্ত ফুল হিসাবে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে। চারদিকে সুগন্ধ ছড়াবে। আয়োজকদের সাথে আমিও একমত। এমন একদিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে যেদিন সমাজে দুর্নীতি থাকবে না। সে দিন সততাই হবে আমাদের প্রধান অবলম্বন। আমরা সেই দিনটির অপেক্ষায় থাকবো।

যে অনুষ্ঠানে আমার যাবার সুযোগ হয়েছিল সেটি ছিল সাতক্ষীরা কালেকটরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের। আপনার শুনে ভাল লাগবে যে ওই স্কুলে বুধবার উদ্বোধন করা হলো সততা স্টোরের। এর উদ্যোগ দুর্নীতিদমন কমিশন দুদকের। আর ব্যবস্থাপনা স্কুল কর্তৃপক্ষের । সদ্য যাত্রা করা স্কুলটির অধ্যক্ষ সেলিনা আফরোজ জানালেন এই স্কুলের স্টোরে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরন এবং ¯œাকসের ব্যবস্থা থাকবে। এটি একটি দোকান। শিক্ষার্থীরা চাইলে ক্লাসের ফাঁকে এই দোকানে এসে তার প্রয়োজনীয় পণ্যটি কিনতে পারবে।

এই দোকানের বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে কোনো বিক্রেতা নেই। ক্রেতা শিক্ষার্থী যা কিনবে তার উপযুক্ত মূল্য নির্দিষ্ট স্থানে আগে জমা দেবে। কোনো বাকি বকেয়ার সুযোগ থাকবে না। এমনকি পণ্যের নির্ধারিত মূল্যের কম বা বেশি কোনোটাই নয়। তিনি জানালেন এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোনো কিছু অসদুপায়ে গ্রহন করার প্রবনতা থেকে দুরে থাকতে পারবে।

তারা কোনো মূল্য না দিয়েই পন্য গ্রহনের অসাধু প্রবনতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। সর্বোপরি এটি একটি শিক্ষা, সততার শিক্ষা। এই শিক্ষায় সে অভ্যস্থ হয়ে উঠলে একদিন সে সাধু মানুষ হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। তার প্রভাব পড়বে তার পরিবারে , সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের ওপর।

আমি স্কুলটির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। ধন্যবাদ দিতে চাই দুদককে. যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছেন। তাদের দেওয়া এই ফর্মুলা সমাজ থেকে দুর্নীতির মুলোৎপাটনে সহায়ক হবে। আমি প্রত্যক্ষ করেছি শিশু কিশোররা এভাবে বিকিকিনি করতে বেশ সাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। জীবনের প্রথম সোপানে তারাও নিজেদের সততায় অভ্যস্থ করতে তুলতে আগ্রহী। অনুষ্ঠানে এসেছিলেন জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন। তিনি বললেন আমরা সবাই মিলে একটি দুর্নীতিমুক্ত সমজ গড়ে তুলতে চাই ।

এজন্য বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে এটি একটি বলিষ্ঠ উদ্যোগ। শিশু কিশোরদের যদি সততায় অভ্যস্থ করে তোলা যায় তবে তারা রোজই একটি করে প্রাকটিক্যাল শিক্ষা পাবে। এই শিক্ষা নিয়েই তারা বেড়ে উঠবে। নিজেকে এবং তার পরিমন্ডলকে সে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে। দেশের স্কুলে স্কুলে যদি এই কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে আমাদের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি দুইই বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

আর বাংলাদেশ তেমনই একটি সমাজ চায় যেখানে থাকবে না দুর্নীতি। সততাই থাকবে সেখানকার প্রধান অবলম্বন। একই কথা জানালেন দুদকের খুলানাস্থ উপপরিচালক মো. আবুল হোসেন। তিনি বলেন আমরা এ বিষয়ে সকলকে আগ্রহী করে তুলছি। এতে শিশুদের পরিবারও আগ্রহী হয়ে উঠতে পারবে।

অনুষ্ঠানে আগত অতিথি জেলা শিক্ষা অফিসার মো. ছায়েদুর রহমান বলেন এই দৃষ্টান্ত আমরা জেলার সব বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন সমাজ থেকে দুর্নীতির মুলোৎপাটনে আমরা আরও অনেক উদ্যোগ নেবো।

সব মিলিয়ে আমার ধারনা হয়েছে যে সবাই মিলে উদ্যোগী হলে একদিন দুর্নীতির কবর রচনা হবেই। কালেকটরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের কোমলমতি শিশুদের বলতে চাই তোমরা এগিয়ে যাও। নিশ্চয়ই তোমরা সফল হবে। তোমাদের পথ যেনো সুগম হয় সহজ হয়। তোমাদের পথ যেনো সততার ফুলে ফলে ভরা থাকে।

আর শিক্ষকদের বলবো তারা যেনো এমন কোনো নজির না রাখেন যা সততার মৌল নীতির পরিপন্থি, সততাকে বাধাগ্রস্থ করে। কিংবা অনিয়ম দুর্নীতি এবং অসততাকে লালন করে। শিশুদের সততা শিখানোর আগেই শিক্ষক হিসাবে আপনাকেই আগে সততার উদাহরন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
##

—- সুভাষ চৌধুরী সাংবাদিক, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি।