সাতক্ষীরার হাওয়ালখালী গ্রামের যুবক আলাউদ্দীন মানুষের সেবায় নিয়োজিত


620 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরার হাওয়ালখালী গ্রামের যুবক আলাউদ্দীন মানুষের সেবায় নিয়োজিত
সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

খন্দকার আনিসুর রহমান :
মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, যে জীবন অন্যের জীবনে কাজে লাগে না সেটা জীবন নয়। যে মানুষ অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারে তিনিই প্রকৃত মানুষ। তাই অনেক মানুষ রয়েছেন যারা নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে। নিজের পরিবারের কথা না ভেবে কষ্টার্জিত অর্থ অন্যের কল্যাণে ব্যায় করেন। ভালোবাসেন মানুষ কে। আর এ কারণে আমর হয়ে থাকেন তারা।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাওয়ালখালীতে এমনিক যুবকের সন্ধান পাওয়া গেছে। যিনি গরিব ঘরের সন্তান হয়েও অন্যের জন্য নিজের জীবন বির্জসন দিতে প্রস্তুত। মানুষের সেবাই নিয়োজিত। নিজের অর্থ সম্পদক না থাকায় তিনি ঢাকায় যেয়ে কাজ করে সে টাকা নিজ এলাকার মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেন।

গ্রামের ভাঙ্গা রাস্তার অংশবিশেষ স্বশ্রমে নিজ উদ্যোগে মেরামত করেন তিনি। তার নাম আলাউদ্দীন। তিনি সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলার বাশদহা ইউনিয়নের হাওয়ালখালী গ্রামের মৃত সুজাউদ্দীনের ছেলে। আলাউদ্দীন ৩ ভাই বোনের মধ্যে মেঝ।

কৃষক পিতার মৃত্যুর পর আলাউদ্দীনের বন্ধ হয়ে যায় নিজের লেখাপড়া। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করা আলাউদ্দীন প্রতিটি শ্রেণিতেই প্রথম হতো। পিতার মৃত্যুতে দারিদ্র সংসারের ঘানি টানতে তাই তাকে অল্প বয়সেই জীবিকার তাগিদে চলে যেতে হয় ঢাকায়। সংসারের অভাবের কারণে লেখাপড়া আর করা হলো না আলাউদ্দীনের। বন্ধ হয়ে গেলো মেধা আর আগ্রহের পরিস্ফুটিত এক প্রাথমিক স্তর। ঢাকা গিয়ে মা সোয়েটার নামের একটি ফ্যাক্টরিতে হেল্পার হিসেবে প্রথমে কর্মজীবনের সূত্রপাত। তিন মাসের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা আর কর্মপ্রচেষ্টায় ফ্যাক্টারিতে অপারেটর পদে পদোন্নীত হয়। বর্তমানে ঢাকার গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় হান্নান গ্রুপের একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে কর্মরত আছেন। কিন্তু থেমে থাকেনি তার সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ আর জীবনসংসারকে ভিন্নরূপে দেখা। এগুলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে সে শুরু করে মানবতার সেবায় মহৎ কর্মউদ্যোগ।

গার্মেন্ট ফ্যাক্টারীতে নিয়মিত ৮ঘন্টার পাশাপাশি অতিরিক্ত ‘ওভার টাইমে’ আরো ৭/৮ঘন্টা কাজ করে আলাউদ্দীনের মাসিক আয় পৌছায় ১৩ থেকে ১৪হাজার টাকা। ওই বেতন থেকে নিজের খরচের জন্য মাত্র ৩ হাজার টাকা ও বাড়ির জন্য ৩ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়ে অবশিষ্ট টাকা দিয়ে গরিব, নিরিহ মানুষের সেবায় বিলিয়ে দেয় আলাউদ্দীন। আর সেই লক্ষ্যেই ৩ মাস পর পর ছুটি নিয়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়েই তিন মাসের সঞ্চয়ী ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করে মহতি উদ্যোগ গুলো বাস্তবায়নে। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে ২/১দিন দেরি হলেই তাঁর কপালে জোটে অফিসের তরফ থেকে বকাঝকা আর তিরষ্কার। কোন কোন ক্ষেত্রে সাসপেন্ডও জুটেছে। আর তাই তাকে অনেকবার ফ্যাক্টারীও বদল করতে হয়েছে। কিন্তু এতটুকু পরিমাণ দমে যাননি ২০বছর বয়সী আলাউদ্দীন। মনের কষ্টগুলো চাপা রেখে ফের জোর কদমে ছুটে চলেছে পরবর্তী মহৎ উদ্যোগগুলো বাস্তবে রূপ দিতে।
আলাউদ্দীনের মানবতার সেবার উদাহরণ নিয়ে সাতক্ষীরার হাওয়ালখালী গ্রামের বাসিন্দারা জানানের আরো চমকপ্রদ ঘটনা। প্রতি ঈদের দিন ঈদগাহে গিয়ে আলাউদ্দীন গরীব মানুষের মাঝে টুপি বিতরণ করেন। ঈদের দিন সকালে গ্রামের অনেক বৃদ্ধ মানুষকে নিজ হাতে গোসল করান। শুধু তাই নয় নিজ উদ্যোগে ভ্যান ভাড়া নিয়ে নিজেই বৃদ্ধ মানুষকে ঈদগাহে নামাজের আগে নিয়ে যান আবার নামাজ শেষে বাড়িতে পৌছে দেন। এলাকার গরীব ও অসহায় পরিবারের মাঝে চিনি, সেমাই ইত্যাদি বিতরণ করেন। সবই নিজের স্বল্প টাকায় দারিদ্রদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করেন অল্প কয় দিনেই সাধারণ মানুষের মন জয়ে করে নিয়েছেন আলাউদ্দীন। প্রচার বিমুখ আলাউদ্দীনের নিজের মহতি উদ্যোগের তেমন ভালো ছবিও নেই তার সংরক্ষণে।

এখানেই থেমে থাকেন না আলাউদ্দীন। অর্থনৈতিকভাবে নিজে দারিদ্র হলেও মন ও মানসিকতার দিকে থেকে সে মোটেই দারিদ্র নয় বরং অনেক ধনী। বাঁশদহা ইউনিয়নের আইচপাড়া, ভবানিপুর, হাওয়ালখালী, কাউনডাঙ্গা, রেউই, পাচরখিসহ পাশ্ববর্তি গ্রামে নিয়মিত বিরতিতে মহতি কার্যক্রম গুলো নিজ হাতে নিজের পয়সায় সম্পাদন করে বড় সাদা মনের অধিকারী আলাউদ্দীন। ওই অঞ্চলের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সমুন্নত রাখতে এলাকাবাসীর দৃষ্টিআকর্ষণের জন্য বিভিন্ন প্লাকার্ড, ব্যানার, টি-শার্ট ও বাহারি ঢং-এ নিজেকে উপস্থাপন করে সে। ‘পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও পরিষ্কার রাখুন, নিজের শরীর নিয়ে সুস্থ থাকুন’ শ্লোগান নিয়ে প্রতিবার উপস্থিত হয় সাধারণ মানুষের সামনে।

এছাড়াও ওই অঞ্চলের এতিম, গরীব, প্রতিবন্ধি শিশু ও শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে খাতা, বই, কলমসহ নানান কিছু বিতরণ করেন আলাউদ্দীন। ‘মানবতার হাসপাতাল’ শীর্ষক শ্লোগানে অসহায় মানুষকে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থার করতে বিনামূল্যে ওষধ বিতরণ ও ডাক্তার নিয়ে গ্রামের গরীব-অসহায়দের ফ্রি-চিকিৎসা প্রদাণ বাস্তবায়ন করেছে উঠতি ওই যুবকটি। শুধু তাই নয়, এতিম, গরীব, অসহায় ও প্রতিবন্ধি শিশুদের মাঝে নগদ অর্থ প্রদানও তার নিয়মিত কর্মসূচির অংশ। গ্রামের বাড়িতে অবস্থানকালীন সময়ে রাতের প্রহরি হিসেবেও পাড়া-মহল্লায় নিজেই ‘নাইট গার্ড’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। করেছেন বিনোদনের ব্যবস্থাও। বিভিন্ন উৎসব-পার্বনে নিজে বাহারী ঢং-এ সেজে যেমন অপরকে আনন্দ দিয়েছেন তেমনি বিনোদনের অন্যান্য উদ্যোগও গ্রহণ করেছেন।