সাতক্ষীরায় অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল,ক্লিনিক, প্যাথলজি সেন্টারে চলছে নৈরাজ্য


941 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল,ক্লিনিক, প্যাথলজি সেন্টারে চলছে নৈরাজ্য
জুলাই ৯, ২০১৫ ফটো গ্যালারি স্বাস্থ্য
Print Friendly, PDF & Email

স্টাফ রিপোর্টার :
সাতক্ষীরা জেলার সাতটি উপজেলায় বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি নিয়ন্ত্রণহীন ও ফ্রিস্টাইলে চলছে।প্রতিনিয়ত সাধারন মানুষকে জিম্মি করে আদায় করছে হাজার হাজার টাকা। স্বাস্থ্য খাতে এসব লাগামহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম চললেও যেন দেখার কেউ নেই। সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন বেসরকারী ক্লিনিক ও হাসপাতাল গুলোতে মানুষ স্বাস্থ্য সম্মত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে কি-না বা হয়রানির শিকার হচ্ছে কিনা তা দেখার সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও অভিযোগ রয়েছে মাসুহারা নিয়েই তিনি সব কিছু না দেখার ভান করছেন।
সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য-চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার নামে গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারে এবং শহরের অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মতো ছোট-বড় অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠছে। এর অধিকাংশই অবৈধ এবং লাইসেন্স না থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে না তেমন কোনো পদক্ষেপ।
সাতক্ষীরা জেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা রয়েছে ১৩১টি। যার মধ্যে নবায়ন করা নেই ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতাল, বুশরা হাসপাতাল এবং সংগ্রাম মেডিকেল হাসপাতাল ৩০ বেড ও নলতা হাসপাতাল ২০ বেড; বাকি সস ক্লিনিকের দশ বেডের অনুমোদন রয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি রয়েছে ৫০টি। এ উপজেলায় স্বপ্ন ক্লিনিক, আলিপুর ক্লিনিক, ম্যাসেঞ্জার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রেটিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও সততা ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই।
তালা উপজেলায় ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি রয়েছে ১২টি। এ উপজেলায় নিউ জনসেবা ক্লিনিক, সার্জিক্যাল ক্লিনিক ও মৌসুমি ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই।
কলারোয়া উপজেলায় ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি রয়েছে ৩৪টি। এ উপজেলায় মিতালী ক্লিনিক, সার্জিক্যাল ক্লিনিক, পপুলার প্যাথলজি অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আছিয়া নার্সিং হোম, হাসান প্যাথলজি, সীমান্ত নার্সিং হোম, ই-ল্যাব ডায়গনস্টিক সেন্টার, স্টার প্যাথলজি, জনসেবা ক্লিনিক, সোনাবাড়িয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার, খোরদো সার্জিক্যাল ক্লিনিক, পল্লীসেবা ক্লিনিক, মাতৃসেবা ক্লিনিক, সায়মন প্যাথলজি, আরোগ্য প্যাথলজি ও ডা. আব্দুল হাকিম সার্জিক্যাল ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। এ উপজেলায় ৩৪টি ক্লিনিকের মধ্যে ১৫টির লাইসেন্স নবায়ন করা না থাকলেও প্রশাসনের এ বিষয়ে কোনো তৎপরতা নেই।
দেবহাটা উপজেলায় ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি রয়েছে চারটি।
কালিগঞ্জ উপজেলায় ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি রয়েছে আটটি। এ উপজেলায় আলি ক্লিনিক ও শেরে বাংলা ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায় করা নেই।
আশাশুনি উপজেলায় ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি রয়েছে ১১টি। এ উপজেলায় বিদ্যুৎ ডেন্টাল ক্লিনিক, নিশান ডেন্টাল ক্লিনিক, নিশান কোম্পানি বুধহাটা, আহসান উল্লাহ ডায়গনস্টিক ও সোনার বাংলা ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই।
শ্যামনগর উপজেলায় ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি রয়েছে ২২টি। এ উপজেলায় হিউম্যান এইড প্রাইভেট হাসপাতাল, সেবা নাসিং হোম, নগর প্রাইভেট হাসপাতাল, ফারনান্ড প্রাইভেট হাসপাতাল, আমিনা সার্জিক্যাল ক্লিনিক, অলি ডিজিটাল সেন্টার কেয়ার, ফাতেমা ডায়গনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই।
এরমধ্যে অবৈধভাবে চিকিৎসা কেন্দ্রের নামে বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এক দশকে সাতক্ষীরায় বিপুল সংখ্যক ক্লিনিক ও ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি স্থাপিত হলেও এগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। তিন দশকের পুরনো ‘দি মেডিকেল প্রাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮২’-এর ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনগনের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১ পাস করে। কিন্তু কিছু দুর্নীতিবাজের কারণে স্বাস্থ্যনীতির সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
সাতক্ষীরায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিক ও ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরিগুলো নিছক বাণিজ্যকেন্দ্র । অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নিয়ম-কানুনের বালাই নেই। যে কোনো ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে হলে ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট, ইনকাম ট্যাক্স (টিআইএন) ছাড়পত্র, প্রতিষ্ঠানের শয্যাসংখ্যা অনুসারে প্রকার, বর্গফুট অনুসারে প্রতিষ্ঠানের পরিমাণ, ইনডোর, আউটডোর ও ভৌত সুবিধাদি, জরুরি বিভাগ, ওটি, ওয়াশরুম, লেবার রুম, অপেক্ষাকক্ষ, অফিস কক্ষ, প্রশস্ত সিঁড়ি, জেনারেটর, পোস্ট অপারেটিভ রুম, ইনস্ট্রুমেন্ট রুম, অভ্যর্থনা কক্ষ, স্ট্যাবিলাইজার, চেঞ্জিং রুম, নার্সদের ডিউটি কক্ষ, ভাণ্ডার কক্ষ, অস্ত্রোপচার কক্ষের সুবিধা (শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত), ওটি টেবিল, সাকার মেশিন, জরুরি ওষুধের ট্রে, অক্সিজেন, ওটি লাইট, অ্যানেসথেসিয়া মেশিন, ডায়াথার্মি মেশিন, রানিং ওয়াটার, আইপিএস, যন্ত্রপাতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা, সর্বক্ষণিক ডাক্তার-নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের নাম-ঠিকানা, যোগ্যতার সনদপত্র, নিয়োগপত্র, জরুরি অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অ্যাম্বুলেন্স থাকতে হবে। প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি স্থাপনের জন্য একইভাবে নির্ধারিত নিয়মাবলী পালন করা অত্যাবশ্যক। এসব বিষয় নিশ্চিত করে বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত এসব ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরিগুলোর জবাবদিহিতা, মাননিয়ন্ত্রণ ও জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণই হবে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রদানের মূল উদ্দেশ্য।
কিন্তু সাতক্ষীরার বহু প্রতিষ্ঠান নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সেবাদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লোক ঠকাচ্ছে। বৈধ ও অবৈধ উভয়ভাবে গজিয়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশতেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয়, টেকনিশিয়ান এবং যন্ত্রপাতি নেই। যাচাই-বাছাই ছাড়া এ ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ফলে সাধারণ রোগীরা চরমভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। সুচিকিৎসার পরিবর্তে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে গাঁটের পয়সা খরচ করে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে নিছক অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে। একই ডাক্তারের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে অনেকগুলো ক্লিনিকে।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে সেবার সার্বিক উন্নতি এবং সকল প্রকার পরীক্ষা নিরীক্ষার সুযোগ থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, সেবা নিতে আসা অনেক রোগীকে ভুল বুঝিয়ে অথবা পরীক্ষার রিপোর্ট ভালো হয় না বলে বাইরে পাঠাচ্ছেন কিছু অসৎ ডাক্তার।
বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে তা জনস্বাস্থ্যের প্রতি মারাতœক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সাতক্ষীরার কিছু হাসপাতালে বর্জ্য অপসারণের সুব্যবস্থা থাকলেও উপজেলা পর্যায়ে তা নেই বললেই চলে।
এদিকে, ক্লিনিকগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি ও অস্ত্রোপচার বাবদ রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমাফিক অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
আবার বিধি অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলার সদর হাসপাতাল ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান রক্ত সঞ্চালন করতে পারবে না। কিন্তু এ আইন মানছে না বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। রোগীদের আত্মীয়-স্বজনদের এসব প্রতিষ্ঠানে আইন অমান্য করে ক্লিনিকে রক্তদানে বাধ্য করা হচ্ছে। তারা অস্বীকৃতি জানালে সেবা নিয়ে টালবাহানা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্লিনিকের মালিকানার সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক নেতারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তারাই প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেন। তাদের মধ্যে কেউ সদিচ্ছা নিয়ে ব্যবসা করেন, আবার কেউ দ্রæত বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হতে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ক্লিনিক চালান।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. সালেহ আহমেদ স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতে অনিয়ম হচ্ছে বলে স্বীকার করেন।
তিনি ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান,‘জেলার যে সব ক্লিনিক ও ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি অবৈধ সেগুলোর তালিকা করে কয়েক বার জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব ক্লিনিক যখন খোলা হয় বা নবায়ন করা হয় তখন এর মান যাচাই করা হয়। সে সময় মান ঠিক থাকলেও পরে মান নিম্নগামী হতে থাকে। যেসব ক্লিনিকে সর্বক্ষণিক ডাক্তার বা নার্স থাকে না সেগুলো আবার কীসের ক্লিনিক?  সেগুলো বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। তবে বন্ধ করার ক্ষমতা আমাদের হাতে না, প্রশাসনের হাতে।’