সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগের ঘরে জামায়াত-জেএমবি !


624 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগের ঘরে জামায়াত-জেএমবি !
আগস্ট ৩১, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি :
সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবির, বিএনপি ও জঙ্গি সংগঠন জেএমবি’র একাধিক সুযোগ সন্ধানী নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদানের চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে একাধিক নেতা আওয়ামী লীগে কৌশলে ঢুকে তারা বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে অংশ নিতে শুরু করেছেন। আবার কেউ আওয়ামী লীগে যোগদানের জোর প্রচেষ্টা অব্যাতহ রেখেছেন। এদের কারো লক্ষ্য আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান অথবা মেম্বর প্রার্থী হওয়া। আবার কারো লক্ষ্য নাশকতার মামলা থেকে রেহায় পাওয়া। আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগের ঘরে ঢুকে আওয়ামী লীগকেই নি:শ্বেস করার চেষ্টা চালাচ্ছে চক্রটি। আর একাজে তাদেরকে সহযোগিতা করছে আওয়ামী লীগের কিছু হাইব্রীড ও অসৎ নেতা। চিহ্নিত এসব অসৎ ও হাইব্রীড নেতাদের সম্পর্কে সতর্ক থানার দাবী আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের।তারা এ ব্যাপারে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি’র অন্যতম সংগঠক হিসেবে একাধিক বার আটক, জামায়াত-শিবিরের নাশকতা মামলার আসামী সেলিম উদ্দিন সরদার ওরফে সেলিম বাবু ওরফে টাক বাবু (৪২)। সাতক্ষীরা জেলা শহরের ইটাগাছা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে তিনি।

২০০৫ সালের ২১ জানুয়ারি গোপালগঞ্জের কোটালি পাড়ায় ব্র্যাক অফিসে ডকাতি করতে যেয়ে পুলিশের হাতে গ্রেনেড, বোমা, অস্ত্রসহ যে ৭ জেএমবি নেতা আটক হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন সেলিম উদ্দিন সরদার ওরফে টাক বাবু। এই মামলায় দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর কারাগারে আটক ছিলেন তিনি। পরে মামলা থেকে খালাস পান। বর্তমান সরকারের আমলেও জেএমবি কে সংগঠিত করার অভিযোগে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের হাতে আটক হয় সেলিম বাবু। তার ছোট ভাই শামিম গালিব ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট দেশব্যাপী গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মূল নেতৃত্বে ছিলেন। ওই বছর ৩ অক্টোবর কুমিল্লার চাঁদপুর থেকে দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সে জেএমবি’র শীর্ষ নেতা (ফাঁসি কার্যকর হওয়া) শায়খ্ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাই এর অন্যতম সহযোগি ছিলেন । বর্তমানে জেএমবি’র বোমা হামলা মামলায় ফাঁসির দন্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি শামিম গালিব।

জানাগেছে, ২০১৪ সালের ২৩ এপ্রিল সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পরানদহ এলাকায় জামায়াত-শিবির নাশকতা চালায়। তারা পুলিশের উপর হামলা এবং তাদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এই ঘটনায় সদর থানার তৎকালীন দারোগা বিধান চন্দ্র বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং-৬৬। জামায়াত-শিবিরের নাশকতার এই ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলার এজহারভূক্ত ১২ নং আসামী সেলিম বাবু।

জঙ্গি সংগঠন জেএমবি সংগঠিত করার অভিযোগে একাধিক বার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া, জামায়াত-শিবিরের নাশকতা ও পুলিশের উপর হামলা মামলার আসামি সেলিম উদ্দিন সরদার ওরফে সেলিম বাবু বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলা থ্রি-হুইলার মালিক,চালক লীগের সাধারন সম্পাদক। স্থানীয় প্রভাবশালী এক পৌর আওয়ামী লীগ  নেতার হাত ধরেই বর্তমানে সেলিম বাবু আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেলিম বাবু এখন নেতৃত্ব  দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের মিছিলে।

গত ৩০ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষ্যে সাতক্ষীরা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে জেলা আওয়ামী লীগ শোকসভা ও শোক র‌্যালীর আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে সেলিম বাবুর নেতৃত্বে (ব্যানারসহ) একটি মিছিল যোগদিতে দেখা যায়। সেলিম বাবুকে মিছিলে নেতৃত্ব দিতে দেখে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী শিউরে ওঠেন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ছোট। জামায়াতের একজন অর্থযোগানদাতা বা ডোনার হিসেবে তিনি বহু আগে থেকেই পরিচিত। জামায়াতের ভোটেই তিনি নির্বাচিত চেয়ারম্যান।

২০১৩ সালে আলিপুর এলাকায় জামায়াত-শিবিরের নাশকতার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ছোট। গত ঈদে তিনি তার এলাকায় নিজের ছবিসহ যে ঈদ শুভেচ্ছা পোষ্টার ছাপিয়ে বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে সাটিয়েছেন সেই পোষ্টারের উপরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছবি রয়েছে। ওই পোষ্টারে দ্বিতীয় সারিতে সাতক্ষীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির ছবি রয়েছে। এই পোষ্টার নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে শুরু হয় ক্ষোভ-বিক্ষোভ।

11954695_1485718625077805_1127864524102918372_n

গত ১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ছোট তার ইউনিয়নে প্রায় অর্ধশত ছাগল জবাই করে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। আলিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা এসব তথ্য নিশ্চিত করেই ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, স্থানীয় এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনসুর আহমেদের হাত ধরেই জামায়াতের চিহ্নিত ডোনার হিসেবে খ্যাত, নাশকতা মামলার আসামী  মোস্তাফিজুর রহমান ছোট আওয়ামী লীগে যোগদানের চেষ্টা করছেন। লক্ষ্য একটাই, আগামি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি আবারও চেয়ারম্যান হবেন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য স্থানীয় এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবির সেল ফোনে সোমবার সকাল ৮ টা ৯ মিনিটে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার ফোনটি বন্ধ ছিল। তবে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনসুর আহমেদ ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে মুঠোফোনে জানান, চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ছোট আওয়ামী লীগে যোগদান করতে চায়। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে দলীয় ভাবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি সম্বলিত পোষ্টারের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। এ ব্যাপারে এমপি সাহেবই ভাল বলতে পারবেন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাইডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছাত্রদল এবং পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি এক সময়ের বিএনপির তুখোড় নেতা। কলারোয়া সরকারি কলেজের ছাত্রদলের তুখোড় নেতা ছিলেন। ওই কলেজের ভিপি হয়েছিলেন। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের ভোটেই তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনিও আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। লক্ষ্য একটাই আগামী নির্বাচনে আবারও চেয়ারম্যান হবেন।

বর্তমানে স্থানীয় এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবির খুব কাছের মানুষ হিসেবে তিনি ইতমধ্যে এলাকায় পরিচিত পেয়েছেন। এমপি’র সাথেই তিনি তার এলাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন। এনিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা চরম ক্ষুব্ধ।

সাতক্ষীরা আলিমা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি আক্তারুজ্জামান। তিনি জামায়াতের একজন অন্যতম সংগঠক। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুযোগসন্ধানী এই জামায়াত নেতা ঢুকে পড়েন জেলা ওলামা লীগে। পদ পান সাতক্ষীরা জেলা ওলামা লীগের সহ-সভাপতির। তার স্ত্রী জামায়াতের মহিলা সংগঠক। তার শ্বশুর আশাশুনির জামায়াত দলীয় সাবেক এমপি মাওলানা রিয়াছাত আলী বিশ্বাস। যিনি জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য। সম্প্রতি জেলা শহরের মুন্সিপাড়ার একটি বাড়িতে জামায়াতের ১৮ জন মহিলা সদস্য সরকার বিরোধী গোপন বৈঠক করার সময় পুলিশের হাতে আটক হয়। এ ঘটনায় জামায়াতের মহিলা সদস্যদের সহযোগিতা কারার অভিযোগে মুফতি আক্তারুজ্জামানকে পুলিশ গ্রেফতার করে। সুযোগসন্ধানী এই ওলামালীগ নেতা নাশকতা মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

শুধু সেলিম বাবু, চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ছোট , চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, মুফতি আক্তারুজ্জামান নয়, বিএনপি,জামায়াত, জেএমবির একাধিক নেতা আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছেন। কেউ ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের ঘরে ঢুকেও পড়েছেন।

সাতক্ষীরা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু সায়ীদ ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, বিএনপি, জামায়াত ও জেএমবির কিছু সুযোগসন্ধানি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছেন এ কথা সত্য। আমাদের কিছু কিছু নেতা সুবিধা নিয়ে এদেরকে আওয়ামী লীগে প্রবেমের সুয়োগ করে দিচ্ছেন এ অভিযোগও মিথ্যে নয়।

আওয়ামী লীগের এসব চিহ্নিত নেতাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত-বিএনপির একাধিক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগে যোগদানের যে পায়তারা চালাচ্ছে তা সফল হতে দেওয়া হবে না। জামায়াত-বিএনপির এসব সুযোগসন্ধানীরা আওয়ামী লীগে ঢুকে আওয়ামী লীগকেই ধবংস করার চেষ্টা করছেন। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিস্কার বক্তব্য, কোন সুযোগসন্ধানী বা বিতর্কীত ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগে স্থান দেয়া হবে না।

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কিছু হাইব্রীড ও অসৎ , সুযোগসন্ধানী নেতা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে বিতর্কীত কিছু ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগে ঢুকাচ্ছেন। এসব হাইব্রীড ও অসৎ নেতাদের সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার আহবান জানান তারা। এ ব্যাপারে তারা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।