সাতক্ষীরায় এক জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেটের বাসায় কাজের মেয়েকে বর্বর নির্যাতন !


555 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় এক জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেটের বাসায় কাজের মেয়েকে বর্বর নির্যাতন !
আগস্ট ১৯, ২০১৫ জাতীয় ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি ॥
দুই মাসেরও বেশী সময় ধরে অমানবিক নির্যাতনের পর কাজের মেয়ে বীথি (১০) কে  বুধবার বিকালে সাতক্ষীরার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল ইসলামের ভাড়া বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অসুস্থ্য অবস্থায় তাকে সাতক্ষীরা সদর  হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বুধবার দুপুর ১টা থেকে মেয়েটি বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ‘পানি দাও, পানি খাব’ বলে আকুতি জানালে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ থাকায় তারা তাকে সাহায্য করতে পারেননি। পরে প্রতিবেশীরা বিভিন্ন স্থানে জানাজানি করলে ঘটনাস্থলে আসে পুলিশ। এরপরও   ঘন্টা দেড়েক পুলিশকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে সাতক্ষীরা চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহা, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নম্বর-১ শিমুল কুমার বিশ্বাস, সাতক্ষীরা সদর এএসপি সার্কেল আনোয়ার সাঈদসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা এলে ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এসময় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। তার গায়ে পোড়া, ছ্যাকা এবং আঘাতের ৩০টিরও বেশী চিহ্ন রয়েছে। তবে কাজের মেয়ে বীথি ( ১০)  তার ওপর কোন ধরনের নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেছে ।  এমনকি  দগদগে ক্ষতচিহ্নগুলো দেখাতেও বার বার আপত্তি জানায় সে।
সাতক্ষীরা শহরের টাউনবাজার ব্রীজের বিপরীতে পলাশপোল মহল্লায় মো: আকরাম হোসেনের বাড়িতে ভাড়া থাকেন সাতক্ষীরা আদালতের জুডিসিয়াল  ম্যাজিস্ট্রেট,চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙা উপজেলার মো: নূরুল ইসলাম। অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, তিনি ও তার স্ত্রী নাতাশা প্রায়ই শিশুটির ওপর নির্যাতন করে থাকেন। প্রতিবেশীরা মেয়েটির চিৎকার শুনে এগিয়ে এলেও তার সঙ্গে তারা কথা বলতে দিতেন না। দিনভর ঘরের দরজা বন্ধ থাকতো ।  মেয়েটির পিতা বা স্বজনদের সাথেও মোবাইলে কথা বলতে দেয়া হতো না শিশুটিকে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকমত খাবারও দেয়া হতো না মেয়েটিকে। না খেয়ে তার শরীর যেনো ন্যুয়ে পড়েছে। মেয়েটি এতোটাই দুর্বল যে, তার কথা বলা বা ঠিক মতো চলারও শক্তি নেই।
বুধবার বেলা একটার দিকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল ইসলাম আদালতে থাকাকালীন কাজের মেয়ে বীথি বাসার  ব্যালকনিতে আটক অবস্থায়  বারবার পানি চায়। প্রতিবেশীরা জানান, তাকে দিনে রাতে কাজের সময় ব্যতীত অন্য সবসময় ওই ব্যালকনিতেই কাটাতে হয় বা দেখা যেত। মেয়েটির আকুতির খবর প্রথমে সাতক্ষীরা সদর থানায় পৌঁছায়। এর পরপরই সদর থানার  ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদ শেখ একদল পুলিশ নিয়ে সেখানে চলে আসেন। কিন্তু ভেতর থেকে দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানানোয় তারা বিপাকে পড়ে যান। এসময় সহকারী পুলিশ সুপার মো: আনোয়ার সাঈদ এবং সদর উপজেলা  নির্বাহী অফিসার শাহ্ আব্দুল সাদী ঘটনাস্থলে পৌছান। একই সময়ে পৌছান সাতক্ষীরার  চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহা ও তার সহকর্মী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিমুল কুমার বিশ্বাস। তাদের সাথে ছিলেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল ইসলাম। এরপর বুধবার  বিকাল সাড়ে চারটার দিকে দরজা খুলে দেওয়া হয়।
মেয়েটি তার নাম বীথি  ইসলাম এবং বাবার নাম রসুল আলী উল্লেখ করে জানায়, মাগুরা জেলার  শালিকা উপজেলার বড় আমিয়ান গ্রামে তার বাড়ি। ক্লাস থ্রি তে পড়াকালীন তার বাবা তার মাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ। মেয়েটি আরও জানায়, তার বাবার মোট চারটি বিয়ে। সে আরও জানায়, তার কাকা পরিচয়ের সাতক্ষীরা চীফ জুডিশিয়াল আদালতের কর্মচারী সোহরাব হোসেন তাকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল ইসলামের বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসাবে নিয়োগ করান।
বুধবার বিকেলে উদ্ধার হওয়ার পর আতংকিত  ছোট্ট মেয়েটি তার ক্ষতচিহ্ন দেখাতে বার বার অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি  ওড়না সরিয়ে মাথা  ছাড়াও  পিঠ হাত দেখাতেও অস্বীকৃতি জানায় সে। পরে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কোহিনুর ইসলাম ও নারী নেত্রী নাসরিন খান লিপির অনুরোধে সে ক্ষতচিহ্নগুলি দেখায়। মেয়েটির মাথার চুল সদ্য কাটা অবস্থায় দেখা যায় ।  জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহা , পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা এবং সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকরা তা প্রত্যক্ষ করেন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল ইসলাম  এ সময় সেখানে নির্বিকার দাঁড়িয়ে থেকে বলেন, তার দেহে এগুলি কিসের দাগ তা তার  তার কাছেই জিজ্ঞাসা  করুন । এর পর ওই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেট সাংবাদিকদের বারবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন ।
বীথি  আরও জানায়, সে তার খালার মেয়ে রেহানকে দেখাশোনা করে। তারা চারবোন রুমা, দিতি, রহিমা ও নিজে  উল্লেখ করে  তার দেহে কেউ নির্যাতন করেননি। এগুলি সব মশার কামড়ের দাগ। বারবার সে একই কথা বলতে থাকে। সে জানায়, সে ভাল আছে। কেউ তাকে মারধর করেনি। খালা ও খালু তাকে খুব ভালবাসেন ।
প্রতিবেশীরা জানান, ম্যাজিস্টেট নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাতাশা একে অন্যকে প্রায়ই মারধর করে। গভীর রাতে প্রায়ই  তাদের ওই ভাড়া বাড়িতে হুলুস্থূল পড়ে যায়। কয়েকদিন আগেও নাতাশা তার স্বামী নুরুল ইসলামকে মারধর করে।
এদিকে, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল ইসলাম মেয়েটিকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, গত ২৪ মে তার ছেলে তানজিম আহমেদ(৩) নিজ ঘরে রাখা টেলিভিশনের ট্রলিতে চাপা পড়ে মারা যায়। তার কিছুদিন পর বীথিকে  কাজের মেয়ে হিসাবে তার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
মেয়েটি যখন পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন ওই ম্যাজিস্টেটের স্ত্রী  নাতাশা বাড়ির মধ্যে একটি কক্ষে দরজা বন্ধ করে বসে ছিলেন। তিনি কারো সামনে আসেননি।
সাতক্ষীরা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহা সাংবাদিকদের জানান, ‘ নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা প্রমানিত হলে ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। তিনি বলেন, মেয়েটিকে আপাতত: হাসপাতালে চিকিৎসাধীন  রাখা হয়েছে।
সাতক্ষীরার সহকারী পুলিশ সুপার মো: আনোয়ার সাঈদ জানান, তাদের কাছে খবর আসে যে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল ইসলাম তার  ভাড়া বাড়িতে এক কাজের মেয়েকে নির্যাতন করেছেন। মেয়েটির আকুতির কথা তাদের কাছে পৌঁছানো মাত্রই সেখানে পুলিশ যায়। কিন্তু প্রায় দেড় ঘন্টা পর তারা দরজা খোলেন। তিনি জানান, মেয়েটির দেহে অনেকগুলি ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে ।  ডাক্তারদের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বিষয়টি আরও নিশ্চিত করে বলা যাবে। তিনি আরও বলেন, যেহেতু প্রাথমিকভাবে বীথি  তার ওপর নির্যাতনের কথা স্বীকার করেনি সেজন্য আপাতত: ম্যাজিস্ট্রেট ও তার স্ত্রীর ওপর কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটির জবানবন্দী রেকর্ড করার পর এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় এই রিপোর্ট লেখার সময় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল ইসলামের বাড়িতে আবারও পুলিশ যায় ।  এ ব্যাপারে ওসি জানান, আইনগত ব্যবস্থা নিতেই তারা সেখানে গেছেন।
সাতক্ষীরা সদর থানার ওসি এমদাদ শেখ বুধবার  রাত সােড় ১০ টায় ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, মেয়েটিকে ২২ ধারায় জবানবন্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেট শিমুল বিশ্বাস মেয়েটির জবানবন্ধি রেকর্ড করেছেন। মেয়েটির পরিবারকে খবর দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, যে কারণেই হোক মেয়েটি তার উপর নির্যাতনের কোন কাহিনী এখনো বর্ননা করেনি। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেটের সামনে ২২ ধারায় সে কাউকে অভিযুক্ত করেনি। বিধায় মেয়েটির পরিবারের সদস্যদের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার পরিবার যদি অবিযোগ দেয় তাহলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।