সাতক্ষীরায় চিকিৎসার নামে চলছে তিয়ানশির প্রতারণা : হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা


1289 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় চিকিৎসার নামে চলছে তিয়ানশির প্রতারণা : হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা
জুলাই ১২, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর স্বাস্থ্য
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি :
সাতক্ষীরায় চিকিৎসার নামে তিয়ানশি কোম্পানীর লাগামহীন প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। জামাত-শিবিরের কার্যক্রামের আড়ালে সকল প্রকার রোগ নিরাময়ের মিথ্যা প্রলোভনের জালে আটকা পড়ে চীন ভিত্তিক তিয়ানশি কোম্পানীর ঔষধ ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করে নিরীহ মানুষ একদিকে যেমন মারাত্মক শারীরিক জটিলতার মুখে পড়ছে, তেমনি বছরে হােিতয় নিচ্ছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। ফুড সাপ্লিমেন্টারীর নামে চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসব সামগ্রীর নেই সরকারের ঔষধ প্রশাসন, খাদ্য বিভাগ কিংবা বিএসটিআইয়ের কোন প্রকার অনুমোদন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ঔষধ ও ফুড সাপ্লিমেন্টারী ব্যবহারে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদিত চিকিৎসক কর্তৃক ব্যবস্থাপত্র প্রদানের আইন রয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য ঝুঁকির চিন্ত না করে মনগড়া ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন তিয়ানশির সাথে সংশ্লিষ্ট এমন সব অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তি যাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোন ধারণাই নেই। এভাবে দিনের পর দিন ভূয়া চিকিৎসক কর্তৃক প্রদত্ত বে-আইনী ফুড সাপ্লিমেন্টারী চড়া দামে কিনে ব্যবহার করে শত শত মানুষ প্রতিনিয়ত ক্ষতির মুখে পড়লেও প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকায় চরম ক্ষুদ্ধ সাধারণ জনগণ।
তথ্যানুসন্ধানে জানাযায়, সাতক্ষীরা শহর এলাকায় তাদের কোম্পানীর অফিস রয়েছে প্রায় ১০ টি। যার মধ্য করিম সুপার মার্কেটের বিপরীতেই রয়েছে বেশ কয়েকটি অফিস। এসব অফিসের নেতৃত্বে রয়েছেন জাহিদুল ইসলাম, ইলিয়াস  হোসেন, আসাদুল ও মফিজুল ইসলাম সকলে সেভেন স্টার খ্যাত, রাধানগর এলাকার ব্রিজ সংলগ্ন আবু সাঈদ সারের বাসায় ২য় তলা মোস্তাফিজুর রহমান থ্রি স্টার খ্যাত, পাওয়ার হাউজের বিপরীতে গনি চেয়াম্যানের বাড়ির নিচ তলায় ডা. রাশেদুজ্জামান সেভেন স্টার খ্যাত, ছাড়াও জজ কোর্টের সামনে, আমতালা মোড়, সরকারি কলেজ মোড়সহবিভিন্ন জায়গায় তাদের অফিস রয়েছে। কেউ আশাশুনি, কেউ শ্যামনগর কেউবা অন্য কোথাও থেকে এসে অফিস ভাড়া করে তিয়ানশি কোম্পানীর পন্য বিক্রয় করছেন। একই সাথে অফিস গুলোতে জামাত-শিরিরের চিহ্নিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন সাংগঠনিক কার্যক্রম। অনেকটা আন্ডার গ্রাউন্ডে অফিস করায় লোক চক্ষুর অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে তাদের কর্মকান্ড। এসব অফিসের মাধ্যমে মাসে প্রায় ৩২ লাখ এবং বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে কোম্পানিটি। অথচ জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসক, খাদ্য অধিদপ্তরে অথবা ড্রাগ প্রশাসন কেই কোন প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না এ কোম্পানির বিরুদ্ধে।
তিয়ানশি কার্যক্রমের সাথে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রমের আড়ালে সাতক্ষীরায় তিয়ানশি চিকিৎসার নামে চলছে চরম প্রতারণা।
এসব অফিসের মাধ্যমে ডায়াবেটিস, কিডনী, হৃদরোগসহ অন্যান্য জটিল রোগে চড়া দামে তিয়ানশির ঔষধ সেবন করে ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয় করে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তিয়ানশির ঔষধ সেবন ও সামগ্রী ব্যবহার করে কোন উপকার পাননি উল্টো নতুন নতুন শারীরিক সমস্যায় পড়েছেন। সর্ব নিম্ন সাড়ে ৩শ টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত পন্য বিক্রয় করে কোম্পানির গ্রাহক বানিয়ে এমএলএল পদ্ধতিতে সদস্য সংগ্রহ করে চলেছে কোম্পানিটি। অথচ এধরনের কোম্পানির উপর  রয়েছে সরকারের নিষেধাজ্ঞা।
সরজমিন অনুসন্ধানে জানা যায় অনেকটা এমএলএম পদ্ধতিতে সদস্য সংগ্রহ করে ক্রম বর্ধমান মুনাফা ও লোভনীয় পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে সহজ সরল মানুষকে তিয়ানশির বিপনন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। বিক্রয় কাজে দক্ষতা ও সদস্য অন্তভূর্তির সাফল্য অনুযায়ী একজন সদস্য ফার্ষ্ট ষ্টার থেকে শুরু করে এইট ষ্টার র‌্যাংক বা তদুর্ধ পর্যন্ত হতে পারেন। র‌্যাংক অনুযায়ী পুরস্কারের মধ্যে ল্যাপটপ, বিদেশ ভ্রমন, প্রাইভেট কার, বাড়ি, বিলাসবহুল নৌযান ইয়টসহ এমনকি বিমান পর্যন্ত রয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি এখানে চলে রোগী দেখা, ঔষধ বিক্রয়, সদস্যদের মোটিভেশনসহ যাবতীয় কার্যক্রম। জেলার সংগঠন গুলোর সার্বিক দায়িত্ব পরিচালনা করছেন সেভেন ষ্টার র‌্যাংক ধারী ব্যক্তিরা । রোগী দেখা, রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপত্র প্রদানসহ অন্যান্য কার্যক্রম তারাই করে থাকেন।
তিয়ানশির রোগ নির্ণয়ের ধরণ ও ঔষধের মান সম্মন্ধে জানতে চাইলে জাহিদুল ইসলাম, ইলিয়াস হোসেন, মোস্তাফিজুর বলেন, আমরা কোম্পানির নিজস্ব পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয় করে থাকি, যা শতভাগ নির্ভূল। এখানে চিকিৎসা গ্রহন করে সকল রোগের নিরাময় সম্ভব এবং এখানকার ঔষধের কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই।
এ ব্যাপরে ঔষধ প্রশাসন সাতক্ষীরা অঞ্চলের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক মো: রেহান হাসান বলেন, তিয়ানশির এ ধরণের ঔষধ সামগ্রী বিক্রির কোন অনুমতি নেই। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রতারনার মাধ্যমেই এ কার্যক্রম চলছে। তবে তারা যদি ওষুধের দোকানে বিক্রয় করে তাহলে আমারা সেটি দেখতে পারি। কিন্তু যদি অন্য ভাবে বিক্রয় করে তাহলে সেটি আমাদের নিয়োন্ত্রনের বাইবে।
সাতক্ষীরার ঔষধ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দীন আলী বলেন, ঔষধ ও খাদ্য বিভাগ এবং বিএসটিআয়ের কোন প্রকার অনুমোদন ছড়া ঔষধ বিক্রি সম্পূর্ণ প্রতারনা। এছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) কর্তৃক নিবন্ধিত চিকিৎসক ছাড়া ঔষধ সামগ্রী ও ফুড সাপ্লিমেন্টারীর ব্যবস্থাপত্র প্রদান আইনত নিষিদ্ধ ও দন্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের বেআইনি কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, এ কোম্পানি কি বৈধতার মাধ্যমে কাজ করছে সেটি খতিয়ে দেখা হবে। যদি জনসাধারনের ক্ষতি সাধন করে এমন কোন কাজের সাথে যুক্ত থাকে তা হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।