সাতক্ষীরায় টমেটো চাষে সাফল্য


422 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় টমেটো চাষে সাফল্য
অক্টোবর ২৯, ২০১৮ আশাশুনি ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

স্টাফ রিপোর্টার ::
আশাশুনি উপজেলার কুল্যা গ্রামের আক্কাস আলী বলেন, ‘অসময়ে প্রতিদিন পকেটে টাকা আসে। তাতে করে মন খুব ভাল থাকে। কোন অভাবই মনে হয় না।’ তিনি প্রতিদিনই বুধহাটা বাজারে কম বেশি টমেটো বিক্রি করেন। বিক্রি করে যে টাকা পান তাতেই তিনি খুশি হন।
আক্কাস আলী এ বছর দু’শতক জমিতে তিনটি বেডে পরীক্ষামূলক গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ করেন। চাষ করার সময় তার ভয় ছিল অসময়ে এই টমেটোর চাষ করে হয়তো লাভবান হওয়া যাবে না। কিন্তু পকেটে যখন টাকা আসতে থাকে সে ভয় তার দূর হয়।
কুল্যার পাশের গ্রাম কুলটিয়া। এই গ্রামের আলমগীর হোসেন বলেন, ‘পটল, বেগুন চাষের চেয়ে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষে লাভ বেশি। ৩ হাজার টাকা খরচ করে ১২ মণ টমেটো ২২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। এবার বেশি করে টমেটোর চাষ করবো।’ তিনি বেডের বাঁশ খুঁটি এখনও ভাঙেননি। ছাউনির পলিথিনও খুলে ফেলেননি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি ঠাকুরপাড়ার হুমায়ুন কবির গরিব মানুষ। অপরের জমি লিজ নিয়ে চাষ করেন। তিনি তার ফুফাতো ভাই সিরাজুল ইমলামের জমি লিজ নিয়ে এবার গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ করেন। হুমায়ুন বলেন, ‘ এটা খুব লাভজনক ফসল। আগামীতে ১০ কাঠা জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ করবো।’
দক্ষিণ ফিংড়ির শেখপাড়ার হাসান শেখ বললেন, ‘ গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ নতুন করেছি। ৫ হাজার টাকার মতো খরচ করে ১৭ হাজার ৭শ’ টাকা পেয়েছি। তিন গুণ বিক্রি হয়েছে। লাভ হয়েছে দ্বিগুণ।’ হাসান বাড়ির আঙিনায় তিনটি বেডে এই টমেটোর চাষ করেন। ক্ষেতের পরিচর্যা করেন তার স্ত্রী মনিরা বেগম। তিনি ইটভাটায় কাজ করেন বলে সময় পান না। তাই মনিরাকেই এই দায়িত্ব নিতে হয়। তারা ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রামের মিটিংয়ে গিয়ে এই গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ সম্পর্কে জানতে পারেন।
আক্কাস আলী, আলমগীর হোসেন, হুমায়ুন কবির ও হাসান শেখের মতো অনেকেই গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ করেন। ফিংড়ি গ্রামের নজরুল ইসলাম, মনির হোসেন, জ্যোৎস্না, কুল্যার নাজিমুদ্দিন ঢালী, নূর ইসলাম ঢালী, মোমিন সরদার, মোমিন মোড়ল, আফিল উদ্দিন ঢালী, রফিকুল সরদার ও আব্দুস সালাম সরদারসহ বিভিন্ন গ্রামের অনেকেই এই টমেটোর চাষ করেছেন। তারা বাজারে যেমন টমেটো বিক্রি করেছেন, নিজেদের পরিবারের চাহিদাও তেমন মিটিয়েছেন।
আক্কাস আলী পানি উন্ন্য়ন বোর্ডের ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রামের কুল্যা আমোদখালীতে পানি ব্যবস্থাপনা দলের সদস্য। আলমগীর হোসেন দারিখা খা খাল পানি ব্যবস্থাপনা দলের সদস্য। হুমায়ুন কবির মরিচ্চাপ পানি ব্যবস্থাপনা দলের কার্যকরী সদস্য। আর হাসান শেখ কৈ-খালী খাল পানি ব্যবস্থাপনা দলের সদস্য। পানি ব্যবস্থাপনা দলের সদস্য হবার সুবাদে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের প্রশিক্ষণ পান।
ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রামের জোনাল কোঅর্ডিনেটর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ জয়নাল আবেদীন জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পোল্ডার-২-তে ২০১৬ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুল্যা আমোদখালী পানি ব্যবস্থাপনা দলে দুটি প্রদর্শনী করে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ৪ জন কৃষক বারি-৪ জাতের গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করেন। ২০১৭ সালে অক্টোবর মাসে ব্লু-গোল্ড প্রোগাম পারস্পরিক শিখন-এর আয়োজন করে। এই প্রোগামে বিভিন্ন পানি ব্যবস্থাপনা দলের মোট ৫৭ জন কৃষক অংশগ্রহণ করেন।
ব্লু গোল্ড প্রোগাম পারস্পরিক শিখন থেকে উদ্ধুদ্ধ হয়ে ১০টি ব্যবস্থাপনা দলের ৩০ জন চাষী গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু স্থানীয় বাজারে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর বীজ না পাওয়ায় তারা ব্লু গোল্ড এর কাছে সহযোগিতা চাইলে তাদের বীজের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। দুই জন কৃষককে চারা উৎপাদনের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তারা তা সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করেন। চারা উৎপাদনের পর ৩০ জন চাষীর মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী চারা বিতরণ করা হয়। ক্ষেত্র বিশেষে নগদ অর্থ ও পলিথিনও বিতরণ করা হয়। পরবর্তীতে তাদেরকে কারিগরি জ্ঞান দিয়ে সহযোগিতা করা হয়। প্রত্যেক চাষী কম বেশি ৩ শতাংশ করে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ করেন।
আগামীতে সকল চাষী আরও বেশি জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের উদ্যোগ নিচ্ছেন। ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রাম এ বছর আরও তিনটি পারস্পরিক শিখনের আয়োজন করা হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষে পোল্ডার-২-তে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। তাই আক্কাস আলী, হুমায়ুন কবির, হাসান শেখ ও মনিরা বেগম বললেন, ‘এখন থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।’