সাতক্ষীরায় থেমে নেই করোনা প্রতিরোধে অভিযান


414 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় থেমে নেই করোনা প্রতিরোধে অভিযান
এপ্রিল ১৩, ২০২০ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

গতকাল ১২ এপ্রিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শেখ হাসিনা খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের জেলা সমূহের সাথে সাথে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন। সাতক্ষীরা জেলার জেলা প্রশাসক, এস এম মোস্তফা কামাল, ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জেলাবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানান এবং সাতক্ষীরা জেলাতে করোনা প্রতিরোধে সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। জেলার সকল মাননীয় সংসদ সদস্য, জেলা পুলিশ, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা আওয়ামী লীগ, জেলা পরিষদসহ সম্মিলিত উপায়ে সাতক্ষীরা জেলা করোনা মোকাবিলার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে মর্মে জেলা প্রশাসক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। করোনা চিকিৎসার জন্য জন্য সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে জানিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার সার্বিক দিক তুলে ধরেন। সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর থেকে পাঁচ হাজার মানুষ সাতক্ষীরা জেলায় আসেন। তাদেরকে কোয়ারান্টিনে রাখা হলেও জেলাবাসী এ নিয়ে শঙ্কিত রয়েছেন মর্মে জেলা প্রশাসক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাতক্ষীরা জেলার সম্মিলিত কার্যক্রমের বিষয়ে আগ্রহ সহকারে শুনেন এবং তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সাতক্ষীরা জেলাতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে দুধ অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে যেগুলো স্থানীয় মিষ্টির দোকানে সরবরাহের কথা বলেন। সামনে চিংড়ি মৌসুমে চিংড়ি রপ্তানি করতে না পারলে চিংড়ি খাতের সাথে জড়িতরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেটিও তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল। এ বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবগত হয়ে সাতক্ষীরার দুধ ও চিংড়ি সংরক্ষণ করতে নির্দেশনা প্রদান করেন।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সাতক্ষীরাবাসীকে অনুপ্রাণিত ও বিনোদনের যোগান দিতে এবং করোনা ক্লান্তি কাটাতে সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভ ও ডিস ক্যাবল চ্যানেল কবিতা পাঠ করেন জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল। এসময় ফেসবুক লাইভে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ যুক্ত ছিলেন। প্রায় এক ঘন্টা যাবত অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে বিখ্যাত কবিদের কবিতা আবৃত্তি করেন তিনি। কবিতা আবৃত্তির পাশাপাশি মানুষকে নিয়মিত হাত ধোয়া ও সচেতন হতে পরামর্শ দেন। ফেসবুক কমেন্টে রোজ বাবু লিখেছেন করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ও আক্রান্তের এই মহাদূর্যোগ লকডাউনে মানুষ আসলেই ঘরে বা বাড়িতে ক্লান্ত। এই সময়ে এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রসংশনীয়। এছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ কমেন্টে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান।

এছাড়া আজ সাতক্ষীরা জেলার প্রতিটি উপজেলায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতামূলক অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সহকারী কমিশনারদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আনসারের সমন্বয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতকরন ও অভিযান আরো জোরদার করা হয়েছে।

সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখা ও সরকারি আদেশ অমান্য করে ৬ টার পর দোকান খোলা রাখা এবং বিনা প্রয়োজনে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করার অপরাধে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন অভিযানে সর্বশেষ তথ্যমতে এখন পর্যন্ত ৩৪ টি অভিযানে ৩৯ টি মামলায় ৬২,৮০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৫ টি মামলায় ১৪০০০ টাকা, তালা উপজেলায় ৩ টি মামলায় ১০৫০০ টাকা, দেবহাটা উপজেলায় ১ টি মামলায় ৫০০ টাকা, শ্যামনগর উপজেলায় ৮ টি মামলায় ২৮৮৫০ টাকা, আশাশুনি ৭ টি মামলায় ২২০০ টাকা, কলারোয়া উপজেলায় ৭ টি মামলায় ১৬০০ টাকা এবং জেলা প্রশাসনের ৮ মামলায় ৫২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলাতে বাইরের জেলা থেকে আসা মানুষের মধ্যে ১৩৫৮ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে এবং ৪৭৩৪ জনকে বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ১৬ জন, শ্যামনগর উপজেলায় ৩৫০ জন, কালীগঞ্জ উপজেলায় ৯৫২ জন এবং আশশুনি উপজেলায় ৪০ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং আনসার ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে চেক পোস্ট বসানো হয়েছে।যে সকল মানুষ লক ডাউন উপেক্ষা করে বিভিন্ন জেলা থেকে সাতক্ষীরা জেলা সীমান্তে আসছে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া অমানবিক । যারা ফিরে আসছেন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক এবং হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩৫৮ জনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।

এছাড়া, তথ্য অধিদপ্তরের একটি সহ মোট ৩টি সচেতনতামূলক মাইকিং প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে এবং শতভাগ হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান ছাড়া অন্যসব দোকান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এ জেলাকে করোনা ঝুঁকি মুক্ত রাখতে জেলার সাথে পার্শ্ববর্তী জেলার সকল সীমান্ত এবং আন্ত: উপজেলা সীমান্ত জরুরী সেবা ব্যতীত (যেমনঃ রোগীবাহী গাড়ী, ঔষধ পণ্যবাহী গাড়ী ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মালামালবাহী গাড়ী) সকল প্রকার যানবাহন ও জনচলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ আদেশ বহাল থাকবে। অমান্যকারীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

সাতক্ষীরা থেকে করোনা টেস্টের জন্য এ পর্যন্ত ১৪৩ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে। ৯ জনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। আশার কথা হলো সবাই করোনা নেগেটিভ।

করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শেণি-পেশার মানুষ যারা ওয়ার্ড-ইউনিয়ন পর্যায়ে তালিকাভুক্ত হতে সংকোচবোধ করছে কিন্তু খাদ্য সংকট আছেন তাদের নাম, ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বারসহ এসএমএস এর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক নিজে তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। রাতে গোপনে তাদের বাড়িতে খাদ্যসামগ্রী পৌছে দেওয়া হচ্ছে। “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার” শিরোনামে ঘরে ঘরে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান মোটরসাইকেল দল। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে প্রাপ্ত ৪৪ মধ্যবিত্ত পরিবারকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া, আমতলা, মধুমালার ডাংগী, ব্রহ্মরাজপুর, পুরাতন সাতক্ষীরা, সুলতানপুর, কুখরালি বলফিল্ড, ফিংড়ি, লাবসা,ঝাউডাংগা ও আবাদের হাট এলাকার এ সকল পরিবারকে উপহার পৌঁছে দেয়া হয়। ইতিপূর্বে জেলা প্রশাসকের নম্বরে এসএমএস থেকে প্রাপ্ত ৪৩৭ টি পরিবারসহ মোট ৪৭৭ পরিবারের মাঝে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সংকটকালীন সময়ে সাতক্ষীরা জেলার দুঃস্থ শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মাঝে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার নিয়ে পাশে দাড়িয়েছেন জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল।

প্রতিটি উপজেলায় ইউনিয়ন ভিত্তিক দুস্থ ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের বাহিরে থাকা গরীব মানুষের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌছে দেয়া হচ্ছে। ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রে নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রনালয় থেকে পাওয়া মোট বরাদ্দ থেকে ইতোমধ্যে উপজেলা, পৌরসভার অনুকূলে ৬০০ টন চাল এবং ২০ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌরসভার মেয়রগণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করে এই ত্রাণ সহায়তা কর্মহীন হয়ে পড়া দুস্থ অসহায় মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে উপজেলা ও পৌরসভার ৪২,৫০০ পরিবারের মাঝে সরকারি ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। সকল সরকারি ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে সকলকে ব্যাগের গায়ে “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার” কতাটি লিখে দেয়া হচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলায় বরাদ্দকৃত ত্রাণ সহায়তা উপজেলা ও পৌরসভাওয়ারী বন্টন করে দেয়া হয়েছে। সাতক্ষিরা সদর উপজেলায় ৯১ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৪,৬৩,৫০০/- টাকা, কলারোয়া উপজেলায় ৬৭ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩,৩০,০০০/- টাকা, তালা উপজেলায় ৭৩ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩,৫৪,০০০/- টাকা, আশাশুনি উপজেলায় ৭২ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩,৮৪,০০০/- টাকা, দেবহাটা উপজেলায় ৪৯ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২,৫৭,০০০/- টাকা, কালিগঞ্জ উপজেলায় ৭১ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩,৬১,৫০০/- টাকা, শ্যামনগর উপজেলায় ৮১ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৪,১৫,০০০/- টাকা, সাতক্ষীরা পৌরসভা ৭০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩,৭৭,০০০/- টাকা এবং কলারোয়া পৌরসভা ২৬ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১,০৮,০০০/- টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

মসজিদে নামাজ ও জামায়াতের বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচারের জন্য উপপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সাতক্ষীরাকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রচারনা চালাচ্ছে।

জেলা প্রশাসক জেলার জনপ্রতিনিধি মাননীয় সংসদ সদস্যবর্গের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে জেলার পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে আলোচনা এবং পরামর্শ গ্রহণ করে করোনা মোকাবেলায় সর্বাত্মক কর্মসূচী বাস্তবাযন করে চলেছেন। এছাড়া, জেলা সদরের সিনিয়র সিটিজেনদের সাথে নিয়মিত ফোনে খোঁজ নিচ্ছেন এবং তাদেরকে ঘরের বাইরে না যেতে বিশেষ অনুরোধ করছেন।

সরকারি ত্রাণের তালিকা এবং বিতরণে অনিয়ম স্বজনপ্রীতি ও দূর্ণীতি হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং দুর্নীতি দমন আইনে মামলা করা হবে। এছাড়া, দোকান খুলে দেয়ার কথা বলে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী দোকানদারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঘরে থাকুন, বার বার সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন, নিরাপদে থাকুন। আপনি ঘরে থাকলে ভালো থাকবে আপনার পরিবার, ভালো থাকবে জাতি, ভালো থাকবে দেশ।

জনস্বার্থে সকল কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।