সাতক্ষীরায় দুগ্ধ শিল্প ধ্বংস : মিল্ক ভিটার দুষ্টচক্র দায়ী !


345 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় দুগ্ধ শিল্প ধ্বংস : মিল্ক ভিটার দুষ্টচক্র দায়ী !
ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

নাজমুল হক :
সাতক্ষীরায় দুগ্ধ শিল্পে ধ্বংস নেমেছে । মিল্ক ভিটার দুর্নীতিবাজ অসাধু একটি চক্র এর জন্য দায়ী। এ শিল্পের সাথে জড়িয়ে থাকা দশ সহ¯্রাধিক দুগ্ধ পেশায় জড়িতদের ভাগ্য জিম্মি হয়েছে ওই চক্রের হাতে। চক্রের দুষ্ট রোশানালে পড়ে জেলার দুগ্ধ খামারীরা মিল্ক ভিটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেসরকারি খাতে যাচ্ছে। সাতক্ষীরা দুগ্ধ শীতলকরণ কেন্দ্রের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে নিবন্ধিত ৩০টি সমিতির মধ্যে সক্রিয় আছে ২৬টি। ভুক্তভোগীরা জানান, ল্যাব টেকনিশিয়ান ও ডেপুটি ম্যানেজারের কারণে প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে খামারীরা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোন বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধে না দিলে তারা এমন অভিযোগ করে।

সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা বিসিক শিল্প নগরীতে ২০০৫ সালের ২৮ আগষ্ট প্রতিষ্ঠিত হয় মিল্ক ভিটার দুগ্ধ শীতলকরণ কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার পরে কেন্দ্রে ৩০টি সমবায় সমিতি নিবন্ধিত হয়ে নিয়মিত দুধ সরবরাহ করতো। কিন্তু সম্প্রতি কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ২৬টি সমবায় সক্রিয় আছে। কেন্দ্রে গড়ে উঠা দুষ্ট চক্রের রোশানলে পড়ে তারা টিকে থাকতে না পেরে বেসরকারি খাতে দুধ প্রদান করছে। কেন্দ্রে বর্তমানে ১০ হাজার ৫০০ লিটার ধারণ ক্ষমতা আছে। যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়। সূত্র আরো জানায়, কেন্দ্রে সক্রিয় ২৬টি সমিতির ৮ শতাধিক ব্যক্তি নিয়মিত দুধ প্রদান করে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা ও বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সমিতির মাধ্যমে দুধ গ্রহণ করা হয়।

সূত্র আরো জানায়, মিল্ক ভিটার নিময় অনুযায়ী দুধে ফ্যাটের স্বাভাবিক পরিমাণ হলো ৪ পয়েন্ট। পয়েন্টের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হয়। যা পরিমাপের জন্য ডিজিটাল মিল্ক এনালাইজার ব্যবহারের আছে। কিন্তু কেন্দ্রের ল্যাট টেকনিশিয়ান মুস্তাফিজ বিল্লাল নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সনাতন পদ্ধতিতে ফ্যাট নির্ণয় করে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, এখানেই মুস্তফিজ একটি চক্র তৈরি করেছেন। তিনি ফ্যাট কমিয়ে দাম নির্ধারণ করে দেন। অন্যদিকে তার চক্রের কিছু ব্যক্তিদের সাথে চুক্তি করে তাদের কম দুধে ফ্যাট বেশি দিয়ে কাগজ তৈরি করে। ফলে কাগজে ফ্যাট ঠিক থাকলেও তিনিসহ কতিপয় ব্যক্তি সুবিধে পায়।

দুগ্ধ পেশাজীবীদের অভিভাবক ও তালা উপজেলার চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ কুমার জানান, ‘তিনি দুগ্ধসমবায়ীদের মাধ্যমে জানতে পারেন মিল্কভিটার সাতক্ষীরা শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম, ল্যাব টেকনিশিয়ান মোস্তাইন বিল্লাহ ও সহকারি টেকনিশিয়ান রাসেল আহমেদ মুল দুগ্ধসমবায়ীদের উপেক্ষা করে একটি দুষ্ট চক্র তৈরী করেছেন। যারা এই অপকর্মে সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন। হামিদ, বিল্লাহ ও রাসেল মুল দুগ্ধ সমবায়ীদের দুধ বিক্রির সময় নানান কৌশলে ঘুষ দাবি করে থাকেন। যে সমবায়ীরা ঘুষ দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন তাদের দুধে ননি কম আছে জানিয়ে দুধ অবিক্রিত রেখে ক্ষতি সাধন করেন। এই ঘুষ চক্রের প্রতিবাদকারীদের ঠেকানোর জন্য আবার পাল্টা সমবায়ীও প্রস্তুত করা হয়েছে।’

বিষয়টি জানতে পেরে উপজেলা চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (যুগ্ম সচিব) জহিরউদ্দিন বাবরের সাথে ফোনে বিষয়টি বারবার অবগত করেন। পরবর্তিতে বিষয়টি দেখভালের জন্য ঢাকা ডেইরি থেকে নভেম্বরের ২২ তারিখে সাবদুল ইসলামকে সাতক্ষীরায় পাঠান। সাবদুল আসার পর সাতক্ষীরার দুগ্ধ সমবায়ীদের দুগ্ধমান উল্লেখযোগ্য হারে প্রমাণিত হতে থাকে। তখন সাবদুলকে ক্ষমতার দাপটে ওই চক্রটি এক মাসের আগেই (১৫ ডিসেম্বর’১৫) ঢাকা থেকে বদলির আদেশ নিয়ে আসে এবং দুগ্ধ সমবায়িদের ফের জিম্মি করে ফেলে। একই সাথে সাবদুলকে নরসিংদিতে বদলির নমুনা দেখিয়ে সমবায়িদের আরও হুমকি দেয়া হচ্ছে। এমনি ভাবে এর আগেও ঢাকা থেকে দেখভালকারী পাঠানো হলে যখনই সাতক্ষীরা মিল্কভিটার এ চক্রের কারসাজি ধরে ফেলে তখনই দেখভালকারীর বদলির আদেশ একমাসের মধ্যেই হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। ইতিপূর্বে হামিদ, বিল্লাহ ও রাসেল চক্রের অনিয়ম দুর্নীতি ধরে ফেলার কারনে হিসাবরক্ষক ইব্রাহিমকে বদলি করে ঝিকরগাছায়, সমিতি সংগঠক মাহবুবুর রহমানকে বদলি করে বাঘাবাড়ি পাঠানো হয়। এসব বদলিতে অনিয়মকারীরা যেমন শক্তিশালী হয়েছেন তেমনি জিম্মি করেছেন নিরীহ সাধারণ দুগ্ধ সমবায়ীদের।
তালা দুগ্ধ সমবায় ঐক্য পরিষদের সভাপতি রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই দুর্ব্যাবহার ও হুমকি দিয়ে সাতক্ষীরার দুগ্ধ শিল্প চীরতরে ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দিয়ে থাকেন।

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) সংসদ সদস্য মুস্তফা লুৎফুল্লাহ জানান, জেয়ালাসহ সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ও প্রতিষ্ঠিত দুগ্ধ শিল্প সম্পর্কে দেশবাসী অবগত। কতিপয় দুর্নীতিবাজ অনিয়মকারীদের জন্য এ শিল্প ধ্বংস হলে হাজার হাজার দুগ্ধসমবায়ী ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দুর্নীতি করা হলে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকার সাধারণ দুগ্ধসমবায়ীদেরকে রক্ষা করবেন।