সাতক্ষীরায় বিচারকের বাসায় শিশু নির্যাতন ! দেড় বছর পর বাবার কোলে বিথী


507 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় বিচারকের বাসায় শিশু নির্যাতন ! দেড় বছর পর  বাবার কোলে বিথী
জানুয়ারি ১৪, ২০১৬ জাতীয় ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মেহেদীআলী সুজয়/নাজমুল হক:
দীর্ঘ দেড় বছর পরে অবশেষে বাবার কোলই হলো বিচারিক হাকিমের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া নির্যাতনের শিকার দশ বছরের শিশু বীথির ঠিকানা। বুধবার বাগেরহাট কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র থেকে সাতক্ষীরায় এনে বীথিকে আদালতের মাধ্যমে তুলে দেওয়া হয় তারা বাবা গোলাম রসুল ওরফে মো. রসুলের কোলে। গত সাড়ে চার মাস যাবত তার ঠিকানা ছিল বাগেরহাটের কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র। দীর্ঘ দিন পরে বাবার কাছে ফিরে গিয়ে সে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। সাতক্ষীরা জর্জ কোর্টে পিপি এড. ওসমান গণি জানান, আদালতের মাধ্যমে বিথীকে দুপুরে বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, বিচারকের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া বিথীকে নিজের জিম্মায় নিতে তার বাবা মো. রসুল ৫ জানুয়ারি অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল আদালতে আবেদন করেন। আদালতের বিচারক মহিবুল হাসান বুধবার বিথীর উপস্থিতিতে শুনানি করেন। এ সময় বিথী আদালতে বাবার কাছে যেতে ইচ্ছা পোষণ করলে আদালত তার নিকট হস্তান্তর করেন।

প্রসঙ্গত, সাতক্ষীরা আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নূর ইসলামের পুত্র মারা যাওয়ার পরে বিচারকরে শ্বশুর বাড়ি থেকে বিথীকে আনা হয় সাতক্ষীরায়। বিথী ৯ মাস বিচারকের শ্বশুর বাড়ি ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকতো। গত বছরের ১৯ অগাস্ট শিশু বীথিকে সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোলের টাউন বাজার ব্রীজের বিপরীতে আকরাম হোসেনের বাড়ি ভাড়াটিয়ার কক্ষ থেকে দেহে ৩০ টি ছোট-বড় ক্ষত  কংকালসার বিথীকে উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ তার নেতৃত্বে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নূর ইসলাম দরজা না খোলায় চীফ জুডিশিয়াল নিতাই চন্দ্র সাহার সহায়তা চায় পুলিশ। ঐ দিন বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে চীফ জুডিশিয়াল নিতাই চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে পুলিশ অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতের চিহ্ন ছিলো। শরীর শুকিয়ে গিয়েছিলো। শরীরের হাড়গুলো দেখা যাচ্ছিলো। পিঠে কয়েকটি ফোসকা পড়েছিলো। তার মাথায় চুল কাটা ছিলো। উদ্ধারের পরে বিকেল সাড়ে ৪টায় সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।

ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া বিচারিক হাকিম নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাতাশা তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। এদিন চরম নির্যাতনের মুখে ‘পানি চাই, পানি খাবো’ বলে ভর দুপুরে বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শিশু বীথির আহাজারি দেখে প্রতিবেশিরা পুলিশে খবর দেয়। কিন্তু বাড়ির দরজা বন্ধ করে রাখায় পুলিশ সমস্যায় পড়ে যায়। এরপর থেকে টানা ১৭ দিন সাতক্ষীরা হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে বীথিকে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাগেরহাট কিশোরী সংশোধন কেন্দ্রে। এখন সে যেন অন্যরকম বীথি। তার দেহের নির্যাতনের ক্ষতগুলো অনেকটা লুকিয়ে যায়। দুই মাসেরও বেশি সময় যাবৎ নির্যাতন ও অভুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হাড় জিরজিরে কংকালসার বীথি এখন এক সুস্থ  সবল শিশু বলে সে সময় জানিয়েছিলো ডাক্তাররা।

অন্যদিকে সাতক্ষীরায় থাকাকালে তার চিকিৎসায় চার সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সে পুলিশ  ও সাংবাদিকদের সামনে তার ওপর নির্যাতনের  নির্মম কাহিনী তুলে ধরে জানায়, তাকে গরম খুন্তি, রুটির তাওয়া, গরম পানির ছিটা, এমনকি ভাতের গরম ফেন দিয়ে নির্যাতন করা হতো। মারধর করা হতো। খেতে দেওয়া হতো না। এমনকি বাদ দেওয়া ছিন্ন পোশাকেই কাটাতে হতো তাকে। দিনের কয়েক ঘন্টা যাবত প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কোনো সুযোগ ছাড়াই আহার ও পানিবিহীন অবস্থায় বাড়ির ব্যালকনিতে অবরুদ্ধ করে রাখা হতো। বারণ ছিল কারও সাথে কথা বলারও । বাসার বাথরুম ব্যবহার করাও ছিল নিষেধ ।
পুলিশ সূত্র জানায়, বীথি প্রথম পর্যায়ে তার বাবা মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার বড় আমিনিয়ার গ্রামের গোলাম রসুল ওরফে রসুল আলির সাথে যেতে সম্মত হয়নি। ফলে ২ সেপ্টম্বর আদালত তাকে বাগেরহাটে কিশোরী সংশোধন কেন্দ্রে পাঠায়।

এদিকে বহু ক্ষতসহ বীথি উদ্ধারের পর ফুঁসে ওঠে সাতক্ষীরার নাগরিক সমাজ। শহরের নির্যাতনের প্রতিবাদে পোষ্টারও করা হয়। তীব্র প্রতিবাদের ঝড় তুলে তারা এই নির্যাতনে সাথে জড়িত দাবী করে বিচারিক হাকিম নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাতাশাকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে কয়েকটি  মানববন্ধন করেন। এ নিয়ে গঠিত হয় একটি গণতদন্ত কমিশন। গণমাধ্যম ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পরে তিনি ও তার স্ত্রী রাতের  আঁধারে  কাউকে কিছু না জানিয়েই বাড়ি থেকে হালকা তল্পিতল্পা নিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। এর কিছুদিন পর বিচারিক হাকিম নুরুল ইসলাম সাতক্ষীরায় তার স্বপদে ফিরে আসেন সাতক্ষীরায়।
এদিকে বীথির বাবা গোলাম রসুল গত ১ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় এসে সাতক্ষীরা থানায় সংশ্লিষ্ট বিচারিক হাকিম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে একটি  নির্যাতনের মামলার আবেদন জমা দেন। পুলিশ মামলা না নিয়ে আবেদনটি ফেরত দেয়। মামলা না নেওয়া এবং মেয়ে বীথি তার কাছে আসতে রাজী না হওয়ায় দরিদ্র ডিম ব্যবসায়ী গোলাম রসুল মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে যান গত ২ সেপ্টেম্বর। আর বীথির নতুন ঠিকানা হয় বাগেরহাট কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র।
সাতক্ষীরা জর্জ কোর্টের পিপি এড. ওসমান গণি জানান, গত ৫ জানুয়ারি বিথীর বাবা মো. রসুল মেকে তার জিম্মায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন। আদালতে বুধবার ধার্য্য দিনে বিথীকে হাজির করা হয়। বিথী বাবার সাথে যেতে সম্মতি হলে তকে বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়।