সাতক্ষীরায় বেড়েই চলেছে নারী ও শিশু নির্যাতন


157 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় বেড়েই চলেছে নারী ও শিশু নির্যাতন
অক্টোবর ১৫, ২০২০ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

২ সপ্তাহে ৫ ধর্ষণ, ৫ যৌন হযরানী, ৪ নির্যাতন, এক শিশু খুন ও ২ নারীর আত্মহত্যা

ডেস্ক রিপোর্ট ::

জেলায় চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে ধর্ষণ, যৌন হয়রানী, নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলার নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট জনেরা।
সাতক্ষীরায় গত দু’সপ্তাহে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫টি, ধর্ষণ চেষ্টা, যৌন নির্যাতন ও উত্যক্তের ঘটনা ঘটেছে ৫টি। এছাড়া হত্যার শিকার হয়েছে হৃদয় মন্ডল নামের তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্র। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৪টি। নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে দুটি। এসব ঘটনায় পুলিশ মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। বিভিন্ন সময়ে পৃথক ঘটনায় পুলিশের দেওয়া ভাষ্যমতে ৩ অক্টোবর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ৩ অক্টোবর সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার দিনমজুরের কন্যা ৫ম শ্রেণির ছাত্রীকে অপহরণ করে খুলনার লবণচরা এলাকায় নিয়ে ধর্ষণের অপরাধে আসাদুল ইসলাম ও শাওন নামের দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই সাথে ধর্ষণের শিকার ওই শিশুকেও উদ্ধার করে পুলিশ। একইদিন জেলার কালিগঞ্জে এক কলেজ ছাত্রীকে যৌন হয়রানীর অপরাধে পুলিশ উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের ইমাদুল ইসলামের ছেলে সোহেল গাজী (২০) কে গ্রেপ্তার করে। একই দিন জেলার পারুলিয়ায় ঘুড়ি বানানো দেখতে গিয়ে প্রতিবেশি মান্দার গাজীর নির্যাতনের শিকার হয় ফাতিন হাসনাত মাহি নামের এক প্রতিবন্ধী শিশু।
৪ অক্টোবর জেলার কালিগঞ্জে একটি শ্মশানঘাট থেকে উদ্ধার হয় নবজাতক। পরে ওই নবজাতককে আদালতের মাধ্যমে শিক্ষক দম্পতিকে দত্তক দেওয়া হয়।
৫ অক্টোবর মোবাইল ফোনে ছবি দেখানোর কথা বলে সাত বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করে আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের নাসিমাবাদ গ্রামের তরিকুল ইসলাম (১৮) নামের এক যুবক। ভারতে পালিয়ে যাবার প্রাক্কালে তাকে শ্যামনগরের কাশিমাড়ি এলাকা থেকে আটক করে সিআইডি।
একইদিন আশাশুনি সদরের আদালতপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন চালায় পাশের বাড়ির মৃত কাশেম গাজীর ছেলে ইসলাম গাজী (৫০) নামের এক ব্যক্তি। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।
৯ অক্টোবর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝিটকিতে নির্মমভাবে খুন হয়েছে হৃদয় মন্ডল নামের তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্র। পুলিশ এঘটনায় দুই শিশুসহ তিনজনকে আটক করে।
একইদিন আশাশুনিতে ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ চেষ্টা ও শ্লীলতাহানীর অপরাধে গ্রামবাসির সহায়তায় পুলিশ স্থানীয় কেবিএ প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মইনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। একইদিন শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতন সইতে না পেরে পিতার বাড়ি তালা উপজেলার খলিষখালিতে এসে আত্মহত্যা করেন কৃষ্ণা রাণী মন্ডল (১৯) নামের এক নারী।
একইদিন আশাশুনির কাপসন্ডায় এক তরুণী দলবদ্ধ বখাটেদের শ্লীলতাহানীর শিকার হয়ে ৬জনের বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দেয়। তবে ওই ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
১১ অক্টোবর কালিগঞ্জে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীকে উত্যক্তের অপরাধে পুলিশ কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের শংকরপুর গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে আল-আমিন (২০) কে আটক করে।
১২ অক্টোবর সদর উপজেলার ঘোনায় তুচ্ছ ঘটনায় জোসনা বেগম নামের এক অন্ত:সস্ত¡া নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
একইদিন জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার মথরেশ ইউনিয়নের পোর্ট বসন্তপুর গ্রামের ৭ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অপরাধে একই উপজেলার কুশলিয়া ইউনিয়নের কুলিয়া দুর্গাপুর গ্রামের মৃত মেনা মোল্যার ছেলে নির্মাণ শ্রমিক মাহাফিজুল ইসলাম (২৫) কে ১৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
একইদিন রাতে সদর উপজেলার মাধবকাটি গ্রামে শালিকাকে ধর্ষণের অপরাধে গ্রামবাসির সহায়তায় পুলিশ দুলাভাই সোলায়মান মোল্যা (২৩)কে গ্রেপ্তার করে। সোলায়মান মোল্যা ওই গ্রামের সাত্তার মোল্যার ছেলে। এছাড়া সদর উপজেলার বালিথায় ই¯্রাফিল নামের এক নবম শ্রেণির ছাত্র নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ১৪ অক্টোবর ভোরে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বিয়ের আশ্বাসে দশম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যান পুত্র মিজানুর রহমান (২২) কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার (১১ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে শ্যামনগর উপজেলার সদর সন্নিকটে ইসমাইলপুর গ্রামে মোল্যা টাইল্স নামীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে ওই ছাত্রীকে রাতভর ধর্ষণ করা হয়। ১৩ অক্টোবর ধর্ষিতা স্কুল ছাত্রী (১৭) শ্যামনগর থানায় ৩ জনের বিরুদ্ধে ২১ নং মামলা করেছে। ধর্ষক মিজানুর রহমান মিজান পূর্ব দূর্গাবাটি গ্রামের প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান হাজি নজরুল ইসলামের পুত্র।
একই দিন কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের নাসিমাবাদ গ্রামের আব্দুস সবুরের ছেলে আব্দুস সামাদ (১৯)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
একই দিন শ্যামনগরে মরিয়ম বেগম (১৯) নামের এক ৬ মাসের অন্ত:স্বত্তা গৃহবধুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মরিয়ম উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামের নাইমুর রহমান সোহাগের স্ত্রী।

বিভিন্ন সময়ে পুলিশের দেওয়া ভাষ্যমতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। নারী ও শিশুদের প্রতি সংঘটিত এসব অপরাধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলার সচেতন নাগরিকরা।

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের এপিপি ও নাগরিক নেতা এড. ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত না হওয়ার কারণে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এর থেকে বেরিয়ে আসার কোন উপায় নেই। এজন্য তিনি সমাজের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল সহিংতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

সাতক্ষীরা জেলা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী বলেন, নারী ও শিশুদের প্রতি যেভাবে দিন দিন নির্যাতন ও নিপীড়ন হচ্ছে তাতে রীতিমত আতঙ্কিত। পুলিশকে আরও বেশি কঠোর ও তৎপর হতে হবে। মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য সমাজের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, সম্প্রতি সাতক্ষীরাসহ সারা দেশে ধর্ষণ ও নিপীড়নের খবর অতীতের যেকোন সময়কে অতিক্রম করেছে। প্রতিদিন ধর্ষণ ও যৌন হয়রানীসহ নারী-শিশু নির্যাতনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যা উদ্বেগজনক। এভাবে চলতে পারে না। এর বিরুদ্ধে এখনই সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। সাতক্ষীরার প্রেক্ষাপটে গত দুই সপ্তাহে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের হার অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কয়েকজন। লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটি। যা জেলাবাসিকে আতঙ্কিত করেছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ অপরাধীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এজন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া বিকল্প কোন রাস্তা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নারী ও শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে নিউজ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ। নিউজ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি ও জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. আনিসুর রহিম বলেন, বিচারহীনতা ও আইনের শাসন না থাকায় অপরাধ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে এ ধরণের অপরাধ করতে কেউ সাহস পাবেনা। আইনের প্রয়োগ ও ভয় না থাকার কারণে অপরাধীরা সাহস পেয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নারী ও শিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরী বলে মন্তব্য করেন তিনি। নারী ও শিশু নির্যাতন-নিপীড়ন, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানীসহ সকল সহিংতার বিরুদ্ধে সামাজিক ব্রিগেড গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।