সাতক্ষীরায় মৎস্য চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেবে পদ্মা সেতু


152 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় মৎস্য চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেবে পদ্মা সেতু
জুন ২৫, ২০২২ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

উপকূলীয় জেলা হিসেবে সাতক্ষীরা চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ চাষে সমৃদ্ধ হলেও চিংড়ির পোনা আসে কক্সবাজার থেকে। দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দেওয়ার কারনে ফেরি ঘাটে দীর্ঘসূত্রতা ও যানজটের কারণে বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পোনা ব্যবসায়ী ও ঘের মালিকরা। অক্সিজেন ফেল করে মারা গেছে কোটি কোটি চিংড়ি পোনা। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য এক সময় কক্সবাজার থেকে বিমানে চিংড়ি পোনা পরিবহন শুরু হয়। এমনকি বেশ কয়েক বছর হেলিকপ্টারও চড়েছে চিংড়ি পোনা। কিন্তু পোনার দাম কমে যাওয়ায় সেটাও ধরে রাখা যায়নি। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এবার পাল্টাবে সেই পরিস্থিতি। ফেরি ঘাটের বিড়ম্বনার অবসানের মধ্যদিয়ে কম সময়ে পোনা এসে পৌছানোর কারনে চিংড়ি চাষে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা জেলায় বাগদা ও গলদা পোনার চাহিদা প্রায় ৩৫০ কোটি। এর মধ্যে বাগদা পোনার চাহিদা ৩৪০ কোটি এবং গলদা পোনার চাহিদা ১০ কোটি ৫৫ লক্ষ। বাগদা পোনার প্রায় সবটাই আসে কক্সবাজার থেকে। জানা যায়, সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় নিবন্ধিত প্রায় ৫০ হাজার জেলে রয়েছে।

একইভাবে সাতক্ষীরায় উৎপাদিত প্রায় এক লাখ টন চিংড়ি ও সাদা মাছ দেশ বিদেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌছাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে। রাজধানী ঢাকার মানুষ বরফ ছাড়াই সাতক্ষীরার জীবিত টাটকা মাছ কিনতে পারবে। ঘেরগুলো হতে রাতে ধরা মাছ ঢাকার বাজারে সকালে খুচরা ক্রেতারা এসে পৌছানোর পূর্বেই পৌছে যাবে। এমন প্রত্যাশা এখন সাতক্ষীরার মাছ ব্যবসায়ীদের।

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় আদি কাল থেকেই সাতক্ষীরার মৎস্য সম্পদ বিদেশে রপ্তানি হয়। ৪৭ সালের আগে সাতক্ষীরার মাছ উঠতো কোলকাতার বাজারে। আশির দশকে বানিজ্যিক মৎস্য উৎপাদন শুরু হওয়ায় প্রতিবছরই জেলায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানকার প্রধান পেশা কৃষির পরই মাছের অবস্থান। প্রায় ১০ লক্ষ নারী ও পুরুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে মাছ চাষের উপর নির্ভরশীল। চাষীরা বলছে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর মৎস্য উৎপাদনে সাতক্ষীরায় নীরব বিপ্লব হবে। জেলার জনগোষ্ঠীর চাহিদা মিটিয়ে বর্তমানে অতিরিক্ত প্রায় এক লক্ষ মেট্রিক টন মাছ দেশের অন্যান্য জেলাসহ বিদেশেও রপ্তানি করা হয়েছে। মৎস্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ফলে জেলাতে একদিকে যেমন নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি সমৃদ্ধি হয়েছে জেলার অর্থনীতি। যদিও সাতক্ষীরার জেলেদের ধরা সামুদ্রিক মৎস্য সাতক্ষীরার বাজারে আসে না। এগুলোর অধিকাংশ সমুদ্র পথে বরগুনা পটুয়াখালীসহ অন্যান্য জেলায় যায়।

বর্তমানে মৎস্য খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে দেশের প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ জড়িত থাকলেও সাতক্ষীরা জেলায় মৎস্য খাতে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ জড়িত। মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে মানুষের মাছ খাওয়া বেড়েছে ১২২ শতাংশ। বিশ্বের সাতটি দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অর্ধেকের বেশি আসে মাছ থেকে। বাংলাদেশ প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ আসে মাছ থেকে। ২০১০ সালের সর্বশেষ খানা জরিপে উঠে এসেছে-বছরে বাংলাদেশে একেকজন মানুষ প্রায় ১২ কেজি মাছ খায়। এখন সেটা ৩০ কেজিতে পৌঁছেছে। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ যার এক-চতুর্থাংশ অবদান এককভাবে মৎস্য খাতের। আবার সার্বিক কৃষি খাতের গড় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ হলেও মৎস্য খাতে প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশের উপরে রয়েছে। বিশ্বে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে ২০১৯ সালে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা জেলায় বর্তমানে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। যেখানে জেলায় মাছের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে একাংশ বিদেশে রপ্তানি এবং অবশিষ্ট মাছ দেশের অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ করা হয়। সূত্র আরো জানায় বর্তমানে জেলাতে ৫০ হাজার ১৮টি পুকুরে কার্পজাতীয় মাছের চাষ হচ্ছে। এছাড়া জেলায় ১ লক্ষ ৫৩ হাজার ১১০ হেক্টর লবনাক্ত জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে। জেলায় মৎস্য হ্যাচারি রয়েছে ২৫টি, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে ৪টি, মৎস্য আড়ৎ রয়েছে ৩২টি। এছাড়া ২৮৫টি মৎস্য ডিপো, ৪৪টি বরফকল, ১৫টি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং ৫৮টি পাইকারী মৎস্য বিপণন কেন্দ্রের মাধ্যমে সারা বছর মাছ বাজারজাত করা হয়।

বিভিন্ন তথ্য উপাত্তে দেখা যায়, সাতক্ষীরার চিংড়ি বিদেশে রপ্তানির বাজার দখল করেছে। এখানে উৎপাদিত হচ্ছে সব ধরনের সুস্বাদু সাদা মাছ। চিংড়ির পাশাপাশি কৈ, মাগুর, শিং, শোল, পাঙ্গাস, মনোসেক্স তেলাপিয়া, কার্প জাতীয় মাছ ছাড়াও জেলাব্যাপী কাঁকড়া ও কুচিয়ার চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। জেলার ৫৫ হাজার ১২২টি বাগদা চিংড়ি ঘের ও ১১ হাজার ৬৩৮টি গলদা চিংড়ি ঘেরের এক চতুর্থাংশে আধা নিবিড় ও নিবিড় চিংড়ি চাষ করা গেলে জেলার চিংড়ি উৎপাদন ৮ থেকে ১০ গুণ বেড়ে যাবে বলে জানানো হয়। বেসরকারি হিসাবে বাগদা ও গলদা চিংড়ি ঘেরের সংখ্যা আরো বেশি।

#