সাতক্ষীরায় লাইসেন্স বিহীন ২০ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে গত আড়াই মাসেও ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন


863 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় লাইসেন্স বিহীন ২০ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে গত আড়াই মাসেও ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন
সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৫ ফটো গ্যালারি স্বাস্থ্য
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি :
সাতক্ষীরা জেলায় লাইসেন্স বিহীন ২০ ক্লিনিকের মধ্যে অর্ধেকই রয়েছে কলারোয়া উপজেলায়। ক্লিনিকের সাইন বোর্ড লাগিয়ে লাইসেন্স বিহীন এসব ক্লিনিকে সেবা দেয়ার তুলনায় ব্যবসা হচ্ছে বেশি। নাম করা সব ডাক্তারদের নামের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রোগীদের সাথে চলছে সীমাহীন প্রতারণা । বিভিন্ন টেষ্টের নামে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগের পাশাপাশি ভুলেভরা রিপোর্ট নিয়েও রোগীরা বাড়তি বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে জেলার লাইসেন্স বিহীন এমন ২০টি ক্লিনিক সীলগালা করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে আড়াই মাস আগে জেলা প্রসাশনের কাছে তালিকা পাঠালেও আজও পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি জেলা প্রশাসন।

সাতক্ষীরা জেলার ২০ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে একটি মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন আড়াইশো বেডের হাসপাতাল, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও ৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্স রয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী গড়ে তুলছে এসব অবৈধ ক্লিনিক।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানযায়, সাতক্ষীরা জেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা রয়েছে ১৩১টি। যার মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করা নেই ৩৭টি ক্লিনিকের । ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে মধ্যে ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতাল, বুশরা হাসপাতাল এবং সংগ্রাম মেডিকেল হাসপাতাল ৩০ বেড ও নলতা হাসপাতাল ২০ বেড, বাকি সকল ক্লিনিক ১০ বেডের অনুমোদন রয়েছে।

অফিস সূত্রে আরও জানা যায়, সিভিল সার্জন অফিস থেকে লাইসেন্স নেই এমন ২০টি ক্লিনিকের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব ক্লিনিকের মধ্যে ১০টি ক্লিনিক অবস্থিত কলারোয়া উপজেলায়।

চিহ্নিত অবৈধ ক্লিনিক গুলো হলো- কলারোয়া উপজেলার সরসকাটীতে কামাল হোসেন পরিচালিত পল্লী সেবা ক্লিনিক ও নাসিমা ক্লিনিক, হাসপাতাল রোডে নজরুল ইসলাম পরিচালিত মাতৃসেবা ক্লিনিক, একই রোডে আরোগ্য প্যাথলজি সেন্টার, বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ মোড়ে সাইমুন প্যাথলজি সেন্টার, বালিয়াডাংগা বাজারে আলমগীর কবির পরিচালিত ডা: আব্দুল হাকিম সার্জিক্যাল ক্লিনিক, কাজির হাট বাজারে জননী ক্লিনিক, থানা মোড়ে হাফিজা ক্লিনিক, ডাকবাংলা মোড়ে টনি ক্লিনিক ও কলারোয়া খাদ্য গুদাম মোড়ে রয়েল হাসপাতাল।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ঝাউডাঙ্গা বাজারে মো: আবুল হোসেন পরিচালিত ঝাউডাংগা সার্জিক্যাল এন্ড পাইলস ক্লিনিক, পলাশপোলে আব্দুর রাজ্জাক পরিচালিত দেশ সার্জিক্যাল ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, সূচনা ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, নোভা ক্লিনিক ও খুলনা রোড মোড়ে মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত ম্যাসেঞ্জার ডায়াগনষ্টিক সেন্টার।

শ্যামনগর উপজেলার নকিপুরে সামছুর দোহা টুটুল হিউম্যান এইড প্রাইভেট হাসপাতাল, মুক্তিযোদ্ধা সড়কে ডা: অজয় কুমার পরিচালিত অলী ডিজিটাল ডেন্টাল কেয়ার ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কে ডা: আব্দুল ওয়াজেদ পরিচালিত ফাতেমা ডায়াগনষ্টিক সেন্টার।

আশাশুনিতে মো: রফিকুল ইসলাম পরিচালিত আহছানউল্লাহ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এবং তালা উপজেলার পাটকেলঘাটায় ঘোষ মধুসুদন পরিচালিত মর্ডান এক্স-রে এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার।

সাতক্সীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানাযায়, জেলায় চলতি বছর ক্লিনিকের উপর দুটি ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এ আদালতে চারটি ক্লিনিকের চার জনকে আসামী করে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। অপরদিকে, সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে জেলার লাইসেন্স নাই এমন ২০টি ক্লিনিক সীলগালা করার জন্য চলতি বছরের ২১ জুন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসককে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন। কিন্তু চিঠি দেয়ার প্রায় আড়াই মাস অতিবাহিত হলেও এসব ক্লিনিক বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ নেয়া হয়নি কোন কার্যকর ব্যবস্থা।

সরকারি নীতিমালার শর্তানুযায়ী ডাক্তার, নার্স-প্যাথলজিক্যাল লাইসেন্স কিংবা নবায়ন না করেই স্থানীয় প্রশাসন ও সংশি¬ষ্ঠ দপ্তরে কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই এসব ক্লিনিকের চলছে জমজমাট ব্যবসা। কিন্তু বিধি অনুযায়ী প্রতিটি ১০ শয্যা ক্লিনিকের জন্য নির্ধারিত ৩ জন ডাক্তার, ডিপে¬ামাধারী ২ জন নার্স ও ৩ জন সুইপার থাকা বাঞ্চনীয়। একই সাথে ৮শ’ বর্গ ফুট জায়গা, সার্বক্ষণিক একজন ডাক্তার, নার্স ও সুইপার থাকতে হবে।

প্যাথলজি বিভাগ চালু করতে হলে অবশ্যই সংশি¬ষ্ট বিষয়ে ডিপে¬ামাধারী প্যাথলজিস্ট ও ১ জন সুইপারের পদ রয়েছে। আর মাইক্রোস্কোপ, ফ্রিজ, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সাতক্ষীরা এসব প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকগুলোর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অধিকাংশ ক্লিনিকে নির্ধারিত ডাক্তার নেই। তারা চুক্তি অনুযায়ী ডাক্তার ডেকে রোগীর অপারেশন বা অন্যান্য চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষন করতে পারে না তারা। কারণ এ ডাক্তাররা একাধিক ক্লিনিকে চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিদর্শন করেন। রোগীদের সংকটকালীন সময়ে ডাক্তারদের পাওয়া যায় না এমন অভিযোগ রয়েছে এসব ক্লিনিকের বিরুদ্ধে।

অবৈধ এসব ক্লিনিকে নামি দামি ডাক্তারের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখলেও বাস্তবে নেই কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। দালালের সাহায্যে ক্লিনিকে রোগী আসলেই কারনে অকারনে দেওয়া হচ্ছে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা বা টেষ্ট। আর টেষ্টের নামে ভুল ভাল রিপোর্ট দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের অর্থ। রোগীরা শিকার হচ্ছেন বাড়তি ভোগাস্তির।

চিকিৎসার সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবে এসব ক্লিনিকে প্রায়ই ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। জমজমাট ক্লিনিক ব্যবসার কারনে জেলার সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসকরাও দিন দিন এসব ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে সরকারী হাসপাতাল গুলোতে রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। নিরুপায় হয়ে তারা ছুটছেন প্রাইভেট ক্লিনিকের দিকে। তবে সাধারণ মানুষের দাবি চিকিৎসার নামে এই ক্লিনিক ব্যবসা যতদ্রুত সম্ভব বন্ধ করতে হবে। সেবার মনোভাব বাড়াতে হবে। দূর করতে হবে সব ধরণের ভোগান্তি।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা ম্যাসেঞ্জার ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিগত তিন বছর যাবত ক্লিনিক পরিচালিত করে আসছি। কোন সদস্যা হয়নি। ম্যানেজ করে চলেছি। তবে সাম্প্রতি আমি লাইসেন্স করেছি।

কলারোয়ার সরসকাটির পল্লী সেবা ক্লিনিক মালিক কামাল হোসেন লাইসেন্স নেই স্বীকার করে বলেন, লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছি। দ্রুত সময়ে সেটি হাতে পেয়ে যাব বলে আশা করিছি।

তালা উপজেলার পাটকেলঘাটায় মর্ডান এক্স-রে এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার ঘোষ মধুসুদন বলেন, আমি সেই ভাবে তো ক্লিনিক চালাই না, নিজে কোন ভাবে প্রাকটিস করি। তাই লাইসেন্স করি নাই। তবে আমার একটি এক্স-রে মেশিন আছে। আমি কোন সময় লাইসেন্সের কথা ভাবি নি।

সতক্ষীরার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা: রফিকুল ইসলাম ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে বলেন, কোন ক্লিনিক বন্ধ করার ক্ষমতা আমাদের নাই। আমরা অবৈধ ক্লিনিকের তালিকা করে সেটি সীলগালা করার জন্য অনুরোধ করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠিয়েছি। জেলা প্রশাসনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে ব্যবস্থা গ্রহণ করার সময় আমাদের পক্ষ থেকে একজন মেডিকেল অফিসার সাথে থাকবে।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও ভারপ্রাপ্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ এফ এম এহতেশামূল হক বলেন, সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে যে তালিকা পেয়েছি সেটি বাস্তাবায়ন করার জন্য ইতোমধ্যে স্ব স্ব উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বর্তমানে সে সব ক্লিনিকগুলো কি অবস্থায় আছে সেটি খোজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি লাইসেন্স না থাকে অথবা নীতিমালা বিরোধী কোনো কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত থাকে তাহলে যত দ্রুত সম্ভব তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।