সাতক্ষীরায় শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা মামলায় সাবেক এমপি হাবিবসহ ৫০ জনের কারাদন্ড


399 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা মামলায় সাবেক এমপি হাবিবসহ ৫০ জনের কারাদন্ড
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১ জাতীয় ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ ৩ জনের ১০ বছর , বাকী ৪৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান

॥ এম কামরুজ্জামান ॥

সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালিন বিরোধীদলীয় নেতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলার মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। সাতক্ষীরার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: হুমায়ুন কবির জনাকীর্ণ আদালতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০ টা ২১ মিনিটে এই রায় ঘোষণা করেন। পৃথক ৭৪ পৃষ্ঠায় প্রস্তুতকৃত এই রায়ে ৫০ জন আসামীর মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা , সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিব, আরিফুর রহমান ও রিপন হোসেন এই ৩ জন আসামীর ১০ বছর করে এবং বাকী ৪৭ জন আসামীর বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। আলোচিত এই মামলায় সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং সর্বনি¤œ সাজা দেয়া হয়েছে সাড়ে ৪ বছর। মামলায় মোট ৫০ জন আসামীর মধ্যে ৩৪ জন আসামী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আসামীদের উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করা হয়। এই মামলায় বাকী ১৬ জন আসামী পলাতক রয়েছে। ২৪ জন সাক্ষির স্বাক্ষ্যপ্রমানাদির ভিত্তিতে রায় ঘোষণা করা হয়।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাতক্ষীরা আদালত চত্বরে কয়েক প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন ছিল। কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টুনির মধ্যে সকাল ১০ টার দিকে সাতক্ষীরা জেলা কারাগার থেকে ৩৪ জন আসামীকে প্রিজনভ্যানযোগে আদালতে হাজির করা হয়। সোয়া ১০ টার দিকে আদালতের বিচারক বিচার কার্যক্রম শুরু করে। আদালত শুরুর ৬ মিনিট পরেই ( ১০ টা ২১ মিনিটে) সাতক্ষীরা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: হুমায়ুন কবির রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পরপরি আসামীদেরকে সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সকাল থেকে আদালত পাড়ায় আসামীদের স্বজনরা ভীড় জমাতে থাকে। পরে পুলিশ আদালত চত্বর থেকে স্বজনদেরকে সরিয়ে দেয়।

রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলা পরিচালনা করেন, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম মুনীর, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জী,ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শাহীন মৃধা ও সাতক্ষীরার পিপি এ্যাড. আব্দুল লতিফ।
অপরদিকে আসামীপক্ষে ছিলেন এ্যাড. শাহানারা আক্তার বকুল, এ্যাড. আব্দুল মজিদ, এ্যাড. মিজানুর রহমান পিন্টু প্রমুখ।
কারাগারে পাঠানো আসামীরা হলেন, সাবেক সাংসদ হাবিবুল ইসলাম হাবিব, আশরাফ হোসেন, সাবেক পৌর মেয়র আক্তারুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, শেখ তামিম আজাদ মেরিন, আব্দুর রকিব মোল¬্যা, আব্দুল মজিদ, হাসান আলী, ময়না, আব্দুস সাত্তার, তোফাজ্জেল হোসেন সেন্টু, জহুরুল ইসলাম, গোলাম রসুল, অ্যাড. আব্দুস সাত্তার, আব্দুস সামাদ, আলতাফ হোসেন, শাহাবুদ্দিন, সাহেব আলী, সিরাজুল ইসলাম, রকিব, ট্রলি শহীদুল, মনিরুল ইসলাম, শেখ কামরুল ইসলাম, ইয়াছিন আলী, শেলী, শাহিনুর রহমান, দিদার মোড়ল, সোহাগ হোসেন, মাহাফুজুর মোল¬া, আব্দুল গফফার গাজী, রিঙ্কু, অ্যাড. আব্দুস সামাদ, টাইগার খোকন ওরফে বেড়ে খোকন।

পলাতক আসামীরা হলেন, সাবেক যুবদল নেতা আব্দুল কাদের বাচ্চু, মফিজুল ইসলাম, আলাউদ্দিন, খালেদ মঞ্জুর রোমেল, আরিফুর রহমান, রিপন, ইয়াছিন আলী, রবিউল ইসলাম, মাজাহারুল ইসলাম, আব্দুল খালেক, আব্দুর রব, সঞ্জু , নাজমুল হোসেন, জাবিদ রায়হান লাকী, কণক, মাহাফুজুর রহমানসহ ১৬ জন।

রায় ঘোষণার পর এই মামলার প্রধান আসামী সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিবকে যখন কারাগারে নেয়া হচ্ছি তখন আদালত চত্বরে তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েরা অবস্থান করছিলো। কারাগারে নেয়ার সময় তিনি ছেলেও মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ সময় হাবিব চিৎকার করে বলেন এটি অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া একটি রায়। আমি ঘটনাস্থলে হাজির ছিলাম না। আমি যাতে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে না পারি সেজন্যই এ ধরনের রায় দেয়া হলো। কিন্তু লাখ লাখ জনগন আমার সাথে আছে এবং থাকবে।

গত ২৭ জানুয়ারী এই মামলার আসামী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের চুক্তিতর্ক শেষ হলে ওইদিন আদালতে হাজির ৩৪ জন আসামীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালতের বিচারক মো: হুমায়ুন কবীর।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত অ্যার্টনি জেনারেল এস এম মুনির এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আদালত যে রায় দিয়েছে তাতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্টিত হয়েছে। আদালতে ৫০ জন আসামীর সবার বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। ৩৪ জন আসামী আদালতে হাজির ছিলো। বাকী ১৬ জন পলাতক রয়েছে। এই মামলায় ২৪ জন সাক্ষির স্বাক্ষ্যপ্রমানাদির ভিত্তিতে আদালতের বিচারক রায় ঘোষণা করেন।

এদিকে, আসামী পক্ষের আইনজীবী এড. আব্দুল মজিদ বলেন, মামলার এজাহার, পুলিশের অভিযোগপত্র এবং সাক্ষীদের জবানবন্দির মধ্যে তথ্যগত ব্যাপক গরমিল ও অসংলগ্নতা রয়েছে। সাক্ষীরা কোনভাবেই আসামীদের দোষী প্রমান করতে পারেননি। আসামীদের বিরুদ্ধে যে রায় দেয়া হয়েছে তা সঠিক হয়নি। তারা আরও বলেন, ঘটনার দিন সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিব কলারোয়ায় উপস্থিত ছিলেন এমন কোন প্রমানও তারা খাড়া করতে পারেননি। সাক্ষীরা বলেছেন হাবিবুল ইসলামের পরামর্শ ও নির্দেশে তার অনুসারীরা এই হামলা চালায়। অথচ হাবিবকে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করবো। ন্যায়বিচার হলে সকল আসামী খালাস পাবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালিন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাতক্ষীরা সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার হিজলদি গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার ধর্ষিতা স্ত্রীকে দেখতে সদর হাসপাতালে আসেন। তিনি মাগুরায় ফেরার পথে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে কলারোয়া বিএনপি অফিসের সামনে তার গাড়ি বহরে হামলার শিকার হন। হামলায় শেখ হাসিনাসহ তার গাড়ি বহরে থাকা লোকজন, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাংবাদিকসহ কমপক্ষে একডজন লোক আহত হন। এঘটনায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দীন বাদী হয়ে উপজেলা যুবদলের সভাপতি আশরাফ হোসেনসহ ২৭ জনের নাম উলে¬খ পূর্বক অজ্ঞাত ৭০/৭৫ জনের নামে থানায় ব্যর্থ হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বিভিন্ন আদালত ঘুরে পরে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে এক যুগ পর ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর কলারোয়া থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়।

এরপর ২০১৫ সালের ১৭ মে জেলা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাতক্ষীরা ১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ ৫০ জনের নাম উল্লে¬খ করে ৩০ জনকে স্বাক্ষী করে পেনাল কোর্ড, অস্ত্র আইন ও বিষ্ফোরক গ্রব্য আইনে পৃথক তিনটি অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা শেখ সফিকুর ইসলাম। সাতক্ষীরা মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে বিচারাধীন পেনালকোর্ডের মামলাটি ৯ জন স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্য গ্রহণের পর এবং সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ-২য় আদালতে বিচারাধীন অস্ত্র আইনে ও বিষ্ফোরক দ্রব্য আইনে চলমান মামলা দু’টির কার্যক্রম যথাক্রমে ২০১৭ সালের ৯ ও ২৩ আগষ্ট আসামীপক্ষ হাইকোর্টে স্থগিত করেন। উচ্চ আদালত চলতি বছরের ২২ অক্টোবর পেনাল কোর্ডের মামলাটির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নথি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে সাতক্ষীরার মুখ্য বিচারিক হাকিমকে নির্দেশ দেন। গত ১৭ ডিসেম্বর অপর দু’টি মামলার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নিম্ন আদালতে বিচার কার্যক্রম চালু করার নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত।

#