সাতক্ষীরায় ১০ মাসে ৮৬ বাল্যবিবাহ বন্ধ


164 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরায় ১০ মাসে ৮৬ বাল্যবিবাহ বন্ধ
এপ্রিল ১৮, ২০২১ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

দারুণ তার সাজগোজ। ঝলমলে পোশাক পড়ে ঘরের মধ্যে আছে বসে দশম শ্রেণির ছাত্রী শাবরিনা আক্তার (ছদ্মনাম)। বয়স তার ১৬। সে সদর উপজেলার যোগরাজপুর গ্রামের বাসিন্দা। ৯ এপ্রিল হঠাৎ করে একই উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের সাইফুর রহমানের বিদেশ ফেরত ছেলে যৌতুক মামলার জেলখাটা আসামী শাহ আলমের সাথে বিয়ে ঠিক হয়। ওই মামলা বিচারাধীন। অথচ সব জেনে শুনে তার পরের দিন বিকালে মেয়ের বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় চলছিলো। গোপন সংবাদের ভিক্তিতে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সাথে পরামর্শক্রমে জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির প্রশাসনিক প্রধান সাকিবুর রহমান জানতে পেরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দেয়। শুধু শাবরিনা আক্তার না, গত ১০ মাসে তার মতো ৮৬ কিশোরী বাল্যবিবাহ থেকে মুক্তি পেলেও স্বীকার হয়েছে প্রায় ৫ হাজারের অধিক।
জেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলার ৭ উপজেলায় ২০২০ সালের জুলাই মাসে ১২টি, আগস্ট মাসে ৭ টি, সেপ্টেম্বর মাসে ১৪ টি, অক্টোবর মাসে ৭ টি, নভেম্বর মাসে ৮ টি, ডিসেম্বর মাসে ৫টি ও ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে ৯টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ১১টি, মার্চ মাসে ৮টি, চলতি মাসে ৫টিসহ মোট ৮৬ কিশোরীকে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করেছে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ও জেলা বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ কমিটি। এসব কিশোরীর বেশির ভাগ ৭ম থেকে ১০ম শ্রেণির বলে জানিয়েছেন মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক একেএম শফিউল আযম জানান, সারা বিশ্বে যখন বাল্যবিবাহ কমছে তখন এ জেলায় দিন দিন বাল্যবিবাহ বাড়ছে। যার প্রধান কারণ হচ্ছে পারিবারিক অসচেতনতা। বাল্যবিবাহ বন্ধে তৎপর আমরা। এই লক্ষ্যে সরকার বাল্যবিবাহ জিরো-টলারেন্স নীতি নিয়েছে। জেলায় কোথাও বাল্যবিবাহ হলে ৯৯৯ বা ১০৯ নম্বরে ফোন দিলে বাল্যবিবাহ বন্ধে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদপে নেয়। তাছাড়া মহিলা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় স্কুল-মাদ্রসা ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতামূলক কাজ করছে। বাল্যবিবাহ দূরীকরণে নানা উদ্যোগ এবং সমস্যা নিয়ে তিনি আরও জানান, আমরা বাল্য বিবাহ দূর করতে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইমাম, কাজী, পুরোহিতদের প্রশিক্ষণ, জনপ্রতিনিধি ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৈঠক, সাধারণ মানুষকে নিয়ে বৈঠক, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধী কনসার্টসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে প্রশাসন। আর শেষ পর্যায়ে বাল্য বিবাহ দিলে আইনের মাধ্যমে শাস্তি পেতে হবে বলে সতর্ক করেছি। যুব সংগঠনের শিার্থীদের কাছে আমার ব্যক্তিগত ফোন নাম্বারও দিয়ে রেখেছি। তারা যেকোনো সময় আমাকে ফোন দিতে পারবে। আর আমি ফোন পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেই।
এ ব্যাপারে জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম অফিসার ফাতেমা জোহরা জানান, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর থমকে গেছে জনজীবন। হুমকিতে অর্থনীতি। কর্ম হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার পরিবার। ফলে দারিদ্রতা তাদের নিত্য সঙ্গী। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে শত শত কিশোরীকে বাল্য বিবাহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে অভিভাবকরা। করোনার এই সময়কালে সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলায় বেশি বাল্য বিবাহ হয়েছে। এরপরের অবস্থানে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা। আমরা খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে যেয়ে বিয়ে বন্ধ করে আসছি। কিন্তু পরবর্তী ফলোআপে দেখছি তাদের অধিকাংশই শ্বশুর বাড়ি। এমন অবস্থা থেকে কিশোরী মেয়েদের রক্ষা করার একমাত্র পথ পারিবারিক সচেতনতা। আর সেটি করতে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর নেমে আসবে নির্যাতনের কালো অন্ধকার। সেজন্য সমাজের সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে একযোগে বাল্য বিবাহ বন্ধে কাজ করতে হবে। তাহলে জেলাকে বাল্যবিবাহ মুক্ত করতে পারবো আমরা।
বিষয়টি সম্পর্কে তালা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাজমুন নাহার জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়ানের আটুলিয়া ৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা শারমিন নামের এক কিশোরীর সাথে আশাশুনি উপজেলার কুল্যা ইউনিয়নের মোমিন জোয়াদ্দার (২৭) এর সাথে গোপনে বিয়ে হয়। অতঃপর কনের বাড়িতে অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে অত্র ওয়ার্ডের মেম্বার মনির আমাকে জানালে সাথে সাথে ঘটনাস্থলে যেয়ে বিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। তবে তাদের যে রেজিস্ট্রার বিয়ে পড়িয়েছে তিনি ভূয়া কাগজপত্রে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করেছে। আমরা ওই সময়ে মেয়েটিকে তার চাচার হেফাজতে দিয়েছি এবং ১৮ বছরের আগে শ্বশুর বাড়ি না দেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম। তিনি আরও জানান, শারমিনের বিবাহ হয়েছে ভূয়া এবং অবৈধ্য ভাবে, ভবিষ্যতে যদি এই মেয়টির উপর শরিরিক, মানুষিক বা আর্থিক কোন প্রকার নির্যাতন করে তাহলে আইন তার কোন সহযোগিতা করতে পারবেনা কারণ তার অবধৈ বিবাহ হয়েছে এইরকম আরও অনেক হয়েছে এবং হচ্ছে এই মেয়ের ভবিষ্যৎ কী। তিনি জানান, মেয়েটির শিশু বয়সের টিকার কার্ড ও প্রাইমারি স্কুলের সার্টিফিকেট অনুযায়ী বয়স ১৪ বছর এবং ভূয়া জন্মনিবন্ধন কার্ড অনুযায়ী ১৮ বছর। পরে শুনেছি ওয়ার্ড মেম্বারের মনির সহযোগিতায় শারমিনকে শশুর বাড়ি পাঠানো হয়। আমরা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছি।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের উদ্যোগ কম। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুসারে, বিয়ের জন্য মেয়ের বয়স কমপক্ষে ১৮ এবং ছেলের বয়স ২১ বছর হতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি কাজ করে বলে জানান সাতক্ষীরা জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির প্রধান হলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকারকর্মী সাকিবুর রহমান। তাঁর দাবি, কোভিডের সময়কালে জেলায় ৯০ শতাংশ বাল্যবিবাহ হলেও স্থানীয় প্রশাসনের দু-একজন ছাড়া বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রশাসন তৎপর নয়। সাকিবুর রহমান বলেন, বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসার শিকদের কাছে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে করোনাকালে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বাল্যবিবাহ হয়েছে। গত ১০ মাসে কমপক্ষে ৫ হাজার বাল্যবিবাহ হয়েছে। স্থানীয় প্রতিনিধিরা কমিটিতে থাকলেও ভোট কাটা পড়বে বলে বিয়ে ঠেকাতে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। কারণ অভিভাবকেরা ‘শুভ কাজে বাগড়া’ ধরে নিয়ে মনে অসন্তোষ পুষে রাখেন। তিনি বলেন, ‘গত চার বছরে এক হাজার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছি। একটিতেও স্থানীয় প্রতিনিধিরা যাননি। করোনাকালে অনেক বাল্যবিবাহের খবর প্রশাসনকে দিয়েছি। কিন্তু বিয়ে থামাতে কেউ যাননি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সচেতন ব্যক্তি জানান, বাল্যবিবাহ হয় বেশির ভাগ মফস্বলে বা গ্রামে। গোপনে বিয়ে দেয়া, আবার ভুয়া জন্ম-নিবন্ধন সার্টিফিকেট তৈরি করে বিয়ে দেয়া হয়। অনেক সময় দুজন প্রেম করে নিজেরা বিয়ে করে বন্ধুবান্ধব নিয়ে। এগুলো বন্ধ করা অনেকেেত্র কষ্টকর। তারা আরও জানান, অনেক সময় দেখা যায় বিয়ের আয়োজন করার পর প্রশাসন বিয়ে বন্ধ করে দিতে পারে বা দেয়, কিন্তু সেটা ওই মেয়ের জন্য একটা তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে এটা শুনলে পরে বিয়ে দিতে সমস্যা হবে, মেয়ের মানসিক চাপ বাড়ে, আবার লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিয়ের আয়োজন করার পর বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে পরিবার আর্থিকভাবে তিগ্রস্ত হয়। সেটার নেগেটিভ প্রভাব পড়ে পরিবার এবং সমাজের উপর। তাই প্রশাসন বাল্যবিয়ে বন্ধ করার চেয়ে বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করছে।