সাতক্ষীরা উপকূলীয় ৫০ গ্রাম পানিতে ভাসছে, দুর্বিসহ জীবন


561 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরা উপকূলীয় ৫০ গ্রাম পানিতে ভাসছে, দুর্বিসহ জীবন
আগস্ট ২১, ২০২০ আশাশুনি দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

ইব্রাহিম খলিল :
সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকায় ভেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ছে। অর্ধশতাধি গ্রামের উপর দিয়ে প্রবল বেগে নদীর জোয়ারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ সব এলাকায় শত শত চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। কয়েক হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়েছে। সুপার সাইক্লোন আম্পানে যেসব ভেড়িবাঁধ ধ্বসে পড়েছিল সেইসব ভেড়িবাঁধের কয়েকটি স্থান গত তিন মাসেও বাঁধা সম্ভব হয়নি। আম্পানে ধ্বসেপড়া ওইসব ভেড়িবাঁধ দিয়ে গত তিনদিন ধরে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। নদীতে জোয়ারের পানি তিন থেকে চার ফুট বৃদ্ধি পাওয়ায় কারণে অনেক স্থানে বাঁধ উপচে গ্রামের দিকে পানি প্রবল বেগে ছুঁটে আসছে।

স্থানীয়রা জানায়, থেমে থেমে দমকা হাওয়া ও জোয়ারের পানির চাপে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ৫০ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামজুড়ে থাকা চার শতাধিক চিংড়ি ঘের পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে। শত শত বসত বাড়িও প্লাবনের মুখে পড়েছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবন উপকূলবর্তী গাবুরা ইউ পি চেয়ারম্যান জি এম মাসুদুল আলম জানান, তার ইউনিয়নের নেবুবুনিয়ায় গত ২০ মে আম্পানে ক্ষতিগ্রস্থ বেড়ি বাঁধ সংস্কার করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার দিন ভর দমকা হাওয়া বৃষ্টি ও জোয়ারের চাপে তা ভেঙ্গে খোলপেটুয়া নদীর পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে গাবুরা গ্রাম, নেবুবনিয়া গ্রামসহ কয়েকটি ৫টি গ্রাম। তিনি জানান বেড়িবাঁধের ছয়টি পয়েন্ট ধ্বসে গেছে। এতে সংলগ্ন এলাকার চিংড়ি ঘের ও বসত বাড়ি ছাড়াও ফসলী ক্ষেত পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

আপরদিকে আশাশুনি উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান অসীম বরন চক্রবর্তী জানান, শ্রীউলা ইউনিয়নের দয়ারঘাট এলাকায় বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে ৩ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে খোলপেটুয়া নদীর পানিতে। তিনি জানান বাঁধ সংস্কারের আয়োজন চললেও বৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে তা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

আশাশুনি শ্রীউলা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান আবু হেনা সাকিল জানান, নদীর পানির তোড়ে নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আম্পানের ৩ মাস পরে পুুরনো প্লাবিত এলাকাকে ছাড়িয়ে নতুন এলাকায় পানি ঢুকে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। এ ইউনিয়নের ২২ গ্রাম, খেলার মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, বসতবাড়িসহ ফসলের জমি, হাট-বাজার সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সবই এখন পানির নীচে। আম্পানে তান্ডবে প্রবল ¯্রােত আর ঢেউয়ের কারণে নদীর পাড় এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে গেছে। গত কয়েক দিনে নদীর পানি ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়া এবং মুষুল ধারা বৃষ্টিপাতের ফলে এলাকার সব রাস্তা গুলো ভেঙ্গে জোয়ারের পানিতে শ্রীউলার ২২টি গ্রামের মানুষ হাফুডুপু খাচ্ছে। মেইন সড়কের শ্রীউলা অংশের উপর দিয়ে পানি অপর পাশে প্রবেশ করায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে নতুন করে গ্রামে পানি প্রবেশ করছে। যার ফলে পানিতে দিন কাটছে হাজার হাজার মানুষের। শ্রীউলা ইউনিয়নের হাজরাখালিতে গত ২০ মে’র পর থেকে বাঁধ রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করা যায়নি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সেনা বাহিনী বাঁধ নির্মানের চেষ্টা করে অনেকটায় ব্যর্থ হয়ে এলাকা ত্যাগ করেছেন। তারা শীত মৌসুমে বাঁধ নির্মানের জন্য আবার ফিরবেন বলে জানিয়েছেন। গত ২ দিনের নদীর পানির চাপ এতটা বেড়েছে যে, আগের তুলনায় বেশী গতিতে পানি গ্রামের ভিতরে ঢুকছে। ফলে ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে। দুইদিন ধরে নেই বিদুৎ সংযোগ। যার ফলে অনেক পরিবারের না খেয়ে জীবন যাপন করছে।

লাঙ্গলদাড়িয়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার ঘরের ভিতরে পানি। রান্নার কোন জায়গা নেই। এতোদিন রাইসকুকারে কোন ভাবে রান্না করে খাচ্ছিলাম। বিদুৎ না থাকায় আমরা দুইদিন ধরে শুকনা খাবার খাচ্ছি।

সাতক্ষীরা পল্লী বিদুৎ এর আশাশুনি জোনাল অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নৃপেন্দ্র কুমার বলেন, কিছু ঘর ভেঙ্গে যাওয়ায় আশাশুনি উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও এর অনুমতিক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। কতদিনের মধ্যে সংযোগ চালু হবে এবিষয়ে তিনি বলতে পারেননি।

প্রতাপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন জানান, সেখানে ১৭টি গ্রামের মানুষ আম্পানের পর থেকে এখনও বাড়িতে ফিরে যেতে পারেনি। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব গ্রামে পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীতে গত তিন দিন অস্বাভাবিক জোয়ার, সেই সাথে দমকা হাওয়া বইছে। মানুষ মরাগেরে দুর্গত এলাকায় কবর দেয়ারও জায়গা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ ও ২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের ও সুধাংশু সরকার জানান, এখন তীব্র জোয়ার। নদীতে প্রায় তিন ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া আবহাওয়া অনুকূলে নয়। একটু শান্ত অবস্থায় না ফেরা পর্যন্ত সংস্কার কাজ করা যাচ্ছে না।

#