সাতক্ষীরা উপকূলের শতাধিক পরিবার সাগরে ভাসার আতংকে !


201 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরা উপকূলের শতাধিক পরিবার সাগরে ভাসার আতংকে !
মে ৩১, ২০২০ দুুর্যোগ ফটো গ্যালারি শ্যামনগর
Print Friendly, PDF & Email

‌’আমরা তো পানিতি ভাসতিছি’

সামিউল মনির ::

আম্ফান আমাগো পথে বসাই দেগেছ। আয় রোজগার না থাকলিও সরকারি চাল-ডালি দিনি একবার হলিও আধ পেটা খেয়ে টিকে থাকতেলাম। তবে বাপ-দাদার কবরের সাথে সাথে আমাগা বসতভিটে আলাদা করে দেবায় এখন সাগরের সাথে মিশে আছি- জানালেন নেবুবুনিয়া গ্রামের আবিয়ার রহমান।
সত্তোরোর্ধ্ব বয়সী ফকির গাজী বলেন, আগে নদীতে তুফান উঠলি বাঁধে আশ্রয় নেতাম। তবে আম্ফান এ বাঁধ ভাঙায় গ্রামের ভেতর দে এখন রিং বাঁধ দেছে। ভেঙে যাওয়ায় বাঁধে থাকতি হচ্ছে তাই তুফান আসলি আমরা কেউ আর বাঁচতি পারবো না।

কবর দেয়ার জন্যিও রাশ (লাশ) খুঁজতি হবে না উল্লেখ করে ষাটোর্ধ্ব সহিদা বিবি বলেন, আমরা তো পানিতি ভাসতিছি। ভিতরে জাগা-জমি না থাকায় ভাঙা বাঁধের উপর বাঁশ খুঁটি দে দু’চালা ঘর বানিয়ে দিনডা পার করতিছ।
বিলাপী এমন আক্ষেপভরা কথা আম্ফান বিধ্বস্থ দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার নেবুবুনিয়া গ্রামের ভেঙে যাওয়া উপকুল রক্ষা বাঁধের উপর বসবাসরত পরিবারের সদস্যদের। স্থানান্তরের মত জায়গা না থাকায় ২০ মে বুধবারের আম্ফান আঘাতের পর থেকে ৩১ মে রোববার পর্যন্ত অসহায় এসব পরিবার ভাঙন কবলিত ঐ উপকূল রক্ষা বাঁধের উপরই অবস্থান করছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে ভেঙেচুরে একাকার হয়ে যাওয়া উপকূল রক্ষা বাঁধের অধিকাংশ জায়গা পানিতে নিমজ্জিত। যেখানে যেটুকু জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে সেখানে দুর্বল বাঁশ কোড়া আর হাতের নাগালে পাওয়া খুটি দিয়ে কোন মতে দু’চালা ঘর তৈরী করে সেখানে দিন কাটাচ্ছে অসহায় পরিবারগুলো। ছাউনি দেবার মত কিছু না থাকায় তীব্র রৌদ আর বৃষ্টি থেকে রেহাই পেতে সকলে প্রায় পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে নিয়েছে তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে বংশ পরম্পরায় তারা নেবুবুনিয়া এলাকার ভাঙন কবলিত বাঁধের পাশে বসবাস করে আসছে। িিতপুর্বে একাধিবারের ভাঙনে সহায় সম্পতির সিংহভাগ নদীতে বিলনি হওয়ার পর তারা বাঁধের কোল ঘেঁষে ভিতরের অংশে বসবাস করছিল। কিন্তু আম্ফান এর তান্ডবে তীব্র জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ছাপিয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশের এক পর্যায়ে নেবুবুনিয়া এলাকার বাঁধ ভেঙে বির্স্তীর্ন এলাকা প্লাবিত হয়। পরবর্তীতে টানা জোয়ার ভাটার কারনে সংলগ্ন অংশে গভীর খাদের তৈরী হওয়াতে স্থানীয়রা গাবুরাকে রক্ষার জন্য লোকালয়ের ভিতর দিয়ে রিং বাঁধ নির্মান করে। ফলে বাঙন মুখে বসবাসরত শতাধিক পরিবার এখন চরম উদ্বে, উৎকন্ঠা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সরেজিমে ঘুরে এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে নেবুবুনিয়ায় ভাঙনের কারনে স্থানীয়রা রীতিমত খালের দু’পাশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সেখানে শতাধিক পরিবারের কাওয়ার পানির জন্য রীতিমত সংগ্রামক করতে হচ্ছে। ভাঙনমুখে বসবাসরতদের জন্য একটি মাত্র টিউবওয়েল থাকলেও খালের দুই প্রান্তের মানুষের জন্য খাবার পানি সংগ্রহ রীতিমত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এছাড়া স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদসহ প্রশাসন নেবুবুনিয়াকে আপাতত পরিত্যক্ত হিসেবে চিহ্নিত করার কারনে সরকারি বেসরকারি ত্রাণ সামগ্রীও সেখানে পৌছানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় আমিরন বিবি ও সালেহা খাতুনসহ কয়েক নারী জানায় দুই চালা ঘর বানিয়ে রৌদ বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া গেলেও প্রকতির ডাকে সাড়া দিতে যেয়ে সব বয়সী নারী পুরুষকে মারাত্বক ভোগান্তী পোহাতে হচ্ছে। বাঁধের যে জায়গা উঁচু সেখানে অবস্থানের কারনে তারা মুলত পানিবন্দী অবস্থায় দিনাতিপাত করলেও কেউ তাদের খোঁ নিচ্ছে না বলেও এসব অসহায় নারীদের অভিযোগ। খাবার পানির তীব্র কষ্ট চলছে জানিয়েছে আজগর আলী ও আব্দুস সোবহান জানায় গোসল কিংবা রান্নার পানি পর্যন্ত তারা পাচ্ছে না। তাই নদীর লবন পানিতে গোসলের কাজ মিটালেও আপাতত বৃষ্টির পানি দিয়ে কোন রকমে রান্নার কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন ডায়ারিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দিয়ে সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুস সাত্তার জানায় এভাবে আর কয়েকটি দিন চলতে থাকলে ভাঙনমুখে বসবাসরত পরিবারগুলো নানা ধরনের রোগে পড়বে। অতি সত্ত্বর তিনি ভাঙন কবলিত অংশ থেকে তাদেরকে উদ্ধারসহ পানি, খাবার ও স্যানিটাইজেশন সমস্যা দুর করার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন রাখেন।
এবিষয়ে গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ¦ মাসুদুল আলম জানায়, নেবুবুনিয়ার ভেঙে যাওয়া বাঁধের পাশে বসবাসরতরা চরম অমানবিক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। সেখানে ত্রাণ পৌছানো গেলেও সমুদ্রের সমতলে বসবাসের কারনে তারা জীবন নিয়ে সংকটে রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঐসব দুর্গতদের উদ্ধার করে জরুরী ভিত্তিতে পুনর্বাসন দরকার।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেকশন অফিসার সাজ্জাদুল ইসলাম জানান ভেঙে যাওয়া বাঁধের ৩০ মিটার ভিতরে আমরা রিং বাঁধ নির্মান করছি। ভাঙনমুখে বাসবাসরত পরিবারগুলোকে দ্রুত সরিয়ে না নিয়ে যেকোন সময়ে নদীতে আবারও জোয়অরের পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

#