সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির নতুন কমিটি : সভাপতি ঢাকা প্রবাসী, সম্পাদক হত্যা মামলার আসামী !


1983 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির নতুন কমিটি : সভাপতি ঢাকা প্রবাসী, সম্পাদক হত্যা মামলার আসামী !
মার্চ ১২, ২০১৭ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মনজুর কাদীর ::
ক্ষত-বিক্ষত সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির নতুন কমিটিকে জ্বালার ওপর বিষফোঁড়া বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী। সদ্য ঘোষিত জেলা বিএনপির নতুন কমিটি নেতাকর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার না করে উল্টো তৈরী হয়েছে ক্ষোভ, বিক্ষোভ। নতুন কমিটির সভাপতি রহমাতুল্লাহ পলাশ ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা আর সাধারণ সম্পাদক তারিকুল হাসান নিজ দলের নেতা হত্যা মামলার আসামিসহ অসংখ্য মামলার আসামী  হওয়ায় জ্বালাটা আরও বেশী বলে অনেকে এই কমিটি বাতিলের দাবী জানিয়েছেন। নতুন ঘোষিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া ওই কমিটির অধিকাংশ সদস্য নতুন কমিটির ব্যাপারে খুশি নন। কমিটিতে যারা স্থান পেয়েছে তাদের মধ্যে দুই-একজন নেতাকর্মী বিষয়টি মেনে নিলেও সরব অভিনন্দন জানাতে দেখা যাচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, সাড়ে তিন বছর পর গত বুধবার জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি রহমাতুল্লাহ পলাশকে পুন:রায় সভাপতি ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক তারিকুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাতক্ষীরা জেলার আংশিক কমিটি ঘোষনা করেন।

গত বুধবার দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনুমোদিত ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। কমিটিতে সহ-সভাপতি করা হয় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম ফারুক, বিএনপি নেতা আব্দুর রউফ, হোসনেআরা মমতাজ, হাবিবুর রহমান হাবিব, যুগ্ন সাধারন সম্পাদক করা হয়েছে বর্তমান সাতক্ষীরা পৌর মেয়র তাজকিন আহমেদ চিশতি, আবুল হাসান হাদী, মাসুম বিল্লাহ শাহীন ও আবু জাহিদ ডাবলু, সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন, মো. শের আলী। এছাড়া আরও কয়েকজনকে সদস্য করে ২৮ সদস্য বিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষনা করা হয়। একইসাথে আগামী একমাসের মধ্যে পূর্নাঙ্গ কমিটি করারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ঘোষিত কমিটির সভাপতি রহমাতুল্লাহ পলাশ। তিনি সদ্য সাবেক কমিটিরও সভাপতি। সাতক্ষীরাতে বাড়ি থাকলেও বাস করেন ঢাকাতে। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে তারিকুল হাসানকে। খুলনা থেকে সাতক্ষীরায় এসে তিনি পেয়ে যান স্বেচ্ছাসেবক দলের জেলা আহবায়কের পদ। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি সাবেক ছাত্রনেতা আমানউল্লাহ আমান হত্যা মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলা। বেশ কয়েকবার তাকে কারাগারেও থাকতে হয়েছে। এমন দুই ব্যক্তিকে সভাপতি ও সম্পাদক করায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও ক্রোধ দেখা যাচ্ছে।
জেলা বিএনপির একাধিক সুত্র থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২৬ নভেম্বর জেলা বিএনপি ভোটের মাধ্যমে হাবিবুল ইসলাম হাবিব সভাপতি ও সৈয়দ ইফতেখার আলী সাধারণ সম্পাদক ও তাসকীন আহমে§দ চিশতি সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

তিন মাসের মধ্যে পুর্নাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা থাকলে প্রায় এক বছর পরে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটিতে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের মুল্যায়ন করা হয়নি। আবার অনেক ভুইফোঁড়কে রাতারাতি নেতা বানানো হয়। এসব নিয়ে সভাপতি হাবিবুল ইসলাম হাবিবের সাথে বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নেয় সম্পাদক সৈয়দ ইফতেখার আলীর।
এরইমধ্যে ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির বর্ধিত সভা চলাকালে শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গনে কেন্দ্রীয় নেতা নাজিমউদ্দীন আলমের উপস্থিতিতে নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের আক্রমনে নিহত হন জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আমানউল্লাহ আমান। তখন বিরোধ আরও প্রকাশ্য রুপ নেয়।

এ ঘটনায় নিহতের মা ফাতেমা বেগমকে বাদী করে জেলার নেতাকর্মীদের নামে মামলা দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্দেশনা উপেক্ষা করে জেলা বিএনপির তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক এড. ইফতেখার আলী শহরের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ৫৪ জন শীর্ষ নেতাকে আসামী করে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করান । এ মামলায় জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিব, জেলা যুবদলের জেলা যুবদলের সভাপতি আবুল হাসান হাদী, সাধারন সম্পাদক আইনুল হক নান্টা, জেলা স্বেচ্ছসেবক দলের আহবায়ক তারিকুল হাসান, সাতক্ষীরা শহর বিএনপির সাধারন সম্পাদক সাতক্ষীরা পৌর কাউন্সিলর মাসুম বিল্লাহ শাহীন, শহর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ্ কামরুজ্জামান কামু, জিয়া পরিষদের সম্পাদক অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ পাড়, জেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক এড. কামরুজ্জামান ভুট্টো শীর্ষ নেতাদের নাম আসামীর শ্রেণিভুক্ত করা হয়। মামলায় অজ্ঞাত আরও ৪০/৫০ জনকে আসামী করা হয়। এ মামলার পর কার্যত: জেলা ও উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা পালাতক জীবনে যান। যে কারনে দলের কর্মসুচি পালনের কোনো লোককে মাঠে পাওয়া যায়না। বিষয়টি আওয়ামী লীগ ও পুলিশের জন্য বড় মওকা হিসেবে দেখা দেয়। এ মামলায় বিএনপির ৯০ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এর ফলে চরম সংকটের মূখে পড়ে জেলা বিএনপি।

এ ঘটনার পর জেলা বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব ও সৈয়দ ইফতেখার আলীর নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙ্গে দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। সে বছরের ২৭ নভেম্বর রহমাতুল্লাহ পলাশকে সভাপতি ও লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আলিমকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্যের একটি কমিটি ঘোষনা করা হয়। এই কমিটিও না পেরেছে কোনো সম্মেলন করতে না পেরেছে কোনো কার্যকরি আন্দোলন করতে। এমনকি দলীয় কর্মসূচিও পালনে ব্যর্থ হয় এ কমিটি। এসব কারনে এবং জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা বিএনপির একটি শক্তিশালী এবং সার্বজনীন কমিটির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধী করেন তৃণমুল থেকে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এমন বাস্তবতায় ২৮ সদস্যের এই নতুন কমিটি ঘোষনা করা হলো।
সাতক্ষীরা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালিন সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম ফারুক বলেন,  ‘বর্তমান ঘোষিত কমিটি অপ্রত্যাশিত ও হতাশাব্যঞ্জক। যে ব্যক্তি সভাপতি ছিল তাকে আবার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি তো আগেই ব্যর্থ। তাকে দিয়ে নতুন আশা করা বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়।

জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি নেত্রীর প্রতি আমি আস্থাশীল- তবে তিনি কোন বিবেচনায় এমন কমিটি দিলেন তা তিনিই ভাল জানেন। আর বাইরে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি তিনি।
শহর বিএনপি সভাপতি ও সদ্য ঘোষিত কমিটির সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, তৃণমুল নেতাকর্মীদের মতামতে কমিটি দেয়া হয়না। সাধারণ সম্পাদক পদে অন্য কাউকে মনোনীত করলে দলের জন্য ভাল হতো। তারপরও এই নেতৃত্ব দিয়ে সামনে সব ধরনের ভুমিকা রাখা সম্ভব বলে মত তার।

জাসাসের জেলা আহবায়ক অ্যাড: এখলেছার আলী বাচ্চু ভয়েস অব সাতক্ষীরাকে বলেন, নতুন কমিটির সভাপতি ঢাকাতে থাকেন। সাতক্ষীরার মানুষের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। এর আগেও তিনি সভাপতি থেকে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তার সকালের ঘুমভাঙ্গে বেলা ৩ টায়। তার পিতা (সভাপতির ) সাবেক মন্ত্রী মরহুম এম মনসুর আলী ছিলেন সুবিধাববোগি একজন নেতা। যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে তখন তিনি সেই দলেই ভীড়েছেন। আর সাধারণ সম্পাদক তারিকুল হাসান হত্যা মামলার আসামী-খুনি। তিনি একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাদকাসক্ত,মাতাল। এদের দিয়ে জেলা বিএনপির মতো একটি বৃহৎ দলের কমিটি গঠন রিতিমত হাস্যকর। তিনি আরও বলেন, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাবিবুল ইসলাম হাবিব হাস্যকর এই কমিটি গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি তার সুবিধার জন্য ম্যাডামের হাত-পা ধরে নতুন এই কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটি কেউ মেনে নেবে না। স্থানীয় ভাবে যারা সাতক্ষীরাতে থাকেন তাদের দিয়েই জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করতে হবে।

এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সদ্যঘোষিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক তারিকুল হাসান বলেন, বিএনপি এখন কঠিন সময় অতিক্রম করছে। বিগত সময়ে সারাদেশে যারা মাঠে ছিল তাদেরকে মুল্যায়ণ করা হয়েছে। সামনের দিনে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বর্তমান নেতৃত্ব ভুমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন তিনি। গ্রুপিং উপেক্ষা করে কিভাবে দলকে সংগঠিত করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবাই আমাকে পছন্দ নাও করতে পারেন, তবে যারা বিএনপির আদর্শ লালন করেন তারা আমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন তিনি।

গ্রুপিং আর ক্ষোভ বিক্ষোভের দোলাচালে হঠাৎ দেয়া এই কমিটি আগামী জাতীয় নির্বাচনসহ জেলা বিএনপিকে সংগঠিত করতে কেমন ভুমিকা রাখতে পারবেন তা এখন দেখার বিষয়। তার জন্য করতে হবে অপেক্ষা।