সাতক্ষীরা দিবা-নৈশ কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ বোর্ডের নামে কলেজ ফান্ড থেকে ২ লাখ টাকা উত্তোলণ। সদর এমপি’র ভাই বললেন ‘তুমি কি লিখাছ’


735 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরা দিবা-নৈশ কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ বোর্ডের নামে কলেজ ফান্ড থেকে  ২ লাখ টাকা উত্তোলণ। সদর এমপি’র ভাই বললেন ‘তুমি কি লিখাছ’
আগস্ট ১৩, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিনিধি :
সাতক্ষীরা দিবা-নৈশ কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগের নামে মোটা অংকের অর্থ বানিজ্যের অভিযোগের পর এবার নিয়োগ বোর্ড পরিচালনার নামে কলেজ ফান্ড থেকে অবৈধভাবে ২ লাখ টাকা উত্তলনের অভিযোগ উঠেছে। ওই কলেজের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাঙ্গিলাল সরকার দায়িত্ব থাকাকালীন সময়ে এই টাকা উত্তলণ করা হয়েছে বলে জানাগেছে। বিষয়টি কলেজের শিক্ষক মহলে জানাজানির পর শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাঙ্গিলাল সরকার টাকা উত্তোলণ বিষয়ে ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে বলেছেন, যে চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলণ করা  হয়েছে তাতে তার কোন স্বাক্ষর নেই। নিয়ম অনুযায়ি কলেজের সভাপতি, সদর আসনের এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি ওই চেকে স্বাক্ষর করেছেন। এ ব্যাপারে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি এমপি’র সাথে কথা বলার জন্য বুধবার সকালে তার সেল ফোনে রিং করলে অপরপ্রাপ্ত থেকে তার ছোট ভাই পরিচয়দানকারী মীর মাহী আলম এই প্রতিবেদকের (ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমের সম্পাদক এম. কামরুজ্জামান ) পরিচয় জানার পর একটু হুমকীর সুরে বললেন, ‘তুমি কি লিখাছ’। কোথায় এবং কোন বিষয়ে জানতে চাইলে, মাহী আলম বলেন ‘ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমে সাতক্ষীরা দিবা-নৈশ কলেজ অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে ? ———তুমি কি ঠিক লিখাছ ? ’। এর পর এই প্রতিবেদক এমপি সাহেবের সাথে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করে তার কাছে সেল ফোনটি দেয়ার জন্য অনুরোধ করলে তিনি (মাহী আলম )  আবারও হুমকীরসুরে বলেন, ‘ভাই গাড়ি ড্রাইভ করছেন। উনি এখন কথা বলতে পারবেন না, এ ব্যাপারে তোমার সাথে পরে কথা হবে’। নির্বাচিত একজন এমপির সেল ফোনে একজন সাংবাদিকের সাথে এ ধরণের আচরনের বিষয়টি সাতক্ষীরার সিনিয়র সাংবাদিকরা জানার পর তারা রিতিমত হতবাক হয়েছেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, কলেজ পরিচালনা কমিটি কর্তৃক  গঠিত ৩ সদস্যের আভ্যন্তরিন অর্থ কমিটি গত বুধবার (১২ আগষ্ট) এবিষয়ে সভা করে কলেজ ফান্ড থেকে নিয়োগ বোর্ড পরিচালনার নামে উত্তোলণকৃত সমুদয় টাকা কলেজ ফান্ডে ফেরত দেয়ার জন্য কলেজ প্রশাসনকে লিখিত ভাবে জানিয়েছেন। কলেজের আভ্যন্তরিণ অর্থ কমিটির আহবায়ক ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো: মাহববুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড পরিচালনার নামে কলেজ ফান্ড থেকে এভাবে টাকা উত্তোলণের কোন সরকারি বিধান বা নিয়ম নেই। এ কারণে আমরা তিন সদস্যের অর্থ কমিটি বুধবার মিটিং করে উত্তোলণকৃত সমুদয় টাকা কলেজ ফান্ডে ফেরত দেয়ার জন্য কলেজ প্রশাসনকে লিখিত ভাবে বলেছি। এদিকে, গত ৯ আগষ্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে কলেজে নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেছেন বহুল আলোচিত শিক্ষক এ.কে.এম শফিকুজ্জামান। এ বিষয়ে কলেজের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ (রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক) মাঙ্গিলাল সরকার কলেজ ফান্ড থেকে টাকা উত্তোলণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, নিয়োগ বোর্ড পরিচালনার জন্য ২ লাখ টাকা কলেজ ফান্ড থেকে উঠানো হয়েছে। যে চেকের মাধ্যমে টাকা উঠানো হয়েছে তাতে তার কোন স্বাক্ষর নেই। সলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি , সদর এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি ওই চেকে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড পরিচালনার নামে টাকা উত্তোলণের কোন বিধান নেই একথা ঠিকই। কিন্তু সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এভাবে হয়ে থাকে। যিনি নিয়োগ পান তিনি পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডে এই টাকা ফেরত দেন। বুধবার এনিয়ে কলেজে মিটিং হয়েছে। সেখানে নতুন অধ্যক্ষ কথা দিয়েছেন তিনি কলেজ ফান্ডের ওই টাকা  ফেরত দেবেন।
প্রসঙ্গত. গত ১৪ জুলাই সাতক্ষীরা দিবা-নৈশ কলেজের অধ্যক্ষ, কৃষি শিক্ষা ও অর্থনীতি বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্টিত হয়। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশের পর অধ্যক্ষ পদে ৯ জন, অর্থনীতি বিষয়ে ১১ জন এবং কৃষি শিক্ষা বিষয়ে ৩ জন প্রার্থী আবেদ করেন। গত ১৪ জুলাই কলেজেই এই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৫ সদস্যের নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত ছিলেন, কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাতক্ষীরা সদর আসনের এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি, কলেজ পরিচালনা পরিষদ সদস্য শেখ নূরুল হক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়রে প্রতিনিধি হিসেবে খুলনা বি এল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের উপাধ্যক্ষ দর্প নারায়ন শাহ , ডিজি প্রতিনিধি হিসেবে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর লিয়াকত পারভেজ ও দিবা-নৈশ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাঙ্গিলাল সরকার।
একাধিক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিয়োগ পরীক্ষার আগেই অধ্যক্ষসহ তিন পদে কাদেরকে নিয়োগ দেয়া হবে তা ঠিক করেন কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি । এসব প্রার্থীদের কাছে থেকে অগ্রীম টাকাও নেয়া হয় বলে তাদের অভিযোগ। তারা বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার দিন প্রার্থীরা দিবা-নৈশ কলেজে পৌছে মোটা অংকের অর্থবানিজ্যের বিষয়টি জানাতে পেরে তারা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে নীরব প্রতিবাদ জানায়।
জানাগেছে, অধ্যক্ষ পদে ৯ জনের মধ্যে মাত্র ৩ জন, অর্থনীতি বিষয়ে ১১ জনের মধ্যে মাত্র ২ জন প্রার্থী নিয়োগ বোর্ডে হাজির হন। কৃষি শিক্ষা পদে ৩ জনের কেউ নিয়োগ বোর্ডে হাজির হননি। নিয়োগ বোর্ডে প্রতিটি বিষয়ে কমপক্ষে ৩ জন প্রার্থী হাজির হওয়ার সরকারি নিয়ম থাকায় অর্থনীতি ও কৃষি শিক্ষা বিষয়ে নিয়োগ দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বোর্ড। প্রার্থীরা জানান, অধ্যক্ষ পদে যে ৩ জন অংশ নিয়ে নিয়োগ বোর্ডের কোরাম পুরণ করেছেন তারা সবাই প্রার্থী (হাজি কিয়ামদ্দিন কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ) এ কে এম শফিকুজ্জামানের সমর্থক। এরা হলেন, দেবহাটার হাজী কিয়ামদ্দিন কলেজের শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান (শফিকুজ্জামানের সহকর্মী )  ও যশোরের ঝিকরগাছার গঙ্গানন্দপুর কলেজের শিক্ষক আবু সাঈদ।
প্রার্থীরা জানান, প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে অধ্যক্ষ পদে দেবহাটার হাজী কিয়ামদ্দিন কলেজের শিক্ষক এ কে এম শফিকুজ্জামানকে সিলেকশন দেয়া হয়েছে। নিয়োগ বোর্ড ও কলেজ পরিচালনা কমিটি ইতোমধ্যে তাকে নিয়োগ দেয়ার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপারিশ করে পাঠিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেলেই তিনি অধ্যক্ষের চেয়ারে বসবেন।
কলেজ সূত্রে জানাগেছে, গত ৯ আগষ্ট সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এ,কে,এম শফিকুজ্জামান দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। ওই নিয়োগ বোর্ড করার জন্য কলেজ ফান্ড থেকে ২ লাখ টাকা উত্তোলণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ আগষ্ট ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমে সাতক্ষীরা দিবা-নৈশ কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ বানিজ্য নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।