সাতক্ষীরা সদর খাদ্য গুদামে চার হাজার মেট্রিক টন নিম্মমানের ধান ক্রয়ের অভিযোগ


332 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরা সদর খাদ্য গুদামে চার হাজার মেট্রিক টন নিম্মমানের ধান ক্রয়ের অভিযোগ
আগস্ট ১৭, ২০১৬ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মনজুর কাদীর :
সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনিয়মের মাধ্যমে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার খাদ্য গুদামে ৪ হাজার ১৯৬ মেট্রিক টন নিম্মমানের ধান ক্রয়ের অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের নাম ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের কাছ থেকে উচ্চ আদ্রতার নিম্মমানের এসব ধান ক্রয় করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান সরকারি খাদ্য গুদামে বিক্রি করতে পারেনি। সরকারি নীতিমালা না মেনে অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে ধান ক্রয় করে সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ২০ লক্ষাধিক টাকার ঘুষ বানিজ্য করেছেন।

সাতক্ষীরা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার খাদ্য গুদামে ৪ হাজার ১৯৬ মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ২৩ টাকা দরে এই ধান ক্রয় করার কথা এবং একজন কৃষক তার সংশ্লিষ্ট এলাকার খাদ্য গুদামে সর্বোচ্চ ৩ মেট্রিক টন ধান বিক্রি করতে পারবেন। তবে এসব ধানের আদ্রতা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশের মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু সাতক্ষীরা সদর উপজেলা খাদ্য গুদামে চলতি মৌসুমে ধান ক্রয়ে সরকারি এসব নির্দেশনা সম্পূর্ন ভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে যানা যায়, সাতক্ষীরা সদর উপজেলা সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করতে গিয়ে গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রতি কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা করে ঘুষ ও প্রতি ৪০ কেজি ধানে ২ কেজি করে ওজনে বেশি দিতে হয়েছে। এক ট্রলিতে করে ৩ টন ধান দেয়ার সময় প্রতি টনে এক বস্তা ধান বেশী নিয়েছেন গুদাম কর্মকর্তা। তার কথামত ধান ওজনে বেশী না দিলে আদ্রতা বেশী ও চিটা বলে ধান ফেরত দেয়া হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা কেজিতে ১/২ টাকা ঘুষ দেয়ার পাশাপাশি ধান ওজনেও বেশী দিতে বাধ্য হয়েছেন। যেকারনে ধানের আদ্রতার মান বজায় রাখাতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। এদিকে কেজিতে ২ টাকা করে ঘুষ ও ওজনে বেশি দিতে না পারার কারনে উপজেলার প্রকৃত কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান সরকারি খাদ্য গুদামে বিক্রি করতে পারেনি। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশরাফুজ্জামান আর্থিক সুবিধা নিয়ে অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের কাছ থেকে উচ্চ আদ্রতা সম্পন্ন নিম্মমানের ধান ক্রয় করে লক্ষ্যমাত্র পূরুন করেছেন। এক্ষেত্রে একজন ব্যাবসায়ী বা ফড়িয়ার কাছ থেকে ১০ হতে ১৫ টন করে ধান ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি ভাবে এক টন ধানে ৪০ টাকা লেবার ফি নেয়ার কথা থাকলেও  সেখানে প্রতি বস্তায় ১৫ টাকা করে আদায় করা হয়। চাহিদা মত লেবার ফির টাকা না দিলে কৌশলে ধানের ওজনে কম ফেলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর উপজেলার তুজলপুর এলাকার একজন সাধারন ব্যবসায়ী জানান, তারা ৬ জনে সদর উপজেলা খাদ্য গুদামে ৬০ মেট্রিক টন ধান বিক্রি করেছেন। ধান ব্যবসায়ী না হয়েও তারা এই ধান স্থানীয় বাজার থেকে কম দামে কিনে সরকারি খাদ্য গুদামে বিক্রি করেছেন। তবে তাদের কাছ থেকে প্রতি কেজিত ১ টাকা করে ঘুষ ও প্রতি ৪০ কেজি ধানে ২ কেজি ওজনে বেশী নিয়েছেন গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।  এছাড়া বাধ্যতামূলক ভাবে প্রতি বস্তায় ১৫ টাকা করে লেবার ফি নেয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের কাছ থেকে অধিকাংশ ধান ক্রয় করা হয়েছে। এসব ধান ক্রয়ের সময় আদ্রতার মান বজায় রাখা হয়নি। এভাবে অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্ত মোঃ আশরাফুজ্জামান চলতি মৌসুমে শুধু ধান ক্রয়কালে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে ২০ লাক্ষাধিক টাকার ঘুষ বানিজ্য করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতক্ষীরা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে ক্রয় করা নিম্মমানের ধান রাখার জন্য সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তড়িঘড়ি করে সুলতানপুর বড়বাজারস্থ বহু বছরের অব্যবহৃত ও পরিত্যাক্ত খাদ্য গুদাম ব্যক্তিগত খরচে সংস্কার করেছেন। সরকারি নির্দেশনা বা কোন টেন্ডার ছাড়াই ওই গুদাম সংষ্কার করার পর বর্তমানে তিনি ব্যাক ডেটে কাড়জপত্র তৈরী করার চেষ্টা করছেন। এছাড়া সরকারি নীতিমালা না মেনে অনিয়মের মাধ্যমে উচ্চ আদ্রতা সম্পন্ন নিম্মমানের ধান ক্রয় করে বড়বাজারস্থ অব্যবহৃত গুদাম ভর্তি করায় এসব ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে সদর উপজেলা খাদ্য গুদামে ৩ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন চাউল ক্রয় চলছে। এই চাউল ক্রয়ের জন্য ১৩০ জন তালিকাভুক্ত মিলার থাকলেও কোন মিলের পাক্ষিক মিলিং ক্ষমতা ঠিক নেই। আবার এর মধ্যে অনেক মিল আছে যা দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সম্পূর্ন অনিয়মের মাধ্যমে ইচ্ছামত কাগজে কলমে পাক্ষিক মিলিং ক্ষমতা তৈরী করে চাউল ক্রয়ের বেশী বরাদ্দ আনিয়েছেন। এই বরাদ্দের অধিকাংশ চাউল তিনি সিন্ডিকেট ভূক্ত কিছু ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ার মাধ্যমে ক্রয়ের পাশাপাশি জেলার বাইরে থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে নিম্মমানের চাউল কিনে এনে গুদাম ভর্তি করবেন। বর্তমানে চাউল ক্রয়কালেও কেজিতে ২ টাকা করে ঘুষ নেয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আশরাফুজ্জান ধান ও চাউল ক্রয়ে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ বানিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকারি নীতিমালা মেনেই সদর উপজেলা খাদ্য গুদামে ৪ হাজার ১৯৬ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করা হয়েছে এবং বর্তমানে চাউল ক্রয় চলছে। এখানে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই ধান ক্রয় করা হয়েছে এবং বর্তমানে তালিকাভূক্ত মিলারদের কাছ থেকেই চাউল ক্রয় চলছে। ধান ও চাউল ক্রয়কালে কৃষকদের কাছ থেকে ওজনে বেশী বা কোন টাকা নেয়া হয়না। সুলতানপুর বড়বাজার এলাকার কোন গুদাম নিজ উদ্যোগে সংষ্কার করা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধান রাখার উপযোগি থাকায় একটি গুদাম ব্যবহার করা হয়েছে। আদ্রতার মান বজায় রেখেই সব ধান ক্রয় করা হয়েছে। ধান ও চাউল ক্রয়ে কোন প্রকার অনিয়ম হয়নি বলে তিনি জানান।