সাতক্ষীরা সীমান্তে বিএসএফ-বিজিবি’র কড়াকড়ির কারণে ভারতীয় গরু আসা প্রায় বন্ধ


1298 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সাতক্ষীরা সীমান্তে বিএসএফ-বিজিবি’র কড়াকড়ির কারণে ভারতীয় গরু আসা প্রায় বন্ধ
সেপ্টেম্বর ২, ২০১৫ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

মোজাফফর রহমান : সাতক্ষীরা সীমান্তের বিপরীতে হাজার হাজার গরু জড়ো করা হলেও সীমান্তে বিএসএফ ও বিজিবির কড়াকড়ির কারণে এসব গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পাচ্ছে না। সীমান্তে গরু রাখালদের দেখামাত্র বিএসএফ গুলির করতে পারে এই আতংকে এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেছে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসা।
জানাগেছে, আসন্ন কোরবানীর ঈদকে সমানে রেখে সীমান্তের ওপারে হাজার হাজার গরু জড়ো করে রেখেছে ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীরা। আর সুযোগ বুঝে সীমান্ত পেরিয়ে দেশের অভ্যন্তরে গরু আনার চেষ্টা করছে বংলাদেশী গরু ব্যবসায়ীরা।

গরু ব্যবসায়ীরা বলছে, সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারনে কোন রাখাল ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে গরু আনতে সাহস পাচ্ছে না। বিজিবি‘র দাবী ভারত থেকে কেউ সীমান্ত পেরিয়ে গরু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দিয়ে গেলে আপত্তি থাববে না বিজিবি‘র। তবে কেউ গরু আনতে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ ভাবে ভারতে যেতে পারবে না। এজন্য বিজিবি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
অপরদিকে, ভারত সীমান্তে  সেদেশের বিএসএফ বাংলাদেশী গরু রাখালদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তারা গরু রাখালদের দেখামাত্র গুলি চালাচ্ছে বলে গরু ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
একাধিক গরু ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানাগেছে, চলতি বছর ১০ জুলাই বিএসএফ এর গুলিতে সাতক্ষীরা সীমান্তে মুকুল হোসেন (৩৫) নামক এক গরু রাখাল নিহত হওয়ার পর বিজিবি কঠোর অবস্থান নেই। নিহত মুকুল সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাওয়ালখালী গ্রামের মৃত মহাতাবউদ্দিনের ছেলে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কুশখালী সীমান্তের বিপরীতে ভারতের দুবলী এলাকায় বিএসএফ‘র গুলিতে নে নিহত হয়। গরু রাখাল নিহতের পর বিজিবির সেক্টর কমান্ডার থেকে শুরু করে সাতক্ষীরা দুটি বিজিবি ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় একাধিক সচেনতা মূলক সভা সমাবেশ করা হয়। যাতে করে কোন রাখাল অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে গরু না আনে। সচেতনতামূলক সভা অব্যাহত রেখেছে বিজিবি। ফলে সাতক্ষীরা সীমান্তে বাংলাদেশী কোন গরু রাখালরা গরু আনতে ভারতে যেতে সাহস পাচ্ছে না।

 

thসীমান্তের একাধিক সুত্র জানায়, গত কয়েক মাস ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছে গরু আনা-নেয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার মানুষ।
এদিকে, বাংলাদেশী গরুর ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি ভারতীয় ব্যবসাযীদের কাছে লগ্নি করেছিল গরুর আনার জন্য । গরু আনতে না পারলে এসব টাকা আর ফেরত পাওয়ার সম্ভবনা নেই এমন দাবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গরু ব্যবসায়ীর।

সুত্র জানায়, ভারতীয় গরু না আসায় আসন্ন কোরবানীর ঈদে বড় ধরনের এর প্রভাব পড়বে। ইতিমধ্যে জেলার পশুর হাট গুলিতে গরু আমদানী একেবারে কমে গেছে। গরুর দামও চড়া।
সাতক্ষীরায় ১৩৮ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া, দেবহাটা সীমান্তের প্রায় ২০ টি পয়েন্ট দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় গরু-মহিষ আসত এদেশে। পরে তা বিভিন্ন হাত ঘুরে কাষ্টম ভ্যাট দিয়ে বৈধ হয়ে যেত। ভারত থেকে গরু দেশের অভ্যন্তরে আসার পর বিভিন্ন হাত বদল হয়ে করিডোর হত।
ভারত থেকে গরু আনার পর সীমান্তবর্তী গরুর খাটালে  ( যেখানে গরু এনে প্রথমে রাখা হয় স্থানীয় ভাবে তাকে খাটাল বলে) । পরে করিডোরের মাধ্যমে নির্ধারিত রাজস্ব দিয়ে এসব গরু ট্রাক ভরে চলে যেত চট্রগ্রাম, নোয়াখালী, ঢাকাসহ দেশেরে বিভিন্ন স্থানে।

ভারতীয় গরু করিডোর করার জন্য সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সাতানী, কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া, দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া এবং কালিগঞ্জ উপজেলার বসন্তপুর এলাকায় পৃথক ৪টি করিডোর রয়েছে। স্থানীয় শুল্ক স্টেশনের আওতায় সরকার এসব করিডোরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করে থাকে।
সাতক্ষীরা শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানাগেছে, গত আগষ্ট মাসে জেলার পৃথক ৪টি করিডোরের মাধ্যমে মাত্র ২ হাজার ভারতীয় গরু এসেছে। আগে যেখানে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়েই প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করতো।
সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা সীমান্তে কমপক্ষে ২০টি গরুর খাটাল রয়েছে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে সাতক্ষীরার ৫টি গরুর খাটালের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো, সাতক্ষীরা সদরের কুশখালী, বৈকারী, ঘোনা, ভোমরা, কলারোয়ার মাদরা । এছাড়া সীসান্তের চান্দুড়িয়া, হিজলদি, কুশখালী, কালিয়ানী ছয়ঘরিয়া, ভোমরা, শাখরা, গাজীপুর, মাদরা, তলুইগাছা, ভাতশালা বিওপির সামনে ইতিপূর্বে ছিল অবৈধ্য গরুর খাটাল। এক সময় এসব অবৈধ খাটালে রমরমা  গরুর ব্যবসা ছিল।

সাতক্ষীরা ৩৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর নজির আহমেদ বকশী ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, ভারত থেকে যদি কেউ গরু বাংলাদেশে দিয়ে যায় সেক্ষেত্রে বিজিবি কোন সহনশীলতা দেখাবে। তবে বাংলাদেশের কেউ ভারতে গরু আনতে গিয়ে ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিজিবি চায় না, সীমান্তে গরু পাচার নিয়ে অনাকাংঙ্খিত কোন ঘটনা ঘটুক।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাহ আব্দুল সাদী ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, সাতক্ষীরার সাতানী করিডোর  দিয়ে গত  জুন মাসে ১ হাজার ২৩০ টি গরু-মহিষ এবং জুলাই মাসে ১ হাজার ৫৪৪ গরু -মহিষ ভারত থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। এর থেকে সরকারী ভাবে রাজস্ব আদায় করা হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। তিনি জানান, বর্তমানে সাতক্ষীরা সীমান্তে বৈকারী  ও ভোমরা খাটাল সরকারী ভাবে অনুমোদিত রয়েছে।
সাতক্ষীরা শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানাগেছে, গত আগষ্ট মাসে জেলার ৪টি করিডোরের মাধ্যমে গরু এসছে ২ হাজার ১৫৮টি। এ থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১০ লাখ ৭৯ হাজার। গত জুলাই মাসে এর পরিমান ছিল ৪ হাজার ২৩৫টি। জুলাই মাসে রাজস্ব আদায়ের পরিমান ছিল ২১ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ টাকা। সূত্র আরও জানায়, সাতক্ষীরার ৪টি করিডোর দিয়ে এক মাসে সর্বোচ্চ গরু করিডোর হয়েছে প্রায় দেড় লাখ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে নানা কারণে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদের ভাইচ চেয়ারম্যান স ম মোরশেদ ( সাতক্ষীরায় ভারতীয় গরু ব্যবসা ও গরুর খাটাল নিয়ন্ত্রনকারী ) জানান, ভারত থেকে গরু আনার ক্ষেত্রে বিজিবি টোকেন সিস্টেম চালু করেছে। বিজিবি‘র টোকেন নিয়ে বাংলাদেশী গরুর রাখালা ভারত থেকে গরু আনতে পারবে। তবে সে ক্ষেত্রে অনেকটা ঝুকি থেকে যায়। কারণ বিএসএফ গরু আনতে বাঁধা দিচ্ছে। এ কারণে কোন গরু রাখাল এখন আর গরু আনতে ভারতে যেতে সাহস পাচ্ছে না। তিনি জানান, সাতক্ষীরা সীমান্তে বর্তমানে গরু-মহিশ আসা প্রায় বন্ধ রয়েছে।
কয়েক জন গরু ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভয়েস অব সাতক্ষীরা ডটকমকে জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পরিমানে কম হলেও প্রতদিন গরু প্রবেশ শুরু করেছে। কোরবানীর ঈদ পর্যন্ত গরু যাতে আসে সেজন্য উভয় দেশে ব্যবসায়ীরা চেষ্টা করছেন। তারা আরও জানান, কোরবানীর ঈদ উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যে সাতক্ষীরা সীমান্তের বিপরীতে কয়েক লাখ গরু জড়ো করা হয়েছে। সুযোগ বুঝেই যে কোন সময় এসব ভারতীয় গরু বাংলাদেশ অভ্যন্তরে নিয়ে আসা হবে।

ব্যবসায়ীরা জানায়, সাতক্ষীরার পাশ্ববর্তী যশোর ও রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অথচ সাতক্ষীরা সীমান্তে বিএসএফ ও বিজিবির কড়াকড়ির কারণে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়েগেছে। ফলে সাতক্ষীরার বিভিন্ন গরুর হাট গুলোতে যেসব ভারতীয় গরু উঠতে দেখা যাচ্ছে তা অন্য সীমান্ত দিয়ে আনা।