সান্ত্বনা সাকিবের সেঞ্চুরি


72 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সান্ত্বনা সাকিবের সেঞ্চুরি
জুন ৯, ২০১৯ খেলা ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক :

শনিবার কার্ডিফে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেন সাকিব আল হাসান- ক্রিকইনফো

সোফিয়া গার্ডেন, স্পর্শাতুর আবেগ আর ভালো লাগার অঞ্জন নিয়ে বাংলাদেশিদের চোখে লেগে থাকা এক রূপকথার বাগান। গতকাল স্বপ্নালু সেই বাগানটিই যেন কোনো দৈত্য এসে মাড়িয়ে দিয়ে গেল, ফুল ছিঁড়তে গিয়ে গাছগুলোই যেন উপড়ে ফেলল! ৩৮৬ রানের রেকর্ড রান, জেসন রয়ের রুদ্ররূপ, জোফরা আর্চারের আগুনে গোলা- সব শেষে একটা একটা বিশাল শূন্যতা সেই বাগানে। তবে তার মাঝেও একজন সাকিব কিন্তু সূর্যমুখী হয়ে আকাশের দিকেই মাথা তুলে ছিলেন, ১২১ রান করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ফুল ছিঁড়লেও শেকড়টা উপড়ে ফেলতে পারোনি! ম্যাচটি ১০৬ রানে হারলেও টাইগারদের বিশ্বাসটা নাড়াতে পারোনি। আজ হয়নি, তাই বলে পরের ম্যাচে কেন হবে না। পুরো ম্যাচে হতাশার মাঝে একমাত্র আশার আলো হয়ে থাকলেন সাকিব আল হাসানই। টানা তিন ম্যাচে পঞ্চাশোর্ধ্ব রান।

আইসিসির হিসাব বলছে, এবারের বিশ্বকাপে ২৬০ রান করে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানই এখন ব্যাটসম্যানদের তালিকায় শীর্ষে। ২১৫ রান করে তার পেছনে আছেন ইংল্যান্ডের জেসন রয়। দু’জনই গতকাল সোফিয়া গার্ডেনে সেঞ্চুরি করেছেন এবং বিশ্বকাপে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরির মালিক হয়েছেন। তবে জেসন রয় করেছেন স্রোতের অনুকূলে, যেখানে তাকে ১৪০ কিলোমিটার গতির মুখোমুখি হতে হয়নি। সেখানে ৯২ বলে তার সেঞ্চুরি হয়েছে। আর সাকিবের সেঞ্চুরিটা এসেছে ঠিক তার উল্টো স্রোতের মুখে। আর্চার- প্লাঙ্কেটের ধেয়ে আসা গোলার মুখে। তার পরও ৯৫ বলে সেঞ্চুরি করেছেন সাকিব। এ মাঠেই দু’বছর আগে তার সেঞ্চুরিটি এসেছিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। সেই ম্যাচটি জিতেছিল বাংলাদেশ। কার্ডিফ বাংলাদেশকে খালি হাতে ফেরায়নি কখনও, হয়তো এদিন তাই তার প্রিয়মুখ সাকিবকেও একটি সেঞ্চুরি উপহার দিয়েছে সান্ত্বনার মতোই! এই মাঠের সবকিছুই তো সাকিবের জানা। লংঅন আর লংঅফের আকার যে কিছুটা ছোট, তাই এদিন সেদিকই দিয়েই বেশি রান ছুটিয়েছেন সাকিব।

৮ রানের মধ্যে ওপেনিং জুটি ভেঙে যাওয়া। সৌম্যর ২ রান করে বোল্ড হওয়া, শর্ট বলে তামিমের দুর্বলতা আবারও প্রকাশ পাওয়ার পর সাকিবই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। মুশফিকের সঙ্গে তৃতীয় উইকেট জুটিতে ১০৬ রান এসেছিল তাদের অভিজ্ঞতা আর দক্ষতার কারণে। আদিল রশিদকে বাউন্ডারির জন্য বেছে নিয়েও ওকস আর উডকে ছেড়ে কথা বলেননি সাকিব-মুশফিক। কিন্তু ইংলিশদের রানের পাহাড় যে অনেক ভারী ছিল। নিজের ৪৪ রানের মাথায় তাই ফ্লিক করতে গিয়ে পয়েন্টে ক্যাচ তুলে দেন মুশফিক। এরপর সাকিব একাই এগিয়ে নিতে থাকেন দলের ইনিংসকে। ওই সময় মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের একটা সমর্থন দরকার ছিল মুশফিকের মতো। কিন্তু ইদানীং মাহমুদুল্লাহ যেন বড্ড বেশি সতর্ক। চারশ’র কাছাকাছি রান তাড়া কিংবা আড়াইশ’- ছয় নম্বরে নামা রিয়াদ এদিনও কিছুতেই যেন চোখে চোখ রেখে বোলারকে শাসন করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাই ২৮০ রানেই থেমে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। ম্যাচের পর ইংলিশ সাংবাদিকরা বলাবলি করছিলেন যে, কোনোমতে যদি ইংল্যান্ড তিনশ’ চল্লিশ- পঞ্চাশে আটকে যেত তাহলে কিন্তু ম্যাচের রঙ বদলেও যেতে পারত।

বাগানের ছোট্ট বাউন্ডারি, সাগরের দিক থেকে ধেয়ে আসা বাতাস, টাইগারদের একশ’ ত্রিশ কিলোমিটার গতির সাদামাটা বোলিং, গা-ছাড়া ফিল্ডিং- সব মিলিয়ে চারশ’র পূর্বাভাসই ছিল কার্ডিফের আকাশে। শেষ পর্যন্ত তা না হলেও যা হয়েছে তাতেই যে রেকর্ড বইয়ের পাতায় একগাদা কাটাকুটি। ৩৮৬ রান, এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান, সোফিয়া গার্ডেনের ঘাসে লিস্ট-এ ম্যাচের সর্বোচ্চ রান। ইংলিশদের এমন সব উচ্চ উচ্চ রেকর্ডের দিনে বড্ড খাটো দেখাচ্ছিল টাইগারদের।

অবশ্য এমন কিছু যে হতে পারে তা আগের দিনই মাশরাফি। তিনশ’ রানের জন্য মানসিক প্রস্তুতিও ছিল তাদের। মাঠের মাপ কোন দিকে কতটা, সকালে বাতাস কোন দিক থেকে আসতে পারে, পিচে কতটা ঘাস থাকতে পারে- সব কিছু জেনে নিয়েই এদিন টস জিতে বোলিং নিয়েছিলেন টাইগার অধিনায়ক। চেষ্টা ছিল সাকিবের স্পিন দিয়ে শুরুতেই একটি-দুটি উইকেট তুলে ফেলা। পনেরো ওভারের মধ্যে সাকিবকে দিয়েই ৮ ওভার করে ফেলানোর কৌশল ছিল মাশরাফির। কিন্তু টানা সাত ওয়ানডেতে যারা তিনশ’ পার করেছে তারা তো আর এমনি এমনি সেটা করেনি। বাংলাদেশের কৌশলেই শুরুতে বাংলাদেশকেই আটকে দিয়েছিল দুই ইংলিশ ওপেনার জেসন রয় আর জনি বেয়ারস্টো। দেখেশুনে প্রথম ওভারে মাত্র ১৫ রান নিয়েছিল তারা। একটু থিতু হতেই শুরু হয়ে যায় সোফিয়া গার্ডেনে বাংলাদেশের স্বপ্নের বাগান মাড়িয়ে দেওয়ার কাজ। পাঁচ ওভারের পর থেকে সাইফউদ্দিন, মাশরাফি, সাকিব, মিরাজ কিংবা মুস্তাফিজ। কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি ইংলিশ ওপেনাররা। নাম ধরে বললে জেসন রয়। আকারে ছোট্ট এই মাঠের জ্যামিতি এঁকে এঁকে বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন তিনি। ৩৮ বলে ফিফটির পর শতরান করেছিলেন পরের ৫৪ বলে। তার আগেই অবশ্য বেয়ারস্টো আর তিনি মিলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে যে কোনো উইকেটে সর্বোচ্চ ১২৮ রানের জুটি গড়ে নেন।

ব্যাটিং সহায়ক এই পাটা উইকেটে যেখানে বোলারদের জন্য বাড়তি কোনো খাতির থাকে না। সেখানে পেস বোলারদের গতিই কেবল ঘাবড়ে দিতে পারে ব্যাটসম্যানকে। এদিন মাশরাফি তার স্বাভাবিক গতির চেয়ে কিছুটা বেশি কোনো কোনোটা ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটার গতিতে করেছিলেন বটে। মুস্তাফিজও সর্বোচ্চ ১৩৮ করেছিলেন। কিন্তু দলের যে ছেলেটা ঘণ্টায় ১৪০ কিমিতে করতে পারত, সেই রুবেল হোসেনকে একাদশেই রাখা হয়নি। অথচ ইংলিশ অধিনায়ক ইয়ন মরগান কিন্তু আগের দিন ঘোষণা দিয়েই এদিনের একাদশে লিয়াম প্লাঙ্কেটকে নামিয়েছিলেন। আসলে দলে সেই গতির বোলার নেই দেখে মাশরাফির কৌশলই ছিল স্পিনারদের দিয়ে কিছু একটা করে নেওয়ার। কিন্তু এদিন সাকিবের প্রথম পাঁচ ওভারের স্পেলে ২৬ রান নিয়েই ইংলিশরা বেছে নেয় মেহেদী হাসান মিরাজ আর মোসাদ্দেককে। দুই ওভারে ২৪ রান দেওয়ার পর মোসাদ্দেককে নিয়ে তাই আর কোনো ঝুঁকি নেননি মাশরাফি। নিজে এসে বেয়ারস্টোর উইকেটটা নিয়েছিলেন। এরপর জো রুটকে বোল্ড করেছিলেন সাইফউদ্দিন। মিরাজও দুটি উইকেট নিয়েছিলেন। কিন্তু ৪০ ওভারে ৩ উইকেটে কোনো দলের যখন ২৮৫ রান উঠে যায় তখন শেষ দিকে উইকেট হয়তো প্রেসবক্সে থাকা ব্রিটিশ সাংবাদিকদের আফসোস জাগাতে পারে। এর বেশি কিছু নয়।

দু’দলের পার্থক্যের একটি জায়গা এদিন স্পষ্ট করেছে সৌম্যর আউটটি। জোফরা আর্চার, বিশ্বকাপ স্কোয়াডে যাকে নেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছিল ব্রিটিশ মিডিয়া- এরই মধ্যে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ নয়, তিনি ইংল্যান্ডের হয়েই কেন খেলতে এসেছেন। এদিন তার ঘণ্টায় ৯১ মাইল গতির একটি বল সৌম্যর স্টাম্পের বেলকে ছক্কা বানিয়ে দেয়! বলের গতি এতটাই বেশি ছিল তার যে তামিমের হেলমেটে লেগেও তা ছক্কা হয়ে যায়! একে তো কাঁধের ওপর তিনশ’ ছিয়াশি, তার ওপর দুই পাশ থেকে আর্চার আর প্লাঙ্কেটের ধেয়ে আসা বাউন্সার- খুব কঠিন ছিল টাইগারদের এই ইংলিশ পরীক্ষাটি।