সিনহা রাশেদ হত্যা মামলা, কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত কমিটি


160 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সিনহা রাশেদ হত্যা মামলা, কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত কমিটি
আগস্ট ১৮, ২০২০ জাতীয় ফটো গ্যালারি
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার ঘটনায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলী এবং এএসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি। কক্সবাজার জেলা কারাগারে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির চার সদস্য গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পৌঁছান। সন্ধ্যা পৌনে ৭টা পর্যন্ত কারাগারে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কমিটির সদস্যরা কারাগার থেকে চলে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। তবে তাদের কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সিনহা হত্যাকাণ্ডে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করেছেন কমিটির সদস্যরা। যেমন- এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত নাকি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটেছে। কারও নির্দেশে লিয়াকত সিনহাকে গুলি করেছিলেন কিনা। ঘটনার সময় সিনহার হাতে অস্ত্র ছিল কিনা, এসব প্রশ্ন সামনে রেখে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কমিটির মতে, এসব প্রশ্নের জবাব মিললেই ঘটনার সবকিছু স্পষ্ট হবে।

গত রোববার টেকনাফে গণশুনানির আয়োজন করে তদন্ত কমিটি। সেখানে নয় প্রত্যক্ষদর্শী বক্তব্য দেন। তদন্ত সূত্র জানায়, এর মধ্যে তারা তদন্ত কার্যক্রম প্রায় গুছিয়ে এনেছেন। ২৩ আগস্টের মধ্যেই প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, সিনহার মৃত্যুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও গতকাল এপিবিএনের কয়েকজন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিলেন। তবে গতকাল তারা হাজির হননি। এপিবিএনের চেকপোস্টেই লিয়াকতের গুলিতে সিনহা মারা যান। সূত্র জানায়, শিগগিরই এপিবিএনের সদস্যরা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তাদের বক্তব্য দেবেন।

সূত্র জানায়, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি জব্দ আলামত বিশ্নেষণ করে দেখা হবে। অনেক আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। আবার ঘটনাস্থল থেকে কিছু আলামত জব্দ হলেও কেন তা জব্দ তালিকায় দেখানো হয়নি, এটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে র‌্যাব রিমান্ডে নিয়ে চার পুলিশ সদস্যসহ মোট সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের মধ্যে তিনজন পুলিশের মামলায় সাক্ষী ছিলেন।

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের শামলাপুর চেকপোস্টে গুলিতে নিহত হন সিনহা। এরপর ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চার সদস্যের এই কমিটি গঠন করে। কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন- সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাজ্জাদ হোসেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জাকির হোসেন এবং কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাজাহান আলী।

সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস গত ৫ আগস্ট কক্সবাজারের হাকিম আদালতে যে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, তাতে লিয়াকত আলীকে প্রধান ও প্রদীপ কুমার দাশকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে। মামলায় মোট নয়জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ওসি প্রদীপসহ সাত পুলিশ সদস্য ৬ আগস্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আদালতের নির্দেশে এই চারটি মামলায়ই এখন তদন্ত করছে র‌্যাব।

কক্সবাজার জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক মোকাম্মেল হোসেন জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গতকাল সকাল ১১টা থেকে তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পৃথকভাবে তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, কারান্তরীণ তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র‌্যাবের সাত দিনের রিমান্ডে থাকা বাকি সাত আসামিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবে কমিটি। এই সাত আসামি হলেন- উপপরিদর্শক (এসআই) লিটন, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুন এবং টেকনাফ থানায় পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষী মো. নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দীন ও মোহাম্মদ আয়াস। শুক্রবার তাদের রিমান্ডে নিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব ডিজির ঘটনাস্থল পরিদর্শন : সিনহাকে হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। গতকাল বিকেলে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। পরে তিনি ওই এলাকার কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার বিষয়ে জানতে চান।

পরিদর্শন শেষে র‌্যাবের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, এ মামলার তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্ব ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে করছে র‌্যাব। তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে যা যা প্রয়োজন তাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করছি।’ এই ঘটনা নিয়ে বাহিনীগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয়হীনতা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাংবাদিকদের র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। একটার সঙ্গে আরেকটা মিলাচ্ছি। তদন্তের পরে আমরা বলতে পারব এবং আমরা কাজ করছি।’

সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চান, ‘আপনি নিজে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এ ঘটনায় আসামিও পুলিশ, তাই বিব্রতবোধ করছেন কিনা।’ জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো বিব্রতবোধ করছি না। পেশাদারিত্বের সঙ্গে সকলে মিলে এটি কাজ করছি। আমাদের তদন্ত কর্মকর্তা একজন দক্ষ অফিসার। পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবেন তিনি।’

এ সময় উপস্থিত ছিলেন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম, মিডিয়া উইংয়ের মুখপাত্র লে.কর্নেল আশিক বিল্লাহ, র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ, সহকারী পরিচালক এএসপি খাইরুল ইসলাম প্রমুখ। এর আগে র‌্যাব মহাপরিচালক কক্সবাজার পৌঁছে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথাও বলেছেন।

চরিত্রহননের বিরুদ্ধে মামলা করবেন শিপ্রা :সিনহার সহকর্মী শিপ্রা দেবনাথ তার ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে মামলা করার হুমকি দিয়েছেন। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তার ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করে মানহানি ও চরিত্রহননের চেষ্টা করছে একটি মহল। এতে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

গতকাল এক ভিডিওবার্তায় শিপ্রা বলেন, ‘একজন মানুষ হত্যাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আমার টুঁটি চেপে ধরে আমাকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এটা করলে এ দেশের লাখো তরুণ-তরুণী প্রতিশোধ নেবে। একটি স্বাধীন দেশে একজন নারীর পছন্দমতো বেঁচে থাকার অধিকার কি নেই?’

তিনি বলেন, কিছুদিন ধরে তার একান্ত কিছু ছবি বিকৃত করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ও ডিভাইস থেকে ছবি চুরি করে বিকৃত মস্তিস্কের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও তা শেয়ার করছেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

শিপ্রা বলেন, ‘আমার ব্যক্তিজীবনকে যারা অসহনীয় করে তুলছেন, তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করব। আমি মনে করি, আমার চরিত্রহননের চেষ্টার মাধ্যমে এ দেশে ঘরে-বাইরে কাজ করা নারীকে অপমান করা হচ্ছে।’

এদিকে শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে সাতক্ষীরার এসপি এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একজন পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে হাইকোর্টে মামলা করেছেন ব্যারিস্টার মনোজ কুমার ভৌমিক। আজ মঙ্গলবার এর শুনানির দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্টের বিচারপতি জেবিএম হাসান ও খায়রুল আলমের বেঞ্চ।

রিটে বিবাদী করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের প্রধান পরিচালক, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজিসহ সংশ্নিষ্টদের।