সীমান্তজেলা সাতক্ষীরায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ


455 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সীমান্তজেলা সাতক্ষীরায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ
জুন ২২, ২০২১ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর
Print Friendly, PDF & Email

সামাজিক বয়কটের আশংকায় গ্রামের মানুষ গোপন করছে রোগ,

নমুনা দিতে আগ্রহী নন

মহামারির আশংকা, বাড়িতে বাড়িতে নমুনা সংগ্রহের তাগিত

॥ এম কামরুজ্জামান ॥

সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। গত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে করোনা আক্রান্ত রোগির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে করোনা সংক্রমণ। গ্রামের পরিস্থিতি আরও খারাপ। শহরের মানুষ করোনা উপসর্গ দেখা দিলে করোনা পরীক্ষা করতে আগ্রহী হলেও গ্রামের পরিস্থিতি একেবারেই উল্টো। গ্রামের মানুষ সামাজিক বয়কটের শিকার হওয়ার আশংকায় রিতিমতো রোগ গোপন করছে। তারা আগ্রহী হচ্ছে না করোনা পরীক্ষা করাতে। মানছে না স্বাস্থ্যবিধি। স্বাস্থ্য বিভাগ জনবল সংকটের কারনে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে সমুনা সংগ্রহ না করায় জেলার অধিকাংশ মানুষ করোনা পরীক্ষার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। ফলে সাতক্ষীরায় করোনা মহামারি আকার ধারন করার আশংকা করছে বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছে বাড়িতে বাড়িতে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাবে।
এদিকে চলতি সপ্তাহ থেকে সাতক্ষীরা মেডিকেল করেজ হাসপাতালকে ২৫০ শয্যা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ২৭১জন চিকিৎসা গ্রহণের বিপরিতে করোনা পজিটিভ রয়েছে ৩৪ জন। এছাড়া হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৮৬ জন। জেলায় মোট এ পর্যন্ত করোনা পজিটিভ রোগির মৃত্যু হয়েছে ৬১ জন এবং করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৮১ জনের।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, সাতক্ষীরা জেলায় করোনাভাইরাস শনাক্তের প্রথম দিন ২০২০ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ২১ জুন পর্যন্ত (৪২২ দিনে) ১১ হাজার ৩৯৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২ হাজার ৯৯০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।
সাতক্ষীরার কয়েকটি আবাসিক হোটেলের কোয়ারেন্টাইনে থাকা ভারত থেকে দেশে ফেরা ১৭ জন বাংলাদেশী নাগরিকের করোনা শনাক্তের পর গত ২৩ মে থেকে সাতক্ষীরা জেলায় করোনা সংক্রমন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এরপূর্ব পর্যন্ত ৩৯২ দিনে সাতক্ষীরা জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ৪১২ জনের। ওই সময়ে নমুনা পরীক্ষা হয়েছিল ৮ হাজার ১২১ জনের। শনাক্তের হার ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এরপর থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে।
২৩ মে থেকে ২১ জুন পর্যন্ত গত ৩০ দিনে সাতক্ষীরা জেলায় মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৫টি। এ সময় শনাক্ত হয়েছে, ১ হাজার ৬১৩ জনের। শনাক্তের হার ৪৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ একমাসে করোনা শনাক্ত রোগির সংখ্যা বেড়েছে ৩০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
সাতক্ষীরায় মোট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মৃত্যবরণ করেছে ৬১ জন এবং উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২৭৩ জনের।
সাতক্ষীরার কলারোয়ার তুলশীডাঙ্গা গ্রামের মোসলেমউদ্দীন, মোকবুল হোসেন, আশরাফ হোসেন, নেদু মোড়ল ও আনিছুর রহমান করোনা উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে আছেন। সরেজমিনে তাদের বাড়িতে গিয়ে করোনা টেস্ট করেননি কেন জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা করোনা টেস্ট করবো না। গ্রাম্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিচ্ছি। যদি করোনা হয় তাহলে আমাদের বাড়ি লকডাইন করে দিবে, তখন অনেক সমস্যা হবে। বিধায় আমরা গোপনে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছি। তারা আরো বলেন, আমাদের করোনা হয়নি। এটা সিজেনারী জ্বর সর্দি কাশি। কয়েকদিন পরে সেরে যাবে। তারপরেও যদি শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় তখন হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হবো। তালার মানিকহার গ্রামের শামিম হোসেন, আবুল কালাম করোনার উপসর্গ নিয়ে তারা ভুগছে। তাদের কাছে করোনা টেস্টের কথা জানতে চাইলে তারাও একই কথা বলেন।
করোনা টেস্টে মানুষের অনাগ্রহের কথা জানতে চাইলে, কলারোয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার জিয়াউর রহমান বলেন, প্রথমে মানুষের সচেতনতার অভাব। কলারোয়ার প্রায় অধিকাংশ বাড়িতে করোনার উপসর্গ রোগী আছে। কিন্তু তারপরেও তারা করোনা টেস্ট করতে চাইনা। ইতোমধ্যে কলারোয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও করোনা টেস্টের জন্য র‌্যাপিড এন্টিজেন কিডস মেশিন আছে। যা দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে করোনা টেস্টের ফলাফল পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসন ও থানা প্রশাসনের ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের পক্ষ থেকে বারবার মাইকিং করা সত্ত্বেও তারা টেস্ট করতে আসে না। তাছাড়া আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী ফিল্ডে গিয়ে বুঝাচ্ছে, আমি নিজেও বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লাবে গিয়ে বলছি, তার পরেও মানুষ পরীক্ষা করতে আসছে না। তারা মনে করে করোনা হয়েছে জানাজানি হলে সামাজিক বয়কটের শিকার হতে হবে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত ও করোনা উপসর্গ রোগি ছাড়া অন্য কোন রোগিকে আর ভর্তি নেয়া হচ্ছে না।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: কুদরত-ই-খোদা জানান, হাসপাতালটিতে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ৮টি আইসিইউ বেড চালু করা হয়। এর মধ্যে ৬টি নেগেটিভ বেড ও ২টি পজেটিভ বেড রয়েছে। ৮টি আইসিইউ বেডে বর্তমানে ৮ জন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং ১২ জন প্রশিক্ষিত নার্স দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আরও জানান, করোনা রোগিদের জন্য সেন্টাল অক্য্রিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে চলতি সপ্তাহ থেকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে করোনা ডেডিকেটিড হাসপাতাল ঘোষণা করা হয়। এ পর্যন্ত যারা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তাদের অধিকাংশের বাড়ি গ্রামে। গ্রামের মানুষ সচেতন কম। করোনা আক্রান্ত হয়ে একেবারে শেষ পর্যায় হাসপাতালে আসছে । যে কারনে তাদের চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না. মারা যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুর রহিম বলেন, জেলায় বাড়িতে বাড়িতে করোনা উপসর্গ। বিধায় বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগকে এ ব্যাপারে জরুরী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন এই নাগরিক নেতা।
সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা: হুসাইন সাফায়াত বলেন,সাতক্ষীরার প্রতিটি ঘরে ঘরে করোনা উপসর্গ রোগি রয়েছে। শহরের মানুষ করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে হাসপাতালে আসলেও গ্রামের মানুষকে কোন ভাবেই বুঝিয়ে আনা যাচ্ছে না। তারা মনে করছে করোনা হয়েছে জানতে পারলে বাড়ি লকডাউন হয়ে যাবে, সামাজিক বয়কটের শিকার হবে। গ্রাম এলাকায় করোনা রোগিরা অবাধে চলাফেরা করছে। তিনি বলেন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের করেনা পরক্ষার জন্য স্থাপিত পিসিআর ল্যাবে প্রতিদিন গড়ে দুই রাউন্ডে ১৮৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ রোগি নমুনা দিতে আসছে। তিনি বলেন, উপজেলা হাসপাতাল ও কমিউনিটি হাপপাতেলের স্বাস্থ্য কর্মীদের মাধমে গ্রামের মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। কিন্তু জনবল সংকটের কারনে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

##