সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাড়বে পর্যটক ও রাজস্ব


177 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাড়বে পর্যটক ও রাজস্ব
জুন ২৬, ২০২২ ফটো গ্যালারি সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট ::

সাতক্ষীরার আকর্ষণ সড়ক পথে সুন্দরবন। বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। ভৌগোলিকভাবে সুন্দরবনের কোলে অবস্থান হওয়ায় একমাত্র সাতক্ষীরা জেলা থেকেই সড়কপথে সুন্দরবন দেখা যায়। তাই স্বল্প খরচে সুন্দরবনকে প্রতিনিয়ত নতুন রূপে দেখার সুযোগ কেবল সাতক্ষীরাতেই রয়েছে।

পদ্ম সেতু চালু হওয়ায় এখন সড়কপথে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সাতক্ষীরা হয়ে সরাসরি যাওয়া যাবে ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে। যে সুযোগ আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এটি ভ্রমন পিপাসু পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিষয়। ফলে ভ্রমণ মৌসুমে সাতক্ষীরার সুন্দরবনে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়বে। সমৃদ্ধ হবে জেলার অর্থনীতি।

সাতক্ষীরার জেলার মোট আয়তন ৩ হাজার ৮৫৮.৩৩ বর্গকিলোমিটার। এরমধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও (১ হাজার ৪৪৫.১৮ বর্গকিলোমিটার) বেশি সুন্দরবন। এ বন ঘেঁষে সাতক্ষীরার অবস্থান হওয়ায় সড়কপথ দিয়েই সুন্দরবন দেখা যায়।

বাংলাদেশের ৬টি জেলা জুড়ে সুন্দরবন বিস্তৃত হলেও একমাত্র সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ থেকে সরাসরি দেখা যায় সুন্দরবনের সবুজ আবহ। মুন্সীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছুলেই নদীর ওপারে চোখে পড়ে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ‘ব্র্যান্ড’ সুন্দরবন।

এরপর ভ্রমণপিপাসুরা বনবিভাগ থেকে পাশ নিয়ে ইচ্ছেমতো দর্শন করতে পারেন এই বিশ্ব ঐতিহ্যের সৌন্দর্য। মংলা, পটুয়াখালী, ও বাগেরহাট যে দিকে দিয়েই সুন্দরবন যান না কেন বন দেখার জন্য নদী পথে ছুটতে হবে অনেকটা দূর। একমাত্র সাতক্ষীরার জেলার কোলঘেঁষা সুন্দরবন তার ব্যতিক্রম।

সাতক্ষীরা থেকে সড়ক পথে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ। এখানে গেলেই সুন্দরবনের দেখা মেলে। মুন্সিগঞ্জ থেকে নদী পথে যাওয়া যায় গহীন সুন্দরবনে। একদিকে হিংস্র রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, বানর, হরিণসহ বিভিন্ন পশুপাখিদের সমাহার, অন্যদিকে বনের গভীর নিরবতা খুব সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করবে।

সুন্দরবনকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন ও আনন্দদায়ক করে তুলেছে সুন্দরবনকে ঘিরে মুন্সিগঞ্জে গড়ে ওঠা আকাশলীনা ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার, মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত, কলাগাছিয়া ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার, দোবেকী ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার, ক্যারাম মুরা ম্যানগ্রোভ ভিলেজ, ক্যারাম মুরা পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, কৈখালী সীমান্ত ও পাঁচ নদীর মোহনা, উড়ালমন আদিবাসী গ্রাম ও নৌকা ভ্রমণ সাইট এবং শিয়ালকুনি বনায়ন।

সুন্দরবনের আবেশে কেওড়া বাগানে গড়ে ওঠা আকাশলীনা ইকো-ট্যুরিজম সেন্টারের পরিচিতি এখন দেশজুড়ে। জোয়ার-ভাটায় রূপ পরিবর্তনকারী এই ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার ভ্রমণ পিপাসুদের সুন্দরবন দর্শনের আগ্রহ বাড়িয়েছে বহুগুণে। কী শারদে-কী বসন্তে চুনা নদীর তীরে গড়ে ওঠা আকাশ লীনায় বসে দেখা যাবে গাঢ় সবুজের বুক চিরে বয়ে চলা মালঞ্চ নদীর রূপ।

সুন্দরবনের মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত আরও একটি দৃষ্টিনন্দন স্থান। যার একদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি। প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকত দর্শনার্থীদের পুলকিত করে তোলে নতুন করে। যা পর্যটকদের বার বার ডাকে সুন্দরবনে। সাগরপাড়ের এ সৈকতে গেলেই পর্যটকদের মন বলে ওঠে,‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।’

শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী থেকে মান্দারবাড়িয়া পর্যন্ত যাওয়ার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হলে পর্যটনের নতুন দিক উন্মোচিত হবে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল।

সুন্দরবনের ভেতরে অবস্থিত কলাগাছিয়া ইকো-ট্যুরিজম সেন্টারে রয়েছে বনের ভেতর হেঁটে বেড়ানোর সুযোগ। যেখানে বনের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে বানর, মায়াবী হরিণসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি ও জীবজন্তু। রয়েছে সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার। এখানেও দাঁড়ালে মন ছুঁয়ে যায় সবুজ পাতার অরণ্যে।

সুন্দরবনের ভেতর আর একুট এগিয়ে গেলেই দোবেকী ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার। সেখানেও রয়েছে একই সুযোগ-সুবিধা।

এছাড়া পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে মুন্সিগঞ্জের কলবাড়িতে অবস্থিত আধুনিক সুযোগ সুবিধা সমৃদ্ধ বরসা রিসোর্ট ও ট্যুরিজম সেন্টার। আবাসিক সুবিধা রয়েছে মুন্সিগঞ্জের আকাশলীনা ইকো-ট্যুরিজম সেন্টারে। একই সাথে মুন্সিগঞ্জে রয়েছে সুশিলন সহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিলাবসবহল রিসোর্ট। এখানে স্বল্প খরচে পর্যটকদের থাকা খাওয়া ব্যবস্থাও রয়েছে।

সুন্দরবনের কোল ঘেষে এসব রিসোর্টের অবস্থান হওয়ায় যে কোন সময় পর্যটকরা সুন্দরবনের মধ্যে ভ্রমণে যেতে পারবেন। যেটি পর্যটকদের জন্য বাড়তি পাওনা।

সাতক্ষীরার নাগরিক নেতা অধ্যাপক আনিসুর রহিম জানান, বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব অর্জনে অন্যান্য বনের তুলনায় সুন্দরবনের অবদান সবার শীর্ষে। খুব বেশি আগের কথা নয় যখন সুন্দরবনকে মানুষ ভয় পেত, কিন্ত এখন প্রকৃতি প্রেমিক দেশী-বিদেশী পর্যটকদের বিচরণ অনেক গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সাতক্ষীরার সুন্দরবন ভ্রমণে নতুন অধ্যায়ের সুচনা হয়েছে। দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা সরাসরি সড়ক পথে গিয়ে সুন্দরবনের অপরুপ সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারবেন। এতে করে সাতক্ষীরায় পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কয়েক গুন বেড়ে যাবে বনবিভাগের রাজস্ব আদায়।

বিশিষ্ঠ সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মিনি জানান, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সাথে সাতক্ষীরার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। এখন কোন বিরতি ছাড়াই ঢাকা থেকে মাত্র ৪/৫ ঘন্টার মধ্যে সড়ক পথে সাতক্ষীরা আসা যাবে। যে কারণে ভ্রমণ মৌসুমে পর্যটকরা সড়ক পথে সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবন ভ্রমণে যেতে বেশী আগ্রহী হয়ে উঠবে। এতে করে সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে শ্যামনগর এলাকায় নতুন নতুন রিসোর্ট গড়ে উঠবে। বাড়বে কর্মসংস্থান। বনবিভাগের রাজস্ব আদায়ও কয়েক গুন বেড়ে যাবে। যা সরাসরি ভূমিকা রাখবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

শহরের রাজারবাগান এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ি মোঃ আব্দুস সাইদ জানান, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সুন্দরবনের সাতক্ষীরা অঞ্চলে পর্যটকের সংখ্যা আগের তুলনায় বহুগুনে বেড়ে যাবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। তবে পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসিক ব্যবস্থা ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সাতক্ষীরার সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ফলে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল উপকূলীয় অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে। তাছাড়া সুন্দরবনের সম্পদের উপর নির্ভরতা ও কমবে। এতে করে প্রাকৃতিক সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, সংরক্ষণ হবে জীববৈচিত্র, বৃদ্ধি পাবে দেশী-বিদেশী পর্যটক। যা দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারি বন সংরক্ষক (এসিএফ) এম এ হাসান জানান, সুন্দরবন একটি বিশ্ব ঐতিহ্য। পর্যটকদের কাছে সুন্দরবন খুবই আকর্ষণীয়। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এখন ঢাকা থেকে সকালে এসে সুন্দরবন ঘুরে বিকালে চলে যতে পারবেন পর্যটকরা। এখানে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন ঘোরার সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আপাতত তিন মাস সুন্দরবনে ঢোকার পাশ বন্ধ রয়েছে। কোন ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলে মৌসুমের আগেই পাশ ইস্যু শুরু হবে। গত জুন মাস পর্যন্ত প্রায় তিন কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা বহুগুন বৃদ্ধি পাবে। রাজস্ব আদায়ও বেড়ে দ্বিগুন হবে। তবে ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।