সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে হরিণ,কুমির হত্যা করছে বনদস্যুরা


1195 বার দেখা হয়েছে
Print Friendly, PDF & Email
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে হরিণ,কুমির হত্যা করছে বনদস্যুরা
ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৯ ফটো গ্যালারি সাতক্ষীরা সদর সুন্দরবন
Print Friendly, PDF & Email

মিঠু বরকন্দাজ ::

সুন্দরবনে বনদস্যুরা শুধু বাঘ হত্যা নয়, রেকর্ড পরিমান হরিণ ও কুমির হত্যা করেছে। যে ক্ষতি আর পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবেনা বলে অভিমত ব্যক্ত করেছে সুন্দরবনের সাথে জড়িয়ে থাকা জীবন জীবিকা নির্বাহ করা মানুষরা। তাদের মুখের ভাষ্য অনুযায়ী গত দুই যুগ সমগ্র সুন্দরবনে রাম রাজত্ব কায়েম করেছে কয়েক ডজন বনদস্যুরা। তাদের নিয়ন্ত্রিত সুন্দরবনে গত দুই যুগ গা বাঁচিয়ে চলেছে বন বিভাগসহ অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে বনদস্যুরা অবাধে হত্যা করেছে, বাঘ, হরিণ কুমিরসহ অন্যান্য প্রজাতির বন্য প্রানী। সুন্দরবনে আজ কাল আর তেমন দেখা যায় না। আগে শীতের মৌসুম আসতে না আসতেই প্রতিনিয়ত নদীর দুপারেই কুমির দেখা যেতো। কুমির খুবই হি¯্র প্রানী। বনের বাওয়ালীদের মুখে শোনা যায়, জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। এদের সাথে দেখা হলে জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। কুমিরের প্রধান খাবার মাছ, কিন্তু মাছ খেয়ে এরা নিবৃত থাকেনা। বনের জীব যুক্ত এমনকি জলে বাওয়ালীদের সুযোগ পেলে খেয়ে ফেলে। কুমির উভচর প্রানী, ডাঙায় ও জলে এদের বসবাস। তবে বেশির ভাগ সময় এরা পাণিতে বাস করে। ডিম পাড়ার সময় তারা বনের ভিতরে গিয়ে ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফোটায়। একটা স্ত্রী কুমির ৫০টিরও বেশি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটানো বাচ্চাদের কুমির খোজ নিতে পারেনা। ওই সুযোগে পুরুষ কুমির বাচ্চা খেয়ে ফেলে। যে টি কুমিরের বংশ বিস্তারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি বড় কুমির ২০ফুটের মত লম্বা হয়। বিশাল দেহি এ প্রাণিকে সবাই ভয় পায়। এমন কি বনের রাজা বাঘ কুমিরকে এড়িয়ে চলে। বাগে পেলে কুমির বাঘকেও খেয়ে ফেলে। অনেক সময় অধিপত্ত বিস্তার করতে বাঘ কুমিরের লড়াই হয়। তাতে কুমির জিতে যায়। কুমিরের দেহের উপরের আবারণ খুবই শক্ত, বন্দুকের গুলি তার গায়ে বেঁধেনা। যে কারনে বাঘ কুমিরকে কিছু করতে পারে না। কুমিরের আয়ুষ্কাল সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কোন প্রাণি বিশরদ সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। তবে অনেকের মতে এরা ২শ বছর পর্যন্ত বেঁছে থাকে। কুমির তার বিশাল লেজের সাহয্যে শিকার করে থাকে। কুমিরের ২টি চোখ মাথার উপরিভাগে অবস্থিত। চোখ দুটি পানির উপরে রেখে সারা শরীর পানির নিচে লুকিয়ে রাখে। কুমিরের নিশানা খুবই প্রখর। বহুদুর থেকে শিকার দেখ পানিতে ডুব দিয়ে বস্তুর কাছে গিয়ে লেজের আঘাত করে ধরে ফেলে। কুমির কোন কিছু টাটকা খেতে পছন্দ করে না। তাই পচা, মরা খাবার তার প্রিয় খাদ্য। কুমিরে একবার মানুষের মাংস খেলে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একটি কুমিরের চামড়া ২-৩লাখ টাকায় বিক্রয় হয় বলে সুত্রে যানা গেছে। সুন্দরবনের নদী ও খালে কুমির রয়েছে ১৫০-২০৫টি। সম্প্রতি সমীক্ষায় মিলেছে এই তথ্য। এর আগে একটি গভেষনা সুত্রে বলা হয়েছিলো সুন্দরবনে বাংলাদেশের অংশে ৫শতাধিক কুমির রয়েছে। শিঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে কুমির সমীক্ষার ফলাফল। এছাড়া এই জলজ প্রাণিটির সাতটি হুমকি সনাক্ত করা হয়েছে এই সমীক্ষায়। হুমকি নিরশনে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে ৪টি গ্রুপ ভাগ হয়ে ছোট ছোট দল নদী ও খালে ঘুরে গ্লবাল পজেশনিং সিস্টম জিপিএস -এর সাহয্যে। এভাবেই চলে ভাষমান এবং নদী তীরে থাকা কুমিরের সংখ্যা গননা। সুন্দরবনে এই কুমিরের সমীক্ষা ২০১৪ সালের এপ্রিলে শুরু হয়ে চলে গত ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। এতে জানা যায়, সুন্দরবনে কুমির রয়েছে ১৫০-২০৫টি। সমীক্ষায় কুমিরের হুমকি ও হ্রাস হিসেবে জেলেদের জালে আটকা পড়াসহ নানা কারন দেখানো হয়েছে। তবে এসকল গভেষনা মতামত জরিপ উড়িয়ে দিয়েছে সুন্দরবনের সাথে জড়িয়ে থাকা জীবন জীবিকা নির্বাহ করা প্রতক্ষদর্শী মানুষ। তাদের একান্তই অভিযোগ, সুন্দরবনের বন দস্যুরা যেমন রেকর্ড পরিমান বাঘ হত্যা করেছে। পাশাপাশি হরিণ কুমিরসহ নানা প্রকার বন্য প্রাণি হত্যা করেছে। ফলে ধ্বংস হয়ে গেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের প্রানী সম্পদ। এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় শ্যামনগর উপজেলার মৎস্যজীবি ও বন জীবিদের সাথে। সুন্দরবন ঘেসা কৈখালী ইউনিয়নের গোলাম মোস্তফা, মাহমুদুল, ফিরোজ শেখ, রফিকুল ইসলাম, তারাপদ, রমজাননগর ইউনিয়নের শামসুর, রশিদ, আক্তার, পার্শে¦খালী গ্রামের, শেখ আলম, আইয়ুব আলী, মুন্সীগঞ্জ গ্রামের , মান্নান, আতিয়ার, আনছার , তাইজুল, মজিদ ও বুড়িগোয়ালীনি গ্রামের, রহিম, মিজানুরসহ শতাধিক বনজীবি ও মৎস্যজীবিরা প্রতিনিধিকে জানান, সুন্দর বনের বাঘ, হরিণ, কুমিরসহ নানা প্রকার বন্য প্রাণীর নিধন বা হ্রাস পাওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থা গভেষক পর্যাবেক্ষক ভিন্ন ভিন্ন কারন দেখিয়ে মন্তব্য করেছে। তাতে বন্য প্রাণি হ্রাস পাওয়ার কারন খাদ্য সংকট, জলবায়ুর প্রভাবে লবনাক্ততা বৃদ্ধি, চোরা শিকারীসহ অনেক কারন উল্লেখ করেছে। কিন্তু,এসবই প্রত্যাখ্যান করেছে, ওই মৎস্যজীবি ও বনজীবিরা। তাদের কথা, প্রায় দুই যুগ গোটা সুন্দরবন নিয়ন্ত্রন করেছে কয়েক ডজন বনদস্যুরা। বন দস্যুদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বন বিভাগসহ অন্যান্য প্রাশাসন ঘুকতে সাহস পেতো না। দুই যুগ ধরে সুন্দরবনে রাম রাজত্ব প্রচলিত হয় বন দস্যুদের মাধমে। ফলে সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ, কুমিরসহ বন্য প্রাণিদের আবাস স্থল পুরোপুরি দখলে নিয়েছিল বন দস্যুরা। বন দস্যুদের দখলে থাকা তাদের আবাস স্থল নিয়ন্ত্রনে রাখতে শুধু বাঘ হত্যা করে থেমে থাকেনি। রেকর্ড পরিমান হরিণ কুমির ও অন্যান্য বন্য পাণি হত্যা করেছে বনদস্যুরা। তাদের শিকার করা হরিনের মাংস তাদের সোর্সদের মাধ্যমে চলে গেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রভাবশালীদের বাড়ীতে। এমনকি বন দস্যুদের যারা উপরে থেকে সেল্টার দিয়েছে হরিনের মাৎস দিয়ে তাদের খুশি করা হয়েছে। খুশি করা হয়েছে এক শেণিরে অসাধু প্রাশাসনিক রাজনৈতিক আমলাদের। প্রতক্ষদর্শী বনজীবিরা আরও জানান, ১৯৯০ দশক থেকে ২০০০দশক পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রতিনিয়ত বাঘের আক্রমনে জেলে বনজীবি নিহত হয়েছে। নৌকা সুন্দরবনের কিনারে ভিড়ানোর সাথে সাথে বাঘ আক্রমন করেছে মানুষের উপরে। নদী- খাল সাঁতার দিয়ে চলন্ত নৌকা থেকে মানুষ ধরে নিয়ে গেছে বাঘে। এখন বাঘের আক্রমন দূরে থাক, বাঘ চোখেও পড়েনা, পড়েনা হরিণ, দেখা মেলনা কুমিরের। জেলে বাওয়ালীদের উপর নির্যাতন অপহরণ, মুক্তিপনের পাশাপাশি ধ্বংস করেছে পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ দর্শনীয় স্থান সুন্দরবন তথা বাঘ, কুমির হরিণসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। সর্বশেষ ২০০১ সালের জরীপে বলা হয়েছে সুন্দরবনে দেড় থেকে দু লক্ষ হরিণ আছে। আছে ২০৬টি কুমির ও ১০৬টি বাঘ। এ জরিপ প্রতিেিবদন বনজীবিরা কোন মতেই মানতে রাজি নহে। তাদের মুখের বর্ননা, এর সংখ্যা খুবই সামান্যতম। শ্যামনগর উপজেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, উপকূলীয় একজন প্রভাবশালী ইউপি চেয়ারম্যান গতকাল তার খাস কামরায় এই প্রতিবেদক-কে জানান, মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে প্রায় ২শতাথিক বনদস্যু তাদের আগ্নেয়াস্ত্র গোলা বারুদ জমা দিয়ে আত্ম সমার্পণ করে সাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। হাতেগোনা দু-একটি বনদস্যু বাহীনি সুন্দরবনে আছে। লোক মুখে শোনা যাচ্ছে তারাও অতিদ্রুত আত্মসমার্পণ করবে। কিন্তু, দুই যুগ ধরে সুন্দরবন তাদের নিয়ন্ত্রনে রেখে বনজীবিদের পাশাপাশি বিশ্ব ঐহিত্য সুন্দরবনের বাঘ হরিণ কুমিরসহ বন্য প্রানির যে ক্ষতি করেছে, সে ক্ষতি আর কখনও পূরণ করা যাবেনা। তিনি আরও জানান, দেশ স্বাধীনের পর সুন্দরবনের এত বড় ক্ষতি আর কোন চক্র করতে পারেনি।